সাম্প্রতিক পোস্ট

উপকূলের অনাবাদী জমিতে সূর্যমুখি চাষ

দেবদাস মজুমদার, বিশেষ প্রতিনিধি, উপকূলীয় অঞ্চল

উপকূলীয় কৃষকের কিছু জমি বছরজুড়েই পতিত থাকে। সেচ সংকট, সেই সাথে জমিতে লবণের আগ্রাসনের কারণে বেশ কিছু জমি অনাবাদী থেকেছে প্রতিবছর। কেননা এসব জমিতে কোন ফসল উৎপাদন করা যেতো না। আমরা জানি, কৃষিজমির উর্বরতার ওপর নির্ভর করে ফসল আবাদের ধরন। বাংলাদেশের পিরোজপুর ও বরগুনা উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ধানের আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনকে দিন। তবে অঞ্চলভেদে ধান আবাদের পাশাপাশি অন্য শস্যবীজের আবাদ চলে আসছে। কেননা কেবল ধানের ওপর নির্ভর করে কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা সম্ভব নয়। সে কারণে কৃষকরা নানা মৌসুমী ফসল আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। অন্যদিকে শস্য-ফসল আবাদে কৃষকের লোকায়ত জ্ঞানের পাশাপাশি কৃষি ব্যবস্থাপনায় আসছে পরিকর্তন। সে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে উপকূলে। তাই তো অঞ্চলে অনাবাদী জমির নিবিড় ব্যবহার বাড়ছে। খাদ্যশস্যের পাশাপাশি তেল ফসল আবাদের সম্প্রসারণ কৃষিতে নতুন গতি নিয়ে আসছেন উপকূলের কৃষকরা। এই ধারাবাহিকতায় গত দুই বছর ধরে সূর্যমূখি আবাদের সম্প্রসারণ ঘটেছে পিরোজপুর ও বরগুনার কিছু এলাকায়। কৃষি বিভাগের মতে, কিছুটা লবণ সহিষ্ণু ফসল সূর্যমূখি। প্রত্যন্ত গ্রামের দিকে এখন খুব সহজেই চোখে পড়ে সূর্যমূখির হাসি। মাঠজুড়ে এখন সূর্যমূখির হাসি। প্রান্তের অনাবাদী জমির কৃষকের কাছে সূর্যমূখি এখন নতুন এক সম্ভাবনার ফসল।
????????????????????????????????????
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার টিকিকাটা ইউনিয়নের ছোট শিংগা গ্রামের প্রান্তিক কৃষাণী মঞ্জু রানী বালা (৪২) বসতবাড়ির পাশের ১০ কাঠা জমিতে এবারই প্রথম সূর্যমূখি ফসলের আবাদ করেছেন। এই কৃষাণীর অনাবাদি রুক্ষ্ম মাঠে এখন শোভন সূর্যমুখির সম্ভাবনার বীজ। মাঠের সূর্যমূখি ফুলে ফুলে এখন নতুন সম্ভাবনার শস্যদানা। আর পক্ষকাল পরেই সূর্যমূখি ফসল সংগ্রহের পালা শুরু হবে।

এই প্রসঙ্গে কৃষাণী মঞ্জু রানী বালা বলেন, “মোগো এলাকায় সূর্যমূখি কেউ চাষ করত না । এবছর মোরা সরকার দিয়া বীজ পাইছি। এই সময় জমি তো এমনিতেই পইড়া থাহে। তাই সূর্যমূখি চাষ দিছি। সূর্যমূখি বীজে তৈল হয় আবার এতে জমির উর্বর হয়। তাই অনেকেই এবছর চাষ দিছে। ফলন ভালো হইছে এতে ম্যালা খুশি।”
শুধু কৃষাণী মঞ্জু বালাই নন মঠবাড়িয়া ১১ ইউনিয়নের অন্তত ৬টি ইউনিয়নের চার শতাধিক কৃষক অনবাদী ও পতিত জমিতে এবার সূর্যমূখির পরিকল্পিত আবাদ করেছেন। সরেজমিনে উপজেলার গুলিসাখালী, টিকিকাটা, আমড়াগাছিয়া, সাপলেজা, বেতমোর ও বড়মাছুয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে সূর্যমুখি আবাদ চোখে পড়েছে।

মঠবাড়িয়া উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার উপজেলার ছয় ইউনিয়নে ২৫০ হেক্টর জমিতে কৃষকরা সূর্যমুখির আবাদ করেছেন। তবে উপজেলা কৃষি বিভাগ ৮ প্রদর্শনী প্লটে কেবল বীজ ও সার বিনামূল্যে দিয়েছেন। এর বাইরে স্ব উদ্যোগে আরও ৪০০ কৃষক তাদের অনাবাদী জমিতে এবার সূর্যমুখি আবাদ করেছেন। এটা এ উপকূলে নতুন ধরনের ফসল। ফলন ভালো ও লাভজনক হওয়ায় এলাকার কৃষকদের সূর্যমুখি চাষে আগ্রহ বাড়ছে। হেক্টর প্রতি ৩ থেকে সাড়ে ৩ টন সূর্যমুখি ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

????????????????????????????????????উপজেলার গুলিসাখালী ইউনিয়নের কবুতরখালী গ্রামের সূর্যমুখি চাষী নিরঞ্জন কীর্তুনীয়া, পঙ্কজ হালদার ও নির্মল হালদার জানান, সূর্যমুখি একটি লাভজনক ফসল। এ মৌসুমে অনেকেই এবার সূর্যমুখি আবাদ করে লাভের আশা দেখছেন। অনাবাদী জমিতে খুব সহজেই সূর্যমুখির আবাদ করা সম্ভব। সূর্যমুখি চাষে জমির উর্বরতাও বাড়ে। সূর্যমুখি এ মৌসুমে কৃষকের বাড়তি আয় বর্ধক ফসল। গুলিসাখালী কৃষি ব্লকের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হরষিত চন্দ্র কীর্তুনীয়া বলেন, “অনবাদী জমিতে এবার কৃষকরা সূর্যমুখি আবাদ করে এ ফসলের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। অনেক কৃষক আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তবে এলাকায় সেচ সংকট থাকায় চাষে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। সূর্যমুখি একটি অর্থকরি তৈলবীজ ফসল।

জানা গেছে, উপকূলীয় বরগুনা অঞ্চলেও কিছু এলাকায় সূর্যমুখি আবাদের সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। জেলার বিষখালী নদী তীরবর্তী বামনা উপজেলা চার ইউনিয়ন বামনা সদর, বুকাবুনয়িা, রামনা ও ডৌয়াতলা এলাকায় গত ৩ বছর ধরে সূর্যমুখি আবাদ হচ্ছে। এলাকার প্রান্তিক কৃষকরা ৩০০ একর পতিত জমিতে সূর্যমুখি আবাদ সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন।
এ  ব্যাপারে বামনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সিএম রেজাউল করীম জানান, এ উপজেলায় এবার ৩০০ কৃষক মাঝে সূর্যমুখির আবাদ করেছেন। এর বাইরে আরও ১০০ কৃষক স্ব উদ্যোগে সূর্যমুখির আবাদ করেছেন। উপজেলার দক্ষিণ ডৌয়াতলা গ্রামের সূর্যমুখি চাষী মো. আফজাল হোসেন হাওলাদার জানান, তিনি গত তিন বছর ধরে সূর্যমুখির আবাদ করে আসছেন। এবারও ১০ কাঠা জমিতে সূর্যমখির আবাদ করেছেন। এ মৌসুমে অনাবাদী জমিতে সূর্যমুখি চাষ করে কিছুটা আর্থিক লাভ হচ্ছে। এছাড়া সূর্যমুখির বর্জ্য খৈল ও জৈব সার হিসেবে কাজে লাগছে। এতে অনাবাদী জমি ব্যবহার হচ্ছে অন্যদিকে জমির উর্বরতাও বাড়ছে, যা অন্য ফসল আবাদে কাজে লাগছে।

পিরোজপুর ও বরগুণা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সূর্যমুখি মূলত একটি উৎকৃষ্ট তেল ফসল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর চাষ রয়েছে। তবে ১৯৭৫ সাল থেকে সূর্যমুখি তেল ফসল হিসেবে বাংলাদেশে চাষ শুরু হয়। বর্তমানে পটুয়াখালী, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর, দিনাজপুর, গাজীপুর ও টাঙ্গাইল অঞ্চলে এর আবাদ লক্ষ্যণীয়। তবে গত ২/৩ বছর ধরে উপকূলীয় পিরোজপুর ও বরগুনা অঞ্চলে সূর্যমুখি আবাদ সম্প্রসারণ ঘটেছে। সূর্যমুখির বীজ ফসল থেকে বিশেষ তেল তৈরি হয়। এতে তেলে ক্ষতিকারক ইরোসিক এসিড নেই। আমাদের দেশে সূর্যমুখির উল্লেখযোগ্য দুইটি জাত রয়েছে যেমন,কিরনী (ডিএস-১), বারি সূর্যমুখি-২।
সূর্যমুখি সারাবছরই চাষ করা যায়। তবে অগ্রহায়ণ মাসে এ ফসলের চাষে ভালো ফলন পাওয়া যায়। বীজ বপন থেকে পরিপক্ক হতে ৯০ দিন অথবা ১১০ দিন সময় লাগে। তবে ফুলের বীজ ৬৫-৭০ দিনের মধ্যে বীজ পরিপুষ্ট হতে থাকে। ফসল সয়গ্রহের সময় হলে সূর্যমুখির গাছের পাতা শুকিয়ে যায় ও গাছ নেতিয়ে পড়ে। বীজ কালো পুষ্ট ও বেশ শক্ত হয়। বীজ সংরক্ষণের পর বর্ষাকালে অন্তত দুইবার রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা ভালো। সূর্যমুখি বীজে তৈল উৎপন্ন হয়, যা মানবদেহ ভোজ্য ও নানা ঔষধি কাজে ব্যবহৃত হয়। এ তেল  উপাদেয় বলে বেশ চাহিদা রয়েছে। দিনদিন এ তেলের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এর আবাদও সম্প্রসারণ হচ্ছে। ঘানিতে শতকরা ২৫ ভাগ ও এক্সপেলারে ৩৫ ভাগ তেল নিষ্কাশন সম্ভব।

এ বিষয়ে মঠবাড়িয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “সূর্যমুখি উপকূলে নতুন সম্ভাবনার ফসল। এ ফসলের আবাদে অনাবাদী জমি আবাদী হয়ে উঠছে। এ ছাড়া সূর্যমুখি আবাদের সাথে আন্তঃফসল হিসেবে চীনাবাদাম ও  সয়াবিন চাষ করা যায়। ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণে সক্ষম তেল ফসল সূর্যমুখি চাষ করে এলাকার অনেক কৃষক সফলতার মুখ দেখছেন। ফলে চাষীরা এর আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

happy wheels 2
%d bloggers like this: