Posted in

চলনবিলের নদ-নদী এবং খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় বিপর্যয় ঘটছে সার্বিক পরিবেশের

চাটমোহর, পাবনা থেকে ইকবাল কবীর রনজু:
এক সময়ের চলন্তবিল ‘চলনবিল’ এখন মরা বিলে পরিণত হয়েছে। এ এলাকার নদ-নদী, খাল-বিল গুলো ভুগছে নব্যতা সংকটে। ফলে সেচকার্য ব্যহত হবার পাশাপাশি দেশি মৎস্য সম্পদ ও আজ বিলুপ্তির পথে। এর প্রভাব পরছে ব্যবসা ও বানিজ্যে। দীর্ঘদিন যাবত খনন কাজ না করায় চলনবিল এলাকার খাল-বিল, নদী-নালা হারাচ্ছে স্বকীয়তা। বর্ষার পানি নদ-নদী হয়ে বিল থেকে নেমে যাবার পর চলনবিলের মাঠ গুলোতো এখন চলছে বোরো মৌসুমে ধান রোপণের পালা। অনেকে বাড়তি ফসল হিসেবে জমিতে ছিটিয়েছেন সরিষা বীজ। কিছুদিন পর জমি থেকে সরিষা উত্তোলন করে বোরো ধান রোপন করা হবে। বিলের সাথে নদ-নদীর সংযোগ খালগুলোও শুকিয়ে গেছে। চলতি মৌসুমে মাঘের শুরুতে এসেই অধিকাংশ নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে সে সকল নৌরুটের নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা। নদী ও খাল-বিলে পানি না থাকায় এ এলাকার হাট বাজারে দেশী মাছ সংকট দেখা দিয়েছে। জল পথে পণ্য পরিবহনে খরচ কম হলেও বর্তমান সময়ে এ এলাকার প্রায় সব জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অধিক খরচে ব্যবসায়ীদের স্থল পথে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে।

river pic-1অধ্যক্ষ মো. আব্দুল হামিদ রচিত ‘চলনবিলের ইতিকথা’ গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, জলপাইগুড়ির পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে ‘আত্রাই’ ও ‘গুড়’ নদী রাজশাহীতে এসে কয়েকটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পরে। এর একটি শাখা কয়রাবাড়ি, নন্দনালী ও আত্রাই হয়ে আত্রাই ঘাটের এক মাইল নিম্ন হতে ‘গুড়’ নামে সিংড়া, একান্ন বিঘা, যোগেন্দ্রনগর ও কালাকান্দরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চাঁচকৈড় ত্রিমোহনায় নন্দ কুজার সাথে মিশেছে। এদের মিলিত  স্রোত গুমানী নামে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে নূরনগরে বড়াল নদীর সাথে মিশেছে। ১৭৮৭ সালে তিস্তার সাথে আত্রাই নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে। জলপাইগুড়ির উত্তর পশ্চিম সীমান্ত থেকে দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, নিমগাছী ও তাড়াশ, পাবনার চাটমোহরের হান্ডিয়াল হয়ে অষ্টমনিষার কাছে বড়াল নদীতে মিশেছে। ১৩০৪ সালে ভূমিকম্পে নদীটির কয়েক যায়গা মরে যায়। করতোয়ার নিম্নাংশ আত্রাই ও ফুলঝোড় নামে পরিচিত। বড়াল নদী পদ্মার চারঘাট মোহনা থেকে নাটোরের বাগাতিপাড়া, বড়াইগ্রাম হয়ে চাটমোহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নূরনগরে গুমানীর সাথে মিশে বড়াল নামেই ফরিদপুরে ভাঙ্গুড়া ও বাঘাবাড়ি হয়ে হুরাসাগরের সাথে মিশে নাকালিয়া এলাকায় গিয়ে যমুনার সাথে মিশেছে। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝিতেও নদীটি স্রোতস্বীনি থাকলেও একেবারে শেষের দিকে রাজশাহী থেকে নূরনগর পর্যন্ত নদীটির অনেক স্থানে ক্রস বাধ দেয়ায় এ নদীটি এখন মৃতাবস্থায়। এ নদী উদ্ধারে বড়াল রক্ষা কমিটি দীর্ঘদিন যাবত আন্দোলন সংগ্রাম করে আসার ফলশ্রুতিতে চাটমোহর নতুন বাজার, বোঁথর ঘাট ও রামনগরের ঘাটের তিনটি ক্রসবাঁধ অপসারণ করা হলেও এখনো পদ্মার সাথে যমুনার সংযোগ ঘটানো সম্ভব হয়নি। নূরনগর থেকে বাঘাবাড়ি পর্যন্ত বর্ষায় কিছুদিনের জন্য প্রাণ ফিরে পায় নদীটি। চেঁচুয়া নদী ধারাবারিষার দক্ষিণপাশ দিয়ে চতরার বিল, জোড়দহ, আফরার বিল, খলিশাগাড়ি বিল ও কিনু সরকারের ধর হয়ে চরসেনগ্রামের পশ্চিমে গুমানী নদীর সাথে মিশেছে। এ নদীটি ও অস্তিত্বহীন হয়ে পরেছে।

river pic-2দক্ষিণ চলনবিলের বড়াইগ্রামের চিনাডাঙ্গা বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চাটমোহরের মূলগ্রাম ফৈলজানা হয়ে ফরিদপুরের ডেমরার কাছে চিকনাই নদী বড়াল নদীতে মিশেছে। ডেমরা এলাকায় স্লুইজগেট থাকায় ফরিদপুর থেকে নদীটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বর্ষা মৌসুমে মাস চারেক এ নদীতে পানি থাকলেও বাকী ৮ মাস পানি শূণ্য থাকে নদীটি। এগুলো ছাড়া ও বানগঙ্গা, তুলশী নদী, ভাদাই নদী, মরা আত্রাই নদীর অবস্থা অত্যন্ত করুন।এ নদী গুলো ছাড়াও নবীর হাজীর জোলা, হক সাহেবের খাল, নিয়ামত খাল, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনুসরকারের ধর, পানাউল্লাহ খাল, নিমাইচড়া-বেশানী খাল, বেশানী-গুমানী খাল, উলিপুর-মাগুড়া খাল, দোবিলা খাল, কিশোরখালী খাল, বেহুলার খাড়ি, বাঁকাইখাড়ি, গাড়াবাড়ি-ছারুখালী খাল, জনিগাছার জোলা, খলিশাগাড়ি বিল, ধলাইর বিল, ছয়আনির বিল, বাঁইরার বিল, সাধুগাড়ী বিল, মহিষা হালটসহ চলনবিলাঞ্চলের অন্যান্য নদী, শাখানদী, খাল, বিল, খাড়ি এখন একেবারে শুকিয়ে গেছে।

river pic-3নদী, খাল-বিল ও খাড়ি শুকিয়ে যাওয়ায় চলনবিলের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা যমুন নদী হয়ে ঢাকা থেকে যে সকল পণ্য নৌপথে আনতেন এখন তা পারছেন না। সড়ক পথে পণ্য পরিবহনে তাদের বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে। ক্রেতারা ও বিভিন্ন হাট বাজার থেকে পণ্য কিনে নৌপথে বাড়িতে নিতে পারছেন না। জলাশয়গুলো শুকিয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পরেছে হাজার হাজার মৎস্যজীবি। পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন তারা। পূর্বে নদী থেকে কৃষক অগভীর নলকূপের সাহায্যে বোরো ক্ষেতে পানি সেচ দিতে পারলেও এখন তা পারছেন না। উপরন্ত পানির স্তর দ্রুত নীচে নেমে যাওয়ায় অগভীর পাম্প মালিকরা মৌসুমের শুরুতেই তাদের সেচ পাম্প সমতল থেকে অন্তত ১০ ফিট নিচে স্থাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। গত বছর আত্রাই রিভার ড্রেজিং কাজ শুরু হলেও সেখানে অনিয়মের প্রশ্ন ওঠে শুরু থেকেই। যেখানে বালি পাওয়া সম্ভব এমন কিছু এলাকা খনন করে সংশ্লিষ্টদের অর্থের বিনিময়ে বালি বিক্রি করতে দেখা গেলেও বর্তমান অজ্ঞাত কারণে খনন কাজ বন্ধ রয়েছে।

river pic-4চাটমোহর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ভূগোল বিষয়ের বিভাগের বিভাগীয় প্রধান পরিবেশবিদ ড. এস এম মুক্তিমাহমুদ বলেন, “ভৌগলিক ভাবে এ এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো নদীর জীবন চক্রের শেষ পর্যায়ে। অর্থাৎ বার্ধক্য অবস্থায় পরিণত হয়েছে। লক্ষণীয় যে, চলনবিল এলাকার নদীর তলদেশের ঢালের পরিমাণ কম, নদীর প্রবাহমান পানির পরিমাণ কম, স্রোতের বেগও কম।” তিনি আরো বলেন, “উৎসস্থান থেকে নদীগুলোর দূরত্ব অধিক হওয়ায়, পানির সংগে প্রবাহিত মৃত্তিকা কনা, বালুকনা, নূড়িকনা এবং অন্যান্য ময়লা আবর্জনার পরিমাণ বেশি এবং তা নদীর তলদেশে তা সঞ্চয়নের পরিমাণও অধিক হওয়ায় ক্রমশই নদী উপত্যকার পানি ধারণ ক্ষমতা কমে আসছে। ফলে বন্যার সময় ব্যাপক বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে একেবারেই শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের খাদ্য শৃঙ্খল ব্যহত হচ্ছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও ফসল উৎপাদনসহ পানি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সকল কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে। ফলে বিপর্যয় ঘটছে সার্বিক পরিবেশের।”

চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটি ও বড়াল নদী রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব এস এম মিজানুর রহমান জানান, “নদ-নদী ও খাল-বিল চলনবিলের প্রাণ। এগুলো রক্ষা করতে না পারলে চলনবিল তার স্বকীয়তা হারাবেই। আমরা দীর্ঘদিন যাবত এ এলাকার নদ-নদী রক্ষায় আন্দোলন করে আসছি। দ্রুত নদ-নদীগুলো খনন করা হলে ঐতিহ্যবাহী চলনবিল প্রাণ ফিরে পাবে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.