Posted in

চালকুমড়ায় স্বপ্ন বুনেছেন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সুজন মিয়া

কলমাকান্দা, নেত্রকোণা থেকে গুঞ্জন রেমা

যে জমিটি অন্যান্য বছর পতিত থাকতো ও শুধুমাত্র গোচারণ ভূমি ছিল আজ সে জমিটি সবুজ ও হলুদ রঙে ছেয়ে গেছে। চাল কুমড়া বাগান করার ফলে দেখা যাচ্ছে চাল কুমড়ার হলুদ ফুল ও পাতার সবুজ বর্ণ। দূর থেকে চাল কুমড়া মাচার নিচ দিয়ে দেখলে ঝুলে থাকা চাল কুমড়াগুলো মনে হয় সবুজ কোন কিছু দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে। আর চালকুমড়ার হলুদ ফুলটি মনে হয় কেউ যেন সুন্দর করে হলুদ ফুল দিয়ে ঐ স্থানটি সাজিয়ে রেখেছে। সারি সারি চালকুমড়ার গাছ উপরে নাইলন রশির মাঁচা এক পাশে দাঁড়ালে অন্যপাশ দেখা যায় না। এতো বড় চাল কুমড়ার বাগান এই প্রথমবার দেখছেন রহিমপুরবাসী। তাও আবার পতিত জমিতে। অনেকে মন্তব্য করছেন কলমাকান্দা উপজেলার মধ্যে এটিই সবচে’ বড় ও সুন্দর চালকুমড়ার বাগান।

1
বলছিলাম কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের রহিমপুর বাজারের পূর্ব পাশে করা চালকুমড়ার বাগানের কথা। বাগানটির মালিকের নাম মো. সুজন মিয়া, বয়স ২৮ বছর। বাড়ি দূর্গাপুর উপজেলার চন্ডিগড় ইউনিয়নের বনিয়াকান্দা গ্রামে। ৪ ভাই ও ৫ বোন এই মোট ৯ ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বড় সংসারে প্রায়শই অভাব লেগে থাকতো। এই অভাবের সংসারের মাঝে স্কুলে যাওয়াটা তার জন্য খুবই কষ্টসাধ্য ছিল। তাই অষ্টম শ্রেণীর বেশি লেখাপড়া করতে পারেননি। লেখাপড়া ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, “পেটে ক্ষিদা থাকলে কি আর লেখাপড়ায় মন বসে?” তাই তো বাধ্য হয়ে শুরু করেন বাবার সাথে কৃষিকাজ।
কৃষি কাজ করেই সংসারের চাহিদা পূরণে অবদান রাখেন সুজন মিয়া। নিজের জমি না থাকাতে অন্যের জমি লিজ নিয়ে সেখানে কৃষিকাজ করতেন। এভাবে তিনি ৫ বছর যাবৎ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে শাকসবজি চাষ করছেন। এর আগে তিনি লাউ, শশা, ঝিঙ্গা, খিরা, চালকুমড়া করে আসছেন। তবে সবচেয়ে লাভ করতে পেরেছেন চালকুমড়া চাষ করে। তাই তিনি চাল কুমড়াই বেশি করতেন।

2এ বছরই প্রথমবারের মত এত বড় আকারে চালকুমড়ার বাগান করেছেন। এর আগেও বড় আকারে বাগান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একসাথে কোন বড় জায়গা পাননি, তাই করতেও পারেননি। চন্ডিগড়ে বিভিন্ন স্থানে বাগান করার জন্য জায়গা খোঁজেন। কিন্তু কোথাও একাধারে পাননি। আবার পাওয়া গেলেও দাম বেশি ছিল- তাই সেখানে করেন নি।
তিনি মোট ৮০ কাঠা (৬৪০ শতাংশ) পতিত জমি লিজ নিয়েছেন। এই ৬৪০ শতাংশ জমির কিছু অংশে তিনি বাদাম চাষ করেছেন। বাদ বাকি জমিতে চালকুমড়া করেছেন। তার এই বাগানটি দেখাশুনা করার জন্য প্রতিদিন ৬ জন লোক কাজ করেও কুলাতে পারছেন না। এছাড়াও এই জমিতে ২৪ জন লোক একাধারে ৪৫দিন পর্যন্ত কাজ করেছেন বলে জানান।

বাগানের পিছনে তিনি এখন পর্যন্ত ৬ লাখ টাকা খরচ করেছেন। আরও ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ হবে বলে তিনি জানান। তার মানে ফসল তোলা পর্যন্ত তাঁর খরচ তবে ৮ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। এর বিপরীতে তিনি আশা করছেন ফসল বিক্রি করতে পারবেন ১৫-২০ লক্ষ টাকায়। যেদিন থেকে ফল তোলা শুরু হবে সেদিন থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ৩২ হাজার টাকার ফল তিনি বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান। এভাবে একাধারে ৫০-৬০ দিন ফল বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন।
চালকুমড়ার গাছটি এখন মাঁচাতে উঠতে শুরু করেছে। গাছের গুড়ি থেকে ৮-১২ ইঞ্চি উপর থেকে ফুল ও ফল ধরা শুরু হয়েছে। বাগান করা সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি এবার অনেক বড় ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছি। দোয়া করবেন যেন সফল হতে পারি।”

3
৫ বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কারো কোন পরামর্শ ছাড়াই নিজে নিজে এতবড় একটি বাগান করেছেন। কখন সার দিতে হবে, কখন কীটনাশক দিতে হবে, কখন সেচ দিতে হবে সবই তিনি গাছের পাতা দেখে বুঝে ফেলেন। দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি একাধারে কাজ করে যাচ্ছেন ৬ জন সঙ্গীকে সাথে নিয়ে। তার এই বাগানটি দেখার জন্য অনেক স্থান থেকে কৃষক আসেন বলে জানান। এমনকি তার বাগানটি দেখতে তার গ্রাম বনিয়াকান্দা থেকেও অনেকেই আসেন।
সুজন মিয়া’র চালকুমড়া বাগান স্বপ্ন দেখাচ্ছে আশেপাশের আরো অনেক তরুণকে। তারা উদ্বুদ্ধ হচ্ছে কৃষি কেন্দ্রিক উদ্যোক্তা হওয়ার। সুজন তার বাগানের মাধ্যমে শুধু নিজের এবং পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা আনছেন না। সাথে সাথে আরো ৬ জন যুবক এবং তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছেন। সুজন মিয়া এখন এলাকায় অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয় তরুণ। তার স্বপ্ন ছড়িয়ে যাক হাজারো তরুণের মাঝে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.