সাম্প্রতিক পোস্ট

ধানি

বারসিক ফিচার ডেস্ক::

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নদীর তীরবর্তী পরিবারের রান্নার জন্য ধানি ঘাস একটি জৈব জ্বালানি। নদীর চর জেগে উঠার পর প্রথম জন্ম  নেয় যে জৈব জ্বালানি তার নাম ধানি। বিশ্ব বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন বনের অসংখ্য জেগে উঠা চর, বনের অসংখ্য নদীর চর ও-খাল পাড়ে এবং খোলপেটুয়া, আড়পাঙ্গাশিয়া, চূনা, বলেশ্বর, রায়মঙ্গল, মরিচ্চাপ, কাকশিয়ালী, কপোতাক্ষ নদীর চরে ধানি ঘাসের ঘন বন দেখা যায়। তবে, পরিকল্পনা ও সচেতনতা সৃষ্টি করে নবায়নযোগ্য এই জৈব জ্বালানির জন্ম-বৃদ্ধি ও বর্ধন করতে পারলে প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে নদীর বাঁধ রক্ষার পাশাপাশি জ্বালানি সংকট নিরসনে অসংখ্য পরিবারের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।

ধানির বৈজ্ঞানিক নাম myriostachya wightiana। ধানি এক প্রকার ঘাস। ধান গাছের মত দেখতে বলে একে ধানি বলে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ধানির জন্ম হয়। একটি ধানি গাছ ২৫/২৬ ইঞ্চি লম্বা হয়। গাছ ঝাকালো। ধান গাছের মত ফুল, ফল ও শিষ হয়। ফুল ছোট ছোট ও সাদা। ফল গমের মত দেখতে ও চিকন। পাতা সবুজ, চিকন ও ধান পাতার মত ধারালো। ফল আসলে পাতার রং কিছুটা লালচে হয়। শিকড় ঝাকালো ও শিকড় থেকে গাছ বের হয়। ধানি কাটলে মরে যায় না। বছরে ৩ বার ধানি কাটা যায়। কার্তিক মাসে ফুল হয়। এই ঘাস কেটে রোদে শুকালে বাঁশের কঞ্চির মত শক্ত হয়। নরম মাটিতে ধানি ভালো হয়। ধানি নোনা সহনশীলও বটে। ২৫/২৬ পিপিটি লবণাক্ত সহ্য করে ধানি টিকে থাকতে পারে। প্রতিদিন জোয়ারের সময় ধানি পানির নিচে ডুবে থাকে এবং ভাটার সময় আবারও জেগে উঠে। জোয়ার-ভাটার সংমিশ্রণে ধানির বংশ বৃদ্ধি হয়। ফল পাকলে জোয়ারের পানিতে বীজ ভেসে ভাটার সময় যেখানে পড়ে থাকে সেখানেই গাছ বের হয়। জায়গা ঘিরে রাখতে পারলে ধানির ঘন বন তৈরি হয়। এই ঘাস ভেঁড়িবাঁধ রক্ষায় খুবই উপকারী।

সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ জনপদ পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাখিমারা গ্রামের মিরাতুন নেছা বলেন, “ নদীর চরে বনায়ন সৃষ্টিতে ঘেরা দেওয়ার ফলে, গরু/ছাগলে খেতে না পারায় ধানি ঘাস বেশ বড় হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে আমি ১০/১২ কাঠা নদীর চরের জায়গার ধানি ঘাস কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছি”। তিনি আরও বলেন, “এমনভাবে ধানি কেটে আনি যেন, জোয়াররের সময় পানির ঢেউ সরাসরি বাঁধে আঘাত করতে না পারে। আমার পরিবারের প্রতিমাসে ৪ মণ কাঠ লাগতো যার দাম ৬৪০ টাকা। ধানি চাষ করার ফলে ৬ মাস আমাদের কোন কাঠ কেনার প্রয়োজন হয়নি। আমরা নদীর চর ও বাঁধে গাছ ও ঘাসের যে বন তৈরি করেছি তা একদিকে বাঁধ রক্ষা করছে, আবার জ্বালানী চাহিদাও পূরণ হচ্ছে”। একই গ্রামের মাফিজা বেগম বলেন, “আগে জ্বালানির অভাব হয়নি। আগে আমাদের এলাকায় ধান চাষ হত, গরু ছিল, বাড়িতে অনেক গাছ ছিল তাই  জ্বালানি কাঠের অভাব হয়নি কখনও। কিন্তু ১৫/২০ বছর আগে এলাকায় চিংড়ি চাষ শুরু হলে ধানের চাষ বন্ধ হয়। চাষের গরু হারিয়ে যায়, শুরু হয় জ্বালানির অভাব। চলতে থাকে বাড়ির গাছপালা ও পাতা দিয়ে জ্বালানি চাহিদা পূরণের।” তিনি আরও বলেন, “কিন্তু আইলার কারণে আমাদের বসতভিটার সকল গাছপালা ধ্বংস হয়ে যায়। আইলা পরবর্তী ২ বছর বাড়ির মরা-পচা গাছের জ্বালানি দিয়ে রান্না করেছি। এরপর শুরু হয় মারাত্মক জ্বালানির অভাব। পরিবারের নিত্য জিনিসের মত জ্বালানিও কেনা শুরু হয়। জ্বালানির সংকট ও অভাবের কারণে আমরা নদীর চরের ধানি ঘাস কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছি। ধানি ঘাস কেটে বস্তা ভরে বাড়ি এনে ৬/৭ দিন রোদে শুকালে ধানি ঘাস জ্বালানো যায়। বর্তমানে পরিবারের অর্ধেক জ্বালানির চাহিদা ধানি ঘাস কেটে পূরণ করছি। এই দৃষ্টান্ত দেখে গ্রামের আম্বিয়া, নাছরিন বেগম, মোমেনা বেগম, নাজমা বেগম ধানী ঘাস কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে”।

বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবার রান্নার জন্য জৈব জ্বালানি যেমন-কাঠ, খড়-কুটা, গোবর ব্যবহার করে। গ্রামের প্রায় সব পরিবার এবং শহরের বিপুল সংখ্যক পরিবার জৈব জ্বালানি দিয়ে রান্না করে থাকে। ঢাকা শহরের একটি পরিবারের নারীরা রান্নার গ্যাস সুবিধা জ্বালানি, বৈদ্যুতিক জ্বালানির সুবিধা পাচ্ছে। পক্ষান্তরে উপকূলীয় পাখিমারা গ্রামের মাফিজার পরিবারে রান্নার জ্বালানির জন্য ধানি ঘাস, কোন নিশ্চিত উৎস নেই। শহর ও গ্রামাঞ্চলের এই জ্বালানি বৈষম্যের চিত্র খুবই ভয়াবহ। প্রাকৃতিক ঘাস জাতীয় ধানি (ধানসী) উদ্ভিদটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে ভবিষ্যতে উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

happy wheels 2
%d bloggers like this: