Posted in

আমরা এখন অনেক ভালো আছি

শ্যামনগর,সাতক্ষীরা থেকে ফজলুল হক

শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের চুনা গ্রাম জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ততার হাত থেকে কোন অংশে কম নয়। প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীর বাঁধ ভাঙ্গন চুনা গ্রামের মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আসছে। সেই চুনা গ্রামেই শিরিনা বেগমের (২৫) বেড়ে ওঠা।


শিরিনা বেগমের পিতার গফুর গাজী ছিলো এক জন দরিদ্র মানুষ। বসতভিটা ছাড়া জায়গা জমি কোন কিছুই ছিলো না। শিরিনা বেগমরা ছিলো এক ভাই আর চারটি বোন। তার মধ্যে শিরিনা বেগম ছিলো তৃতীয়। পিতার অভাবের কারণে বেশি লেখাপড়া করতে পারেনি। মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করতে পেরেছিলেন। তারপর তাকে মাত্র পনের বছর বয়সে বিয়ের পিড়িতে বসতে হয়। এখান থেকে প্রায় ১৩ বছর আগে গাবুরা ইউনিয়নের হরিসখালী গ্রামের আল মামুনের (২৭) সাথে বিয়ে হয় শিরিনা বেগমের। আল মামুনের পরিবারও ছিলো অসচ্ছল। কোন জায়গা জমিও ছিলো না। আল মামুনরা ছিলো সাত ভাই, বোন। চার ভাই আর তিন বোন। সেজন্য আল মামুন স্ত্রী শিরিনা বেগমকে নিয়ে চলে আসেন শ্বশুর বাড়িতে। শ্বশুর বাড়িতে এসে শিরিনা বেগমের স্বামী জোন মুজুরি দেওয়া এবং ইটভাটার কাজ করতেন।


এভাবেই চলতে ছিল তাঁর সংসার। কিন্তু শিরিনা বেগমের স্বামী আল মামুন ইটের ভাটায় কাজ করতে গিয়ে ডান হাতের চারটি আঙুল কেটে যায় মেশিনে। তাৎক্ষণিক চিকিৎসা করিয়েও হাতের চারটি আঙুল রক্ষা হয়নি, কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। শিরিনা বেগম ও আল মামুন যা সঞ্চয় করেছিলো, সেই টাকা হাতের চিকিৎসার জন্য খরচ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হয় শিরিনা বেগমের। বিভিন্ন জায়গা থেকে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে চলতো সংসার। আল মামুনের হাতের ক্ষত কিছুটা ভালো হলে সংসারে অভাবের কথা চিন্তা করে শ্বশুরের একটি ভাঙা নৌকা নিয়ে নদীতে দৌন দিয়ে এবং খাচা পেতে কাঁকড়া ধরতে থাকে। নৌকাটি ভাঙা হওয়ার কারণে অনেক কষ্ট হতো কাঁকড়া ধরতে।


পরর্বতীতে গত ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বারসিক ও নেটজ বাংলাদেশ (পাটনারশীপ ফর ডেভেলপমেন্ট জাস্টিস) মাধ্যমে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ (পরিবেশ) প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হলে হত দরিদ্রের তালিকায় শিরিনা বেগমের নামটি এলে চুনার গ্রামের শালিক দলের সদস্য হয়। দলের সদস্য হওয়ার কারণে আয়মূলক কাজ হিসাবে একটি নৌকা নেওয়ার কথা প্রস্তাব ও পরিকল্পণা গ্রহণ করলে তাকে মু্ন্িসগঞ্জ বাজার থেকে ১১ হাজার টাকা দিয়ে মাছ-কাঁকড়া ধরার উপকরণ হিসাবে নতুন নৌকা ক্রয় করে দেওয়া হয়। বাকি ২৫০০ হাজার টাকার হাঁস-মুরগি,বীজ ও গাছের চারা দেওয়া হয়। নৌকা পাওয়ার পরে তার স্বামী আল মামুন খুব স্বাচ্ছন্দে নৌকা নিয়ে প্রায় প্রতি মাসে ৮-৯ হাজার টাকা আয় করেন। সেই আয় থেকে পারিবারিক চাহিদা মিটানোর পাশাপাশি নিয়মিত সাপ্তাহিক মিটিং এ আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ, সঞ্চয়, কন্ট্রিবিউশন প্রদান করে যাচ্ছে। নিয়মিত দলে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকল্পে, বিভিন্ন সেবা নিয়ে আলোচনা করলে শিরিনা বেগম তার স্বামী আল মামুনের হাতের কথাটি জানান। পরিবেশ প্রকল্পের সহকর্মীদের প্রচেষ্টায় স্থানীয় বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদ ও শ্যামনগর উপজেলা সমাজসেবা অফিসে ডকুমেন্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া ও যোগাযোগের মাধ্যমে শিরিনা বেগমের স্বামী আল মামুনের একটি প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ড পান। সেই ভাতা কার্ডে প্রতি মাসে ৭৫০ টাকা করে পান।


শিরিনা বেগমের দুই সন্তানের মধ্যে এক ছেলে আর একটি মেয়ে। ছেলে সাব্বির হোসেন (১২) বছর। সে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়াশুনা করে আর মেয়ে সানিয়ার বয়স (৩) বছর। শিরিনা বেগম হাঁস ও মুরগির ডিম বিক্রয় এবং স্বামীর কাঁকড়া ধরার টাকা থেকে কিছু টাকা সঞ্চয় করছেন, প্রথমে একটি পানির ড্রাম কিনবেন বলে জানান। কারণ চুনা গ্রামে রয়েছে তীব্র সুপেয় পানির সংকট। একই সাথে যোগাযোগ ব্যব্স্থাও খুবই খারাপ। শিরিনা বেগম ও আল মামুন স্বপ্ন দেখেন ছেলে মেয়েটিকে পড়াশুনা শিখাবেন এবং শ্বশুরের ভিটায় না থেকে নিয়মিত আয় থেকে সঞ্চয় করে নিজে একটু জায়গা কিনে সেখানে বসতভিটায় গড়ে তুলবেন।


শিরিনা বেগম জানান, “পরিবেশ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা অনেক ভালো আছি, পারিবারিক স্বচ্ছলতা ফিরে পেয়েছি, নিয়মিত মিটিং ও প্রশিক্ষণে গিয়ে অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারছি এবং আমার স্বামী প্রতিবন্ধী কার্ডটি পেয়েছি। সরকারি এই সেবাটি পাইয়ে দেওয়ার জন্য বারসিককে ধন্যবাদ।’

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.