Posted in

এখন কইলজার মইধ্যে সাহস পাই

কলমাকান্দা, নেত্রকোনা থেকে অর্পণা ঘাগ্রা

কলমাকান্দা উপজেলা থেকে প্রায় ৩ কি:মি: দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত বিষাড়া গ্রামটি। হাওর অধ্যূষিত এলাকা হওয়ায় বর্ষাকালের প্রায় ৬ মাস পর্যন্ত গ্রামের চারপাশ জলে নিমজ্জিত থাকে। নৌকা ছাড়া কোথাও যাওয়ার কোন সুযোগ ছিলনা। গ্রামে যেতে হতো জমির ছোট আইলের মাধ্যমে। এলাকায় কোন বিদ্যুৎ ছিল না। তাই টেলিভিশন দেখার সুযোগ নেই গ্রামের মানুষের। গ্রামে কোন সরকারি বা বেসরকারি কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিলো না। তাই অনেক শিশুই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ সমাপ্ত করতে পারেনি। আর যারাও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছে তারাও স্কুল থেকে বিভিন্ন কারণে ঝরে পড়েছে। গ্রামের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬৪৮ জন তার মধ্যে নারী ৩১৮ জন। নারীরা সামাজিক নানান নিয়ম নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ, নেতৃত্বের চিন্তা তাদের কাছে অকল্পনীয়। কটিপয় মৌলিক ও মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া গ্রামবাসীদের মধ্যে প্রায় সময় সহিংস ঘটনা ঘটায় প্রতিবেশীদের প্রতি আন্তরিক সম্পর্কের ভিতও শিথিল হতে থাকে। গ্রামের এত কিছু সমস্যা জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের সামনে তুলে ধরার মত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি নেই এলাকায়। তাই কোন সময়ই স্থানীয় সরকার/প্রশাসনের নজরে আসেনা সমস্যাগুলো। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পদধূলি পড়ে কেবল নির্বাচনের পূর্বে। তাই এলাকার সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে ২০১২ সালে গ্রামের ২০জন নারী বারসিকের সহযোগিতায় ‘আশার আলো’ নামে একটি নারী সংগঠন গড়ে তুলে। এই নারী সংগঠনের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন তুলে ধরা হলো:

IMG_20180627_124929
প্রাথমিক শিক্ষা সমস্যার সমাধান করা
সংগঠনের কার্যক্রমের প্রথম পদক্ষেপের মধ্যে ছিল গ্রামের শিশুদের শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা। এই গ্রামের অধিবাসী শেখ দুলাল নামে একজন কৃষক স্কুলের জন্য ৪ কাঠা (৩২ শতাংশ) জায়গা দান করলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। কিন্তু ১-২ বছর স্কুল চালিয়ে যাওয়ার পর স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন ধরে কেউ এর কোন খোঁজ রাখেনি। বিদ্যালয়ের ঘরটিও ঝড়ে ভেঙ্গে যায়। শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় এলাকার অনেক শিশু লেখাপড়া না করে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিযুক্ত হতে থাকে। অবশেষে সংগঠনের সদস্যরা বারসিকের সহযোগিতায় শিশু শিক্ষা নিয়ে কাজ করা এফআইভিডিবি সংস্থার সহযোগিতায় একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তখনই দীর্ঘদিন ধরে গঠিত স্কুল কমিটির লোকজন তাতে বাধা দেয়। কিন্তু এ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকে। পরবর্তীতে সংস্থা তেকে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না করার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। এমতাবস্থায় ২০১৩ সালে এলাকার জনগোষ্ঠী মিলে বিদ্যালয়ের জন্য ছোট্ট পরিসরে স্কুল ঘর নির্মাণ করে নিজেরাই পরিচালনা করতে থাকেন। পাশাপাশি প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। ফলশ্রুতিতে ২০১৪ সাথে গেজেটেড হয় এবং মার্চ ২০১৭ সালে বিষাড়া রেজি: সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে বিদ্যালয়টি সরকারীকরণ করা হয়। এখন গ্রামের প্রত্যেক শিশুই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে।

IMG_20180627_104514
রাস্তাঘাট ও বিদ্যূৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা 
২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারি কলমাকান্দার ডুবিয়ারকোনা গোরস্থান উদ্বোধনের দিনে নেত্রকোনা-১ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন। এই দিনে সংগঠনের নারীরা তার সামনে ব্যানার নিয়ে মিছিল করতে করতে উপস্থিত হন এবং সভানেত্রী আয়েশা খানম সাংসদের কাছে এলাকার সার্বিক সমস্যার কথা তুলে ধরেন, এলাকার উন্নয়নের জন্য দাবি পেশ করেন। অতঃপর রাস্তার জন্য এমপি মহোদয়ের ডিউ লেটার সংবলিত একটি আবেদনপত্র হিলিপ অফিস বরাবর প্রেরণ করা হয়। কিন্তু জানুয়ারি ২০১৮ সালে এমপি নিজেই এই গ্রামের ও জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে পার্শ্ববর্তী চিনাহালা গ্রামের জন্য রাস্তা দিয়ে দেন। তারও পূর্বে ২০১৭ সালে এলাকায় বিদ্যূৎ সংযোগ দেয়া হয়।

IMG_20180627_104246
‘আশার আলো’ সংগঠনের সদস্যরা উপরোক্ত কাজ ছাড়াও প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রতিবন্ধী কার্ড, প্রবীণ ও দৃষ্টিশক্তিহীনদের জন্য কম্বল ও সাদাছড়ি এবং প্রবীণদের জন্য বয়স্ক ভাতার কার্ড করে। এছাড়া সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সেবা ও সুযোগ এলাকার মানুষের জন্য ব্যবস্থা করেন।
তবে অনেক ত্যাগ ও শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত তাদের সাফল্যের পথ মসৃন ছিল না। রাস্তার জন্য যখন আন্দোলন করেন তখন এলাকার কোন পুরুষ তাদের সাথে ছিলেন না। বরং তাদেরকে খারাপ মন্তব্যের সম্মুখিন হতে হয়েছিল। রাস্তা হওয়ার পর এলাকার পুরুষদের ও নেতিবাচক চিন্তার মানুষের মানষিকতার পরিবর্তন ঘটে। এলাকায় তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। এখন তাদের নেতৃত্বকে সম্মান করে। অন্যান্য সংগঠনের জন্যও তারা এখন উদাহরণস্বরূপ। তাদের মধেও আত্মবিশ্বাসের ভিত দৃঢ় হয়েছে। এই আত্মবিশ্বাস থেকেই সংগঠনের সহ সভানেত্রী অজুফা বেগম বলেন, “আমরা আগে কোন জায়গাই গেলে কোন ধরনের সুযোগ মিলবো এইটা জানতামনা, নিজের ছাড়া অন্য সবার কথা ভাইবা দৌড়াদৌড়ি করতামনা। মনের মধ্যে লজ্জা, ভয় কাজ করতো। এখন সব জায়গাই গিয়া যোগাযোগ করতে পারি, কথা কইতে পারি। কোন জায়গাই গিয়া কাজগুলা করা লাগবো এইগুলা জানি। বারসিক আমাদের অনেককিছু চিনাইসে, অনেককিছু শিখাইসে। এখন সব কাজ করার লাইগ্যা কইলজার মধ্যে সাহস পায়।”

সভানেত্রী আয়েশা খানম বলেন, “নারীরাও চাইলে একসাথে হইয়া অনেক কঠিন কাজগুলা করতে পারে, আমরা তা কইরা দেখাইছি। এখন কলমাকান্দা শহরে গেলে অনেক মানুষ আমারে জিজ্ঞেস করে, অনেক গণ্যমান্য মানুষও আমারে চিনে। অনেক সম্মান দেয়। সহযোগিতা চাইলেই যে কোন কাজে তারা আমারে সহযোগিতা করে। আমি গ্রামটারে নিয়া যে স্বপ্ন দেখসি আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হইছে। সব মহিলাদের এলাকার লাইগ্যা একসাথে হইয়া ঘরের বাইরেও কাজ করতে হইবো।”

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.