সাম্প্রতিক পোস্ট

পাটজাগ ও পরিবর্তিত জীবনধারার ইতিবৃত্ত

মো: জাহাঙ্গীর আলম, উন্নয়নকর্মী, বারসিক

একসময় বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে। তখন পাটই ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস। কালের বিবর্র্তে পাটের সেই সুদিন দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। পাটের জমিতে এখন চাষ হয় ধান, মরিচ, বেগুন, আখ, পান, ফল, বিভিন্ন ধরণের সবজিসহ অন্যান্য ফসল। পাটের এই পরিবর্তনশীলতার পিছনে দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি যতটা দায়ি তার চেয়ে বেশি দায়ি বিশ্ব রাজনৈতিক প্রভাব। এশিয়া মহাদেশের প্রধান পাটকল আদমজী জুট মিল আজ বন্ধ! স্বাভাবিকভাবেই দেশের পাটচাষীরা তাদের দীর্ঘদিনের পাট চাষের অভ্যাস থেকে ধীরে ধীরে দুরে সরে আসতে শুরু করে।

Presentation1
পাট চাষের দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞ কৃষক লক্ষ্মীনারায়ণপুর গ্রামের কৃষক রহমান সরদার (৫৮) বলেন, “শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে আগে পাট কাটা হতো। পাট কেটে আটি বেঁধে জমিতে তিন চার দিন ফেলে রাখা হতো যাতে পাটের পাতা জমিতে পড়ে জমিকে উর্বর করে। তারপর পাট মাথায় করে এনে গাঙে বা বিলে ফেলে চার থেকে পাঁচশত আঁটি এক জায়গা করে বেঁধে তার উপর ঘাস, ধানের খর দিয়ে ঢেকে মাটির চাপ বা কলাগাছ কেটে দিয়ে পাট জাগ দেওয়া হতো।” তিনি আরও বলেন, “এই পাটের জাগ দেওয়ার পর দশ কি বারোদিন পার হলে পাট পচে গেলে তারপর পাট ধোঁয়া হতো। একবার পাট জাগ আসার পর দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পাট ধুয়ে বাড়িতে নিয়ে আসতে হতো, তা না হলে পাট দ্রুতই পচে যেত। কারণ একবার পচে গেলে সেখান থেকে পাটকাঠি ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যায় না।”

তিনি জানান, পাট ধোয়ার সময় অসংখ্য দেশী মাছ যেমন চেলা, পুটি, শোল, টেংড়া এবং রুই মাছ পাটের পচা খাওয়ার জন্য চারপাশে ছোটাছুটি করে খাবার সংগ্রহ করতো। অনেকসময় এই মাছ ধরা হতো বর্শি দিয়ে। মাঠ থেকে ভেজাপাট বাড়িতে আনার জন্য নৌকা, গরু ও মহিষের গাড়ি এবং অনেকসময় মাথায় করে আনা হতো। পাট বাড়িতে আনলেও পাটকাঠি ভেজা থাকার কারণে তা গোল করে পানির মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো এবং বর্ষার পানি চলে গেলে তারপর তা বাড়িতে আনা হতো। পাটকাঠিকে এইভাবে গোল করে দাঁড় করে রাখাকে স্থানীয় ভাষায় বলতো জালি। বর্ষার পানি যখন কমে যেত তখন অনেকেইে এই জালি থেকে কই, শিং, মাগুর মাছ ধরতো।

index.jpg ১২৩
ভেজাপাট সাধারণত গ্রামের বাড়ির মাঝখানে পাটকাঠি ছড়িয়ে দিয়ে তার উপর রাখা হতো। পাটকাটি এমনভাবে দেওয়া হতো যাতে পাটের গাইটে (ভেজা পাটের আশ ছাড়ানোর পর বাধা ১০০ আটির বোঝা) কোনভাবেই কাদামাটি না লাগে। পাটের রঙ যাতে ভালো হয় এবং ভালো দামে বিক্রি করা যায় তার জন্য গ্রামের নারীরা পাটের গাইটের উপর কুয়ার পানি সংগ্রহ করে পাটের গাইটের উপর ঢেলে দিতেন। এই পানি দেওয়ার ফলে পাটের রঙ একটু সুন্দর হতো এবং কাজটি সাধারণত বাড়ির নারীরা করে থাকতেন। পাটের গাইট বাড়িতে আসার পর পাট শুকানোর জন বাড়ির নারী-পুরুষ মিলে বাড়ির চারপাশ পরিস্কার করে খোলা জায়গা বের করে বাঁশের আড় বাঁধা হতো। পাটের আড়ের জন্য শক্ত বাঁশ কেটে এনে মাটি খুড়ে বাঁশ পুঁতে তার সাথে পাটের আঁশ দিয়ে বাঁশ বাঁধা হতো। আড়ের উচ্চতা নির্ভর করতো পাটের লম্বা হওয়ার উপর। পাট খুব লম্বা হলে আড় উচু করে বাধতে হতো এবং পাট যদি আকারে ছোট হতো তা হলে আড় নিচু করে বাঁধা হতো। পাটের গাইট দুই তিনদিন রাখার পর বাড়ির নারী ও পুরুষ, কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবারের বড় সন্তানেরা খুব ভোর বেলায় ভেজা পাট শুকানোর জন্য পাটকে সারিবদ্ধভাবে আড়ের উপর মেলে দিতেন। পাটের উপরের অংশ শুকিয়ে গেলে দিনের মাঝামাঝি সময়ে সাধারণত নারীরা পাটের আটিকে উলটিয়ে দিতেন, যাতে সব পাটের সকল জায়গা শুকিয়ে যায়। পাট শুকাতে প্রায় একদিন লেগে যেতো এবং এটাকে ভালোভাবে শুকানোর জন্য প্রায় সারাক্ষণ সময় পাটের পিছনে সময় ব্যয় করতে হতো।

পাট শুকানোর মৌসুমে মাঝে মাঝেই বৃষ্টি আসতো। তখন পরিবারের সকলে মিলে পাটতে ঘরে তোলার জন্য ব্যস্ত হয়ে যেত। এই সময়ে আকাশে মেঘ করলেই পরিবারের বড়রা বিশ্লেষণ করতেন এই মেঘ থেকে বৃষ্টি আসবে কি আসবে না। বিশ্লেষণে যে সিদ্ধান্ত আসতো তার উপরই পাট তোলা বা রাখা নির্ভর করতো। অনেকসময় বৃষ্টি এসে পাটকে ভিজিয়ে দিত যা নারীর কষ্টকে দ্বিগুণ করে দিত। বৃষ্টিতে পাট ভেজাকে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অনেক সময় ছোটখাট ঝড়গা বিবাদও হয়ে যেত। বিকালে যখন পাট শুকিয়ে যেত তখন আবার পরিবারের সকল সদস্য মিলে কয়েকটি পাটের আটির মাথা এক সাথে করে সুন্দর ও সমানভাবে বেঁধে দিত যাতে সকল পাটকে সমান দেখা যায়। সুন্দরভাবে পাটের আটি বাঁধার উপরও পাটের দাম হেরফের হতো। এক এক পরিবারের পাটের আঁটি ধরণও এক এক রকম হতো। এমনকি এক এলাকা থেকে অন্য এলাকার মধ্যে পাট শুকানো, আটি বাধার মধ্যে ভিন্নতা ছিল। এই পাট শুকানোর পর সাধারণত বাড়িতে মাচার উপর সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হতো।

index.jpg২৩৪
অনেক কৃষক পরিবার পাটের মৌসুমে তাদের প্রয়োজন মতো পাট স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে সংসারের প্রযোজন মেটাতেন। এই পাট দিয়ে তারা গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ বাধার জন্য দড়ি তৈরি করতেন। এই দড়ি তৈরি করার জন্য সমাজে কিছু দক্ষ মানুষ থাকতো যাদেরকে ডাকা হতো এই কাজ করার জন্য। ঘরবাড়ি, সাঁকো, লাঙ্গল, জোয়াল, মই, লাংলে ব্যবহার করার জন্যও প্রচুর দড়ি লাগতো যা এই পাট থেকে তৈরি করা হতো। এছাড়াও খেঁজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য ও গাছির বের দেওয়ার জন্য শক্ত ও মোটা দড়ি তৈরি করা হতো যাকে স্থানীয় ভাষায় গাছি বলতো। পাট তোলার পর বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও নিরাপত্তার জন্য চারপাশে পাটকাঠি ব্যবহার করে বেরা দেওয়া হতো, সবজির জন্য জাংলা দেওয়া হতো, ঘরের বেরা তৈরি করা হতো এবং বাকি পাটকাঠি সারাবছর জ্বালানির নিরাপত্তা হিসেবে ব্যবহার করার জন্য রেখে দেওয়া হতো।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন, অনাবৃষ্টি, খাল বিল, নালা, বাওড় দখল ও পর্যাপ্ত পানির অভাবে পাট জাগ দেওয়ার সেই অবস্থা এখন নেই। পাট ধোঁয়াকে কেন্দ্র করে আগে যে ধুয়া গান গাওয়া হতো সেই গান আর এখন আর শোনা যায় না। একমাত্র পাট চাষ কমে যাওয়া এবং পাট জাগ দেওয়ার জায়গার অভাবে গ্রামীণ মানুষেরা তাদের পারিবারিক সংস্কৃতি এমনকি পাট জাগ দেওয়ার সাথে সম্পর্কিত সঙ্গীতও হারিয়ে ফেলেছে। এছাড়াও পাট জাগ দেওয়ার সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে যারা জড়িত ছিলেন তারাও আজ পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। পাট চাষ কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন এবং চাষকে নিরুৎসাহিত করার কারণে আজ দেশে পাটের উৎপাদিত দ্রব্য কমে গেছে। ফলশ্রুতিতে পরিবেশবান্ধব পাট দ্রব্যের ব্যবহার কমে গিয়ে আজ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিকের ব্যবহার বৃদ্ধি পাছে।

নদী, খাল বিল, ডোবা নালা, দূষণ এবং দখল করার কারণে স্থানীয় সকল জাতের মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট করা হয়েছে, হারিয়ে গিয়েছে আমাদের স্থানীয় জাতের মাছের সমারোহ। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন, নদী, খাল দখল এবং উজানের পানির প্রত্যাহারের কারণে এখন পানির প্রবাহ না থাকায় কৃষকরা পাট জাগ দেওয়া থেকে শুরু করে পাট ধোয়ার কোন পানি তারা পাচ্ছেন না। ফলে পাট চাষ এবং পাটকেন্দ্রিক জীবনধারার ক্ষেত্রেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। আমাদের কৃষি, পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য, সংস্কৃতি এবং সুষ্ঠু জীবনপ্রবাহের জন্য আমাদের পাট চাষ এবং পাট ব্যবস্থাপনার জন্য আগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: