সাম্প্রতিক পোস্ট

নদীর তলদেশে ফসল ফলানোর চেষ্টা

নদীর তলদেশে ফসল ফলানোর চেষ্টা

চাটমোহর, পাবনা থেকে ইকবাল কবীর রনজু

কৃষি কাজের সূচনা হবার পর থেকেই মানুষ ক্ষুধা নিবারণ ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর জন্য ফসল ফলিয়ে আসছেন। দ্রব্য বিনিময় প্রথার যুগের পর মানুষ তার উৎপাদিত শস্য প্রয়োজন মাফিক রেখে উদ্বৃত্ত অংশ মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি শুরু করে। সে মুদ্রায় তিনি তার অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন। কর্মঠ মানুষেরা সব সময় জমিতে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। অধিক লাভের আশায় একই জমিতে একই সময়ে সাথী ফসলের আবাদও করে থাকেন অনেকে। অনেকে পতিত ভূমি, রাস্তার পাশর্^দেশ এমন কি নদীর বুক পেটেও ফসল ফলানোর চেষ্টা করেন। চলতি মৌসুমে চাটমোহরে শত শত মানুষ এ উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর বুকে বোরোধানসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ করেছেন।

barcik pic-1

চাটমোহর পৌর সদরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এক কালের ¯্রােতস্বীনি নদী বড়াল আজ মৃতাবস্থায় পরে আছে। এ নদীর শুকিয়ে যাওয়া বুক ও পেটে মানুষ বোরো ধানের আবাদ করেছেন। প্রায় ৪০ বছর পূর্বে নদীর বুকে কয়েকটি আড়াআড়ি ক্রস বাঁধ দেয়ায় নদীটি মরা খালে পরিণত হয়। নদীটি বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছিল। ছোট পুকুরের মতো এ নদীর কিছু কিছু অংশে কিছুকাল মাছ চাষও হয়। বড়াল নদী রক্ষা কমিটির আন্দোলনের ফসল হিসেবে সম্প্রতি নদীর বুকের তিনটি ক্রসবাঁধ অপসারণ করা হলে গত বর্ষা মৌসুমে নূরনগর ঘাট থেকে সরাসরি পানি আসতে পারে রামনগর খেয়াঘাট পর্যন্ত। বর্ষা মৌসুম শেষে নদীর পানি নিষ্কাশিত হয়ে গেলে নদীর বুকে এ বছর ফসল ফলানোর চেষ্টা করেন নদীপাড়ের কিছু কৃষক। দীর্ঘদিন যাবত নদীতে থেকে যাওয়া কচুরী পানা পরিষ্কার করে তারা এ নদীতে ফসল ফলানোর চেষ্টা করছেন।

barcik pic-2

বোরো ধান উৎপাদনের জন্য কয়েকদিন পূর্বে নদীর তলদেশ থেকে কচুরীপানা ও অন্যান্য ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করছিলেন চাটমোহরের বিলচলন ইউনিয়নের বোঁথর গ্রামের মৃত ময়েজ উদ্দিনের ছেলে নুরনবী (৫৭)। ছয় মেয়ে ও এক ছেলের জনক তিনি। ইতিমধ্যে কষ্টে শিষ্টে পাঁচ মেয়েকে বিয়ে দিছেন। ছেলে আল আমীন চাটমোহর ডিগ্রী কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়া লেখা করছে। মেয়ে লাকী স্থানীয় একটি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে নবম শ্রেণীকে পড়া লেখা করছে। মাঠে পাঁচ বিঘা জমি আবাদে রয়েছে তার। স্ত্রী, ছেলে মেয়েসহ চার জনের পরিবারের ভরণপোষণ, ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার খরচসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে দিন রাত প্ররিশ্রম করতে হয় তাকে। নুরনবী বলেন, “প্রতি মাসে আট থেকে নয় হাজার টাকা সংসার খরচ। এ ছাড়া ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ও যোগান দিতে হয়। পাঁচ বিঘা জমিতে ফসল উৎপাদনে টাকা খরচ করতে হয়। তার পরে লাভের চিন্তা। সব মিলিয়ে কোন রকমে দিনাতিপাত করছি। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এবছর বোরো ধান আবাদের জন্য কচুরীপানা ও ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করছি। যদি দুই চার মন ধান পাই তবে তাতে অন্তত কিছু দিনের খোরাক তো জুটবে। তাই এ অমানুষিক পরিশ্রম করছি।”

নদীর বিভিন্ন স্থানে ক্রস বাঁধ দেয়ায় নদীটি প্রাণ হারিয়েছিল। প্রায় ২শ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ নদীর কয়েক কিলোমিটার এলাকায় এ বছর পানি প্রবেশ করেছিল। চাটমোহরের বিলচলন ইউনিয়নের দোলং গ্রামের নূরুল ইসলামের ছেলে আসাদুল ইসলাম বলেন, “তিনটি ক্রসবাঁধ অপসারণের ফলে এ নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চলতি মৌসুমে আমি আমার বাড়ির সামনে নদীর তলদেশে বোরো ধানের আবাদ শুরু করার জন্য জমি পরিষ্কার করি। এর পূর্বে নদীর পাশর্^দেশে পালং শাক সরিষা ও আলুর আবাদ করি। মাটি উর্বর হওয়ায় আমাকে কোন সার ব্যবহার করতে হচ্ছেনা। অত্যাধিক পলি জমে থাকায় বোরো ধানে পানি দিতে হবে না।” নদীর আকার পরিবর্তন না করে কোন প্রকার সার ও কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই নদীর বুক পেটে ফসল ফলাচ্ছেন এরকম আরো অনেক কৃষক। নদীর বুকের সবজী যেমন পরিবারের চাহিদা মিটিয়েছে তেমনি নদীর তলদেশে উৎপাদিত বোরো ধানে পরিবারের অন্তত তিন চার মাসের খাবারের ব্যবস্থা হবে আশা আসাদুল ইসলামের মতো অনেক কৃষকের। এ আশাতেই নদীর তলদেশ পরিষ্কার করছেন তারা।”

নুরনবী বা আসাদুলই কেবল নয় এমন আরো শত শত নদী তীরবর্তী কৃষক তাদের বাড়ির পাশ^বর্তী নদীর তলদেশ ব্যবহার করে ফসল ফলাচ্ছেন। গুনাইগাছা ইউনিয়নের নূরনগর ঘাট থেকে শুরু করে বিলচলন ও হরিপুর ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী কয়েকটি গ্রামের মানুষ কয়েক কিলোমিটার এলাকায় নদীর পেটের সুবিধা জনক স্থান গুলোতে এভাবে পরিশ্রম করে বোরো ধানসহ অন্যান্য সবজি চাষ করছেন। নদীর রূপ পরিবর্তন না করে তারা নদীর ভূমি ব্যবহারের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনের যে চেষ্টা করছেন তা অন্যান্যদেরও উৎসাহ যোগাচ্ছে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: