Posted in

তিনি একজন বন মানুষ!

ভারতের রাস্ট্রপতি আবুল কালাম আজাদ এর কাছে পুরষ্কার গ্রহণের সময়।

ঢাকা থেকে বাহাউদ্দীন বাহার

তিনি একজন আপাদমস্তক বন মানুষ! অন্যভাবে বললে বন প্রেমিক মানুষ। তিনি একা একটি বন তৈরি করেছেন। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন একা। একটি বন। যার আয়তন ১৩৬০ একর। যা ভারতের জাতীয় উদ্যানের চেয়ে দুই থেকে তিন গুন বড়। ৪ দশক ধরে তিনি একা একাই এই বিশাল আয়তনের বন গড়ে তুলেছেন। ওনার নাম যাদব মোলাই পায়েং (৫৪)। বনের নামও হয়েছে তার নামে ‘মোলাই কাথোনি’ অর্থাৎ মোলাইয়ের ঘর।

ব্রহ্মপুত্রের চর মাজুলি- মোলাই ফরেস্ট
ব্রহ্মপুত্রের চর মাজুলি- মোলাই ফরেস্ট

১৯৭৯ সালের কথা। ওনার বয়স তখন ১৬-১৭ বছর। মেট্রিক পাস করে বাড়িতে বসে আছেন। বাড়ি পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদী। ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে উঠেছে চর। সেই চরে একদিন বেড়াতে গিয়ে দেখলেন চরের মাটিতে ছড়িয়ে আছে শত শত মৃত সাপ। বন্যার জলে ভেসে আসা সাপগুলো চরে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু নতুন এই চর একবারেই বিরান। চারিদিকে শুধু বালু আর বালু। নেই কোন গাছ কিংবা ঘাস। বিরান এই চরের বালি সূর্যের তাপে তেতে ওঠায় সাপগুলো মারা যায়। উল্লেখ্য, সেই বছর ভারতের আসামে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। বন্যার জলে অনেক বন্য প্রাণী মারা গেছে, নয়তো হয়েছে বাস্তহারা। ব্রহ্মপুত্র তখনও বেশ আগ্রাসী নদী। এ কূল ভেঙে ও কূল গড়ে। চর জাগলেও ভেসে যায়। ফলে চরগুলোর মাটি আলগা হয়ে পানির স্রোতে ভেসে যেত। এ কারণে কোনো উদ্ভিদও জন্মাতো না।

সাপগুলোর এই মৃত দেহগুলো কিশোর যাদব পায়েংকে বেশ ভাবনায় ফেলে দিয়েছিল। মনে মনে এসব প্রাণীর জন্য একটি অভয়ারণ্য তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনটাকে আমূলে বদলে দিল। এজন্য ঘর ছাড়তে হলো, ছাড়তে হলো গ্রাম। কিন্তু নিজ সিদ্ধান্তে অটল থেকে সে শুরু করলন গাছ লাগানো। বিশাল সেই বিরানভূমিতে একা হাতে গাছ লাগিয়ে রীতিমতো একটি বনভূমি তৈরি করে ফেললেন তিনি। বর্তমানে তাঁর এই বনভূমিতে বিচরণ করে চিতাবাঘ, গণ্ডার, হরিণ, বাঁদর আর বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। প্রতি বছর হাতির একটি দল এই বনভূমিতে বিচরণ করতে আসে এবং বছরের ৬ মাস সময় এখানেই বাস করে তারা।

যাদব মোলাই পায়েং-
যাদব মোলাই পায়েং-

যাদব মোলাই পায়েং জন্মগ্রহণ আসামের জোরহাট জেলার মিশিং সম্প্রদায়ে ১৯৬৩ সালে। পুরো নাম যাদব মোলাই পায়েং। সবাই তাকে মোলাই বলে ডাকে। বর্তমানে যাদব তার পরিবার নিয়ে মোলায় কাথোনিতেই বাস করেন। প্রায় ৫০টির মতো গরু-মহিষ আছে ওনার। এদের দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন আর বনের দেখাশোনা করেন যাদব।

এই বনটাই ওনার ধ্যান-জ্ঞান। তিনি গাছের যত্ন করেন। বনের গাছগুলো যত্ন নেয়ার পাশাপাশি নিয়মিত মাটিতে পিঁপড়া, কেঁচো ইত্যাদি পোকামাকড় ছেড়ে দেন মাটি উর্বর করার জন্য। প্রতিদিন বনের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ঘুরে দেখাশোনা করেন তিনি। কোন গাছের কী অবস্থা?  কোনো প্রাণী আহত হলো কিনা? কিংবা বনের কোথাও কেউ গাছপালা কাটছে কিনা? সব খবরই রাখেন যাদব। এজন্য কোনোদিন কোনো আর্থিক সহায়তা তো দূরে থাক, উৎসাহটুকুও পাননি। বরং গ্রামবাসীদের কাছ থেকে পেয়েছেন অবহেলা। শুধুমাত্র উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই সৃষ্টি করেছেন এমন বনাঞ্চল।

বন যত বড় হচ্ছিলো, যাদব পায়েংকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছিলো। যেমন- মোলাই কাথোনিতে চরতে আসা হাতির দল গ্রামবাসীদের ক্ষেত খামার নষ্ট করে দিয়ে চলে যেত। এতে গ্রামবাসীরা এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে, তারা যাদবের বন উজাড় করে দেবে বলে হুমকি দিত। যাদব সেই হুমকিতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে একটি বুদ্ধি বের করলেন। তিনি জানতেন, হাতি কলাগাছ পছন্দ করে। যাদব বেশি করে কলাগাছ লাগালেন বনে। ব্যস, হাতির দল কলাগাছ পেয়ে সন্তুষ্ট। তাই ক্ষেত খামারের দিকে পা বাড়ালো না আর।

আরেকটি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন যাদব; যার সমাধান আজ পর্যন্ত করতে পারেননি। সেটি হলো বনের গাছ কেটে ফেলা। যাদব ‘মোলাই কাথোনি’তে অনেক সেগুন ও মেহগনি গাছ লাগিয়েছিলেন। যার বাজার মূল্য সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। জানবেনই বা কীভাবে?  তার তো আর টাকার লোভ নেই। তিনি আজ পর্যন্ত বনের কোন গাছ কাটেননি; বিক্রি করা তো দূরে থাকুক। কিন্তু অর্থলোভী মানুষ জানে সেসব গাছের মূল্য। ফল যা হবার তাই হলো। প্রায়ই বনের গাছ কেটে নিয়ে যেতে চায় তারা। অর্থলোভী এই মানুষগুলো শুধু গাছ কেটে ক্ষান্ত হতো না। বন্যপ্রাণীদের উপরও হামলা করতো। খুব স্বাভাবিকভাবে এত বড় বন যাদবের একার হাতে রক্ষণাবেক্ষণ করা খুব কঠিন ছিল। তাই গাছ কাটা ও বন্যপ্রাণী হত্যার ব্যাপারে বন মন্ত্রণালয়কে জানান তিনি। তারা প্রথমে কর্ণপাত না করলেও পরবর্তীতে আরো কিছু দুর্ঘটনা সম্পর্কে জানতে পেরে সেখানে নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ দিয়েছে। এই বনের প্রতিটি গাছ যেন তার একেকটি সন্তান। তাইতো তিনি বলেন, “এই বনের গাছ কাটার আগে যেন তারা আমাকে কাটে”।

যাদব পায়েংকে খুঁজে বের করেন ভারতীয় ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার জিতু কালিতা। ২০১০ সালে তিনি ছবি তোলার জন্য মোলাই কাথোনির রুক্ষ চরে এসে পৌঁছান। চরে নেমেই খেয়াল করেন, খানিকটা দূরে বেশ ঘন বন। তিনি ভাবলেন, এমন রুক্ষ চরে বন এল কোথা থেকে? তারপর ধীরে ধীরে খুঁজে পেলেন যাদবকে। যাদব তো তাকে দেখে তেড়ে মারতে আসেন। উনি ভেবে ছিলেন জিতু একজন বন্য প্রানি শিকারি। পরে অবশ্য জিতু যাদবকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরবর্তীতে জিতু পত্রিকায় যাদবকে নিয়ে লিখলেন। একটি ডকুমেন্টারিও তৈরি করলেন তাকে নিয়ে। ধীরে ধীরে সারা ভারত সহ সারা পৃথিবী তাকে চিনতে শুরু করলো।

ভারতের রাস্ট্রপতি আবুল কালাম আজাদ এর কাছে পুরষ্কার গ্রহণের সময়।
ভারতের রাস্ট্রপতি আবুল কালাম আজাদ এর কাছে পুরষ্কার গ্রহণের সময়।

বিশ্ব ধরিত্রী দিবসে ২০১২ সালে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় যাদব পায়েংকে একটি সংবর্ধনা দেয়। সেখানে তিনি বলেন, “আমার বন্ধুরা ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, শহরে বাস করে। আমি আমার সাধ-স্বপ্ন সবকিছু বিসর্জন দিয়েছি এই বনটার জন্য। আজ এই বন আমার ঘর। আজকের এই সংবর্ধনা, এই পুরস্কার আমার সম্পদ। আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী একজন মানুষ।” ২০১৩ সালের অক্টোবরে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর সুধির কুমার তাকে ‘ভারতের বনমানব’ (Forest Man of India) উপাধি দেয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ নাগরিক পুরস্কার পদ্মশ্রী পদক দেয়া হয় তাকে। এত এত পদক আর সম্মাননার পরও যাদবের একটাই স্বপ্ন, মৃত্যুর আগে ভারতে মোলাই কাথোনির মতো আরও বন তৈরি করে যাবেন।

একজন মানুষ একা একা একটি ১৩৬০ একর বিশাল আয়তনের বন সৃষ্টি করেছেন। শুধু একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন। কতটা ভালোবাসা আর আন্তরিকতার সাথে তিনি হয়ে উঠেছেন প্রকৃতি প্রেমী- নিঃস্বার্থভাবে। একজন মানুষের একার পক্ষে পুরো সমাজটা বদলে দেয়া সম্ভব না। কিন্তু একজন মানুষের প্রতিদিনকার ছোট ছোট কাজ একদিন একটা বিশাল পরিবর্তন এনে দিতে পারে। সেটারই একটি উজ্বল দৃষ্টান্ত যাদব মোলাই পায়েং এর বন মোলাই কাথেনি।

আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে যাদব পায়েং এর এই বন যেহেতু একটি চর তাই যেকোন সময় এটি তলিয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা তেমনটাই বলছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে হুমকির মুখে পড়বে এই বন। তাই যাদবও বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন। তবে তিনি এই বন রক্ষার জন্য বেশ নতুন নতুন চিন্তা করছেন। তিনি যেখানেই যান তার এই চিন্তা গুলো তাদেরকে শোনান। কিন্তু কেউ তার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। তাই তো তিনি এখন বিভিন্ন পুরষ্কার আর সংবর্ধনা নিতে যান না। বিরক্ত প্রকাশ করেন। তিনি হয়তো যতদিন বেঁচে থাকবেন এই মোলাই বনকে বুকে আঁকড়ে ধরে থাকবেন।

কমিক বুক 'যাদব  এবং গাছেদের বাড়ি' তে যাদব এর ছবি
কমিক বুক ‘যাদব এবং গাছেদের বাড়ি’ তে যাদব এর ছবি

যাদব মোলাই পায়েং খুবই সাধারণ একজন মানুষ। কিংবা আমার আপনার চেয়ে অনেক নগণ্য। তবুও তিনি আমার আপনার মতো কোটি মানুষের চেয়ে অনন্য। তিনি সমস্যা দেখে বসে থাকেননি। তার সামর্থ এর চেয়ে অনেক বেশি করেছেন। হয়ে উঠেছেন একটি বনের পিতা। আবার সম্মানের দিক থেকেও তার অর্জন কিন্তু অনেক। তার যে সমস্ত বন্ধুরা আজ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার তারা আদৌও রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার পাবেন কিনা তার ঠিক নেই। তাই কোন কাজই কিন্তু ছোট না। যেকোন কাজ নিষ্ঠা আর একাগ্রতার সাথে করলে একজন সাধারণ যাদব মোলাই পায়েংও হয়ে উঠতে পারে বিশ্ব ইতিহাসের পাতায়। তার সম্পর্কে গুগল কিংবা ইউটিউব এ সার্চ দেন। দেখবেন তিনি কে? তিনি একজনই যাদব মোলাই পায়েং- The Forest Man of India (ভারতের বনমানব)।

* ছবি গুলো ইন্টারনেট এর মুক্ত সোর্স থেকে নেয়া।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.