সাম্প্রতিক পোস্ট

অনুভবে, অনুরাগে ও অভিমানে লিখি

সিলভানুস লামিন

এক
আমরা প্রায়ই লিখি, লিখে থাকি। কেন লিখি? কিসের জন্য লিখি এবং কাদের জন্য লিখি? আমরা লিখি নিজের চিন্তা প্রকাশ করার জন্য, নিজের মতামত তুলে ধরার জন্য, মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য, কোন তথ্য জানানোর জন্য। অনেক সময় লিখি মানুষ, সমাজ ও দেশের বিভিন্ন সমস্যা তুৃলে ধরার জন্য এবং এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো বা প্রভাবিত করার জন্য। প্রকৃতপক্ষে, আমরা লিখি আমাদের নিজেদের জন্য, মনে প্রশান্তি পাওয়ার জন্য, প্রশংসিত হওয়ার জন্য এমনকি বিনোদিত হওয়ার জন্যও আমরা লিখি! আমরা লিখি আমাদের বন্ধুদের জন্য, সমাজের মানুষের জন্য, সুশীল সমাজের জন্য, দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য। আসলে আমাদের প্রত্যেকটি লেখার একটা উদ্দেশ্য রয়েছে, বার্তা রয়েছে এবং অভীষ্ট পাঠক রয়েছে। আমাদের প্রত্যেকটি লেখাতেই কোন কোন সময়ে আমাদের আবেগ থাকে, আমাদের ক্রোধ থাকে, আমাদের আনন্দ থাকে, কষ্ট থাকে এবং থাকে প্রেরণাও। আমরা সবাই লিখি। কেউ লিখে কাগজে, কেউ স্মার্টফোনে, কেউ কম্পিউটারে, কেউ চিত্রপটে আবার কেউবা মনের ক্যানভাসে লিখি নিরন্তরভাবে! প্রকৃতপক্ষে আমরা না লিখে থাকতে পারি না। আমাদের লেখার ভাষা ভিন্ন হতে পারে, আবার সেই ভাষা উহ্যও (নিজ মনের ক্যানভাসে লেখাগুলো নিজেকে বিনোদিত বা কষ্ট প্রশমিত করার জন্যই ব্যক্তি লিখে রাখে এবং নিজের কাছেই রেখে দেন) হতে পারে। তবে আমি মনে করি, মনের ক্যানভাসে লেখাগুলোর প্রকাশ হওয়া জরুরি। কারণ প্রতিটি ব্যক্তিই অনন্য। কে জানে তাঁর চিন্তাটি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারে কিংবা তাঁর চিন্তা, ভাবনা বা পরিকল্পনাগুলো সমৃদ্ধ দেশ ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে একটি মডেল হাজির করতে পারে! এডুয়ার্ড ডিবোনোর মতে, পৃথিবীতে ৬ ধরনের চিন্তাধারী (ডিবোনো এই চিন্তাধারী মানুষকে Six thinking hats এর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন) মানুষ রয়েছে। তাই প্রতিটি মানুষের চিন্তাই গুরুত্বপূর্ণ! তাই আসুন আমাদের ভালো, উৎপাদনশীল ও সৃষ্টিশীল চিন্তা প্রকাশের জন্য লিখি; তথ্য, শিক্ষা ও বিনোদন দিই সবাইকে।

দুই
যোগাযোগ শাস্ত্র নিয়ে যারা পড়াশোনা করেছেন তারা জানেন যে, যোগাযোগ চারটি মৌলিক কাজ করে। প্রথমত, যোগাযোগের মাধ্যমে আমরা তথ্য আদান প্রদান করি (To inform), দ্বিতীয়ত্ব যোগাযোগের মাধ্যমে আমরা শিক্ষা দেওয়ার কাজ করি ((To educate)), তৃতীয়ত্ব, যোগাযোগের মাধ্যমে আমরা প্রভাবিত করার কাজ করি (To persuade) এবং যোগাযোগের মাধ্যমে আমরা বিনোদন দেওয়ার কাজ করি (To entertain)। মূলত যোগাযোগের বিভিন্ন তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে এ চারটি কাজই আমরা দেখি; যদিও আধুনিক ভার্চুয়াল এ যুগে যোগাযোগের আরও অনেক কাজ থাকতে পারে। তাহলে মোটাদাগে আমরা দেখেছি, আমরা তথ্য দেওয়ার জন্য, শিক্ষা দেওয়ার জন্য, প্রভাবিত করার জন্য এবং বিনোদন দেওয়ার জন্য লিখি। কারণ লেখাও যোগাযোগের একটা অংশ (গণযোগাযোগ)। তবে অনেক সময় আমরা যখন লিখি তখন যোগাযোগের এ চারটি কাজের কথা আমাদের মনে থাকে না কিংবা জানি না এ কাজ সম্পর্কে। কিন্তু অজান্তে আমরা যোগাযোগের এ চারটি কাজের মধ্যে কোন না কোন কাজকে আমরা আমাদের লেখার মূল উদ্দেশ্য হিসেবেই হাজির করি। যোগাযোগের এ চারটি উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে আমরা যদি কোন লেখা লিখি তাহলে আসুন ভাবি, সেই লেখার মান ও পাঠকপ্রিয়তা কতটা হতে পারে? আমরা হয়তো অনেকেই তো এ চারটি কাজ সম্পর্কে জানি না তারপরও আমাদের অনেকের লেখার মান ও পাঠকপ্রিয়তা অনেক বেশি। অনেকেই আছেন যাদের অসম্ভব ভালো লেখার প্রতিভা রয়েছে, তাদের লেখাগুলো পড়লে তথ্য, শিক্ষা ও বিনোদন এমনকি প্রভাবিত হওয়ার ‘মন্ত্র’ও পাওয়া যায়! তাই আসুন লিখি নিজেকে এবং অন্যকে তথ্য, শিক্ষা ও বিনোদন দেওয়ার জন্য!

তিন
কোন বিষয়ে মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য, কলম ধরার জন্য কিছু উপকরণ দরকার পড়ে। আমাদের জীবনচলার পথে আমরা নানান মানুষের সাথে দেখা করি, আলোচনা করি, ভাববিনিময় করি, কোন কোন এলাকা পরিদর্শন করি, অভিজ্ঞতা অর্জন করি। মূলত এসব পর্যবেক্ষণ ও মিথস্ক্রিয়ার ফলই আমাদের লেখার উপকরণ হতে পারে। সাংবাদিকতায় একটি কথা বেশ প্রচলিত: ‘জনগণের কণ্ঠস্বরই হচ্ছে ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর’। অর্থ্যাৎ, আমরা যাদের সাথে চলি, কথা বলি, আলোচনা করি, ভাব বিনিময় করি, যাদের এলাকায় যাই, পর্যবেক্ষণ করি, অভিজ্ঞতা নিই তারাই মূলত জনগণ, আমি নিজেও জনগণের তালিকায় পড়ি। তাদের কাছ থেকে জানা কথা, তাদের এলাকার পারিপার্শ্বিকতা, তাদের কথায় আমাদের সবার লেখার উপকরণ হতে পারে। লেখার জন্য তাই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা যেমন দরকার তেমনি দরকার মনোযোগ শ্রোতা হওয়ার। আমরা যদি ঠিকমতো পর্যবেক্ষণ করি, মনোযোগী শ্রোতা হই এবং অনুধাবন করার ক্ষমতা রাখি তাহলে আমরা অনেককিছু নিয়েই লিখতে পারি। লেখা তৈরির জন্য তাই আমাদেরকেও তথ্য গ্রহণ করতে হবে, শিক্ষালাভ করতে হবে এবং বিনোদন নেওয়ার মানসিকতাও রাখতে হবে। মনে রাখি, যোগাযোগ একটি দ্বিমূখী প্রক্রিয়া (Two way process)। আমরা যেমন তথ্য, শিক্ষা বা বিনোদন দিই ঠিক তেমনি আমাদেরকেও তথ্য, শিক্ষা ও বিনোদন নেওয়ার ইচ্ছা ও মানসিকতা রাখতে হবে। তাই যোগাগের কাজকে আমরা এভাবে বর্ণনাও করতে পারি: ১. To inform and to be informed, ২. To educate and to be educated, ৩. To persuade and to be persuaded এবং ৪. To entertain and to be entertained. আমরা যদি এভাবে যোগাযোগকে ভাবি তাহলে আমাদের লেখায় সেই প্রতিফলন দেখা যাবে যেখানে আমরা উভয়কেই তথ্য, বিনোদন ও শিক্ষা দিতে পারি এবং এমনকি প্রভাবিতও করতে পারি। অন্যদিকে যখন কোন বিষয় নিয়ে লিখি আসুন আমাদের বানান (বিশেষ করে বাংলা লেখার ক্ষেত্রে বানান) সম্পর্কে সচেতন হই। বানান ভুল থাকলে লেখাগুলোর অর্থ যেমন অনেকক্ষেত্রে পরিবর্তন হয় (মন ও মণ) ঠিক তেমনি পাঠকদের জন্যও বিরক্তিকর হতে পারে। আমরা যে বার্তা দিতে চাই সেটি কাঙ্খিত শ্রোতার কাছে পৌছুবে না। ফলশ্রুতিতে যে উদ্দেশ্য (তথ্য, শিক্ষা, বিনোদন বা প্রভাব) নিয়ে লেখাটি লিখেছি সেটি পূরণ হবে না। তাই আসুন প্রকৃত ’অর্থ’ বহনকারী লেখা লিখি; তথ্য, শিক্ষা ও বিনোদন দিই এবং নিই।

চার
বর্তমানে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ নিয়ে বেশ আলোচনা হয়। সিটিজেন জার্নালিজমের কারণে প্রতিক্ষণে আমরা নানান বার্তা (তথ্য, শিক্ষা ও বিনোদন) লাভ করি। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান ভার্চুয়াল জগতে আমরা সবাই এক একজন ‘সিটিজেন জার্নালিস্ট’। কারণ আমরা সবাই কমবেশি লিখি। আমরা লিখি আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক, টিইয়িটারসহ আরও অনেক মাধ্যম)। কেউবা লিখি অনলাইন পোর্টালে বা প্রিন্ট কোন কাগজে! সিটিজেন জার্নালিজমের কারণে আজ তথ্য খুব দ্রুত গতিতে মানুষের কাছে পৌছে যায়। মানুষও খুব দ্রুত সেই তথ্য গ্রহণ করে তাদের মতামত দিতে পারে। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে সিটিজেন জার্নালিজম মুখরোচক ও ভুল তথ্যও (বার্তা ফিল্টার হয় না) পরিবেশন করে থাকে যা সমাজে নানান দ্বন্দ্ব ও সংঘাত এবং বিতর্ক তৈরি করে। তাই ভার্চুয়াল জগতে বাস করার কারণে আমাদের সবার দায়িত্ব ও কর্তব্যও বেড়ে গেছে। আমাদেরকে লিখতে হয়, বস্তুনিষ্ঠ ও সঠিক তথ্য সম্বলিত লেখা লিখতে হয়। কোন কোনক্ষেত্রে লিখতে বাধ্য হই কোন বিষয়কে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করার জন্য, প্রভাবিত করার জন্য। আমাদের লেখনির মাধ্যমে আমরা আমাদের দায়বদ্ধতা রক্ষা করি, কিছুটা হলেও ক্রোধ প্রশমিত করি। তাই আসুন লিখি, অনুরাগে, অনুভবে ও অভিমানেও লিখি। প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন করে আমাদের মধ্যে অনুরাগ জন্মে, কারও কষ্ট (সমানুভূতি বা Empathy প্রকাশ করি ), আনন্দ, ভালো কাজ দেখলে আমরা অনুভব করি কিংবা আমাদের ভেতরে অনুভুতি তৈরি হয় এবং কোন অসঙ্গতি, বঞ্চনা ও অব্যবস্থাপনা দেখলে আমাদের ক্রোধ ও অভিমান (দেশের প্রতি অধিকার ও দায়িত্ব আছে বলে অভিমানই বেশি হয় আমাদের!) হয়। তাই আসুন অনুভবে, অনুরাগে ও অভিমানেও লিখি, প্রভাবিত করার চেষ্টা করি এবং নিজেও কোন ইতিবাচক বিষয় ও কর্মে সম্পাদনে প্রভাবিত হই।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: