সাম্প্রতিক পোস্ট

‘আমাগো প্রয়োজনেই আমরা এই গাছ সংরক্ষণ করুম’

মানিকগঞ্জ থেকে রাশেদা আক্তার

‘উদ্ভিদবৈচিত্র্য রক্ষা করি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করি’-এ শ্লোগানকে সামনে রেখে গতকাল মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়নের ঢাকুলী গ্রামে অচাষকৃত উদ্ভিদের পাড়ামেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বারসিক এ অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে। মেলায় গ্রামের ৩৫ জন নারী তাদের বাড়ির আশেপাশে, পতিত জায়গায় আপন মনে বেড়ে উঠা বিভিন্ন ধরণের অচাষকৃত উদ্ভিদ প্রদর্শন করেন।

ঢাকুলী গ্রামের কৃষাণী সীমা বেগমের সভাপতিত্বে অচাষকৃত উদ্ভিদের ব্যবহার, চর্চা ও সংরক্ষণ বিষয়ে আলোচনা সভায় কৃষাণী রাবেয়া বেগম বলেন, ‘এই গাছের অনেক গুণাগুণ আছে। আমরা অনেকেই জানি অনেকেই জানি না। যারা জানে তারা বেশি বেশি খায়। আমরাও হাত-পা কেটে গেলে দুর্ব্বার রস দেই, কচুর রস দেই রক্তপড়া বন্ধ হয়ে যায়।’ শাহানাজ বেগম বলেন, ‘চক থেকে নানা ধরণের শাক তুলে আনি। হেচি শাক, কলমী শাক, বৈথা শাক, কচু শাক, কচুর লতি মাঝে মাঝেই খাই। গরুর ঘাস কেটে আনি। এতদিন নিজের দরকার হইতো তাই এগুলো আনতাম। আজকে জানলাম এই গাছের এত গুণ আছে। আমি এখানে ২০ ধরণের গাছ নিয়া আইছি (আসছি)।’

সীমা বেগম তাঁর বক্তবে বলেন, ‘এই গাছের অনেক উপকারিতা আছে। সব গাছই কোনো না কোনো উপকারে আসে। এই গাছ ঔষধিগুণে ভরা। তাছাড়া এই গাছ বুনতে হয় না। সার দিতে হয় না। আলানে-পালানে গেলেই পাওয়া যায়। আমাগো হাতের কাছেই থাকে। আমরা এই গাছ অকারণে নষ্ট করুম (করবো) না। আমাগো প্রয়োজনেই আমরা এই গাছ সংরক্ষণ করুম (করবো)।’

পাড়ামেলায় গ্রামীণ নারীরা যেসব গাছ প্রদর্শন করেন সেগুলো হচ্ছে- আগুনজ¦ালা, জল পানা/কচুরি পানা, তামাকটুলী, সোনাতুলী, বউটুনী, গোড়া হেচি, ফুল হেচি, আগড়া, ঘাওপাতা, তেলাকুচ পাতা, ভাদাইল, মটমটি, চিনিগুড়া, কাঁটাখুরা, খসখসা ডুমরা, আদারী কচু, কেশুরজা, হাতিশুড়া, পাহাড়ী জঙ্গল, বিশজারণ, ঢেঁকিশাক, ছিটকী, জোহানী পাতা, তৈল কন্টু, শোল পাতা, ভেন্না, কানাইলা/কানিলা, পিপল, টেকা খারকুন, দুধ কচু, গুলাল পাতা, কল্পনাথ, বাশক, বাকশা, ভাটি, বিলাই এচড়া, ডেমি/গীমা, নুনকুটে, চুতরা, পাথরকুচি, দূর্ব্বা, চেরচেরী, গইচা, কৈটুরা, বৈথা, ওলটকম্বল, কালা কচু, কচুর লতি, নাকফুল, জগডুমড়া, করচা, দন্ডকোলস, বেরাটি, মরিচগাছ, টব বাগুন/তিত বেগুন, লাল মধু, শন, বিষকাটালী, হামা ঘাস, খেলনা কপি, সাদা ফুল, মাইক ফুল, কলমী, বড় কলমী, রূপি, ইচাঝুরি শাক, খেতা শাক, ছোবা ঘাস, খারকুন, পাট মাদারী, গন্ধফুল, বিন্না, তেতুলা পানা, ঝাল ফুল, হরহরি, নেটাপেটা শাক, জল হেচি। মেলায় ৩৫ জন নারী মোট ৭৮ জাতের বিভিন্ন ধরণের অচাষকৃত উদ্ভিদ প্রদর্শন করেন।

সর্বোচ্চ ৫৬ ধরণের অচাষকৃত শাক, ঔষধী গাছ ও গো খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এমন গাছ প্রদর্শন করে ১ম স্থান অর্জন করেন আমেনা বেগম। মেলায় ১ম, ২য়, ৩য় স্থান অর্জনকারীসহ গাছ প্রদর্শনকৃত ৩৫ জন নারীকে পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

উল্লেখ্য, উদ্ভিদের পাড়ামেলার আলোচনার শুরুতে পাড়ামেলার লক্ষ্য উদ্দেশ্য তুলে ধরে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বারসিক’র আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল রায়। তিনি বলেন, ‘এই গাছগুলো বাড়ির আনাচে- কানাচে, পতিত জমিতে বেশি হয়। এই প্রতিটি গাছের অনেক গুণাগুণ রয়েছে। আমাদের এগুলো খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আমাদের চারপাশে এগুলো থাকলে তবেই না আমরা এগুলো খেতে পারবো। তাই এগুলো নষ্ট না করে সংরক্ষণেরও উদ্যোগ নিতে হবে।’

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: