সাম্প্রতিক পোস্ট

প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং খাসি আদিবাসী

সিলভানুস লামিন
এক
আমার জন্ম ও বেড়ে উঠা বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সীমান্ত পাহাড়ি এলাকায়। নির্দিষ্ট করে বললে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া ও পরবর্তীতে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অবস্থিত খাসিপুঞ্জিতে (গ্রাম)। শৈশব থেকে পাহাড়ি উচু-নীচু টিলার বনজঙ্গল, পাহাড়ি ঝর্ণা, নালা, খাদ এবং আমার খাসি মানুষের সাথে মিথষ্ক্রিয়া করে, তাদের সহচার্য, সংস্পর্শ, আদর এবং ভালোবাসায় স্নাত হয়ে বেড়ে উঠেছি। নিজে একজন খাসি আদিবাসী মানুষ হিসেবে আমি খুব কাছ থেকে আমাদের খাসি মানুষের সংগ্রাম দেখেছি, প্রকৃতি ও পরিবেশকে সঙ্গী করে তাদের জীবন ও জীবিকা পরিচালনা কৌশল দেখেছি। প্রকৃতপক্ষে, আমরা খাসিরা জন্মের পর থেকে প্রকৃতি ও পরিবেশে সাথে আমাদের মিথষ্ক্রিয়া শুরু হয়। প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবন পরিচালনার কৌশল সেই শৈশব থেকে আমাদের হাতেখড়ি হয়। আমার স্পষ্ট মনে আছে, কীভাবে আমার বাবাসহ অন্যান্য খাসি মানুষেরা প্রকৃতি ও পরিবেশকে আহত না করে বনজঙ্গল থেকে তাদের খাদ্য, পুষ্টি, ওষুধসহ নানান প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করেছেন। তবে শিক্ষালাভের কারণে কোন একসময় আমাকে সেই চিরপরিচিত প্রকৃতি ও পরিবেশঘনিষ্ঠ জীবন থেকে সরে এসে শহর ও নগরের সভ্য (!) জগতে প্রবেশ করি। উচ্চশিক্ষা ও চাকুরির কারণে আমি বিগত ২৭ বছর ধরেই রাজধানী ঢাকাতে অবস্থান করি। ছুটি পেলে যদিও ছুটে যাই সেই চিরচেনা পরিবেশে; কিন্তু স্বল্প সময়ের সেই অবস্থান আমাকে তো তৃপ্তি দেয়নি বরং অনুতপ্ত করে তোলে। কেন আমি অনুতপ্ত সেই বিষয়টি নাহয় এলেখায় উহ্যই থাকুক। যাহোক, কোভিড-১৯ এর আর্শীবাদ (কোভিড পরিস্থিতির মধ্যেও ইতিবাচকতা খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা!) বা অভিশাপের কারণেই হোক, এ বছর মার্চ থেকে আগস্টের মাঝামাঝিতে পর্যন্ত আমি আমার সেই চিরচেনা গ্রামে অবস্থান করতে পেরেছি। দীর্ঘ ২৭ বছর পর আমি প্রায় পাঁচ মাসে আমি প্রকৃতি ও পরিবেশের খুব কাছাকাছি অবস্থান করার সুযোগ পেয়েছি। করোনার এই সময়ে শহরের মানুষ যখন আতংকিত, সবকিছু বাদ দিয়ে যখন তারা নিজেদের সঙ্গনিরোধ করে রেখেছেন তখন আমাদের গ্রামের মানুষকে দেখেছি দিনের পর দিন তাদের পান ও সুপারি বাগানে কাজ করতে। করোনা পরিস্থিতি তাদেরকেও বিচলিত করেছে, তাদের গ্রামটি লকডাউন হয়েছে। কৃষিজ শস্য-ফসল বিক্রি থেকে শুরু করে সবধরনের অর্থনৈতিক লেনদেন সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছে কিংবা স্বল্প পরিসরে পরিচালনা করেছে। কিন্তু কোনভাবেই তাদেরকে আতংকিত হতে দেখিনি। গ্রামে কোন খাদ্য সঙ্কটও তৈরি হয়নি। বরং পাহাড় ও বন থেকে তারা আলু, মাশরুম, শাকসবজি এবং পাহাড়ি ছোট নদী, ঝর্না, ও নালা থেকে মাছ সংগ্রহ করে ভালোই সময় কাটিয়েছেন তারা। আমিও পাহাড় ও বন থেকে তাদের এই খাদ্যসংগ্রহ অভিযানের শামিল হয়েছি অনেকবার। নিজেকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করতে সমর্থ হয়েছি। চারদিকে সবুজ আর সবুজ দেখে নিজের মন ও আত্মাকে সবুজ করার অভিপ্রায় জাগে আমার মনে। নগরের আত্মকেন্দ্রিক জীবন থেকে সাময়িক বিরতি পেয়ে আমি তাই ছুটেছি বন-বাদারে, পাহাড়ে-ঝর্নাতে এবং আমার সহজ, সরল খাাসি মানুষের মনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছি। তাদের মনে কোন জটিলতা নেই, মেকী আচরণ নেই; স্বার্থপরতা নেই। প্রকৃতির মতো তারাও সবাইকে আপন করে নেয় এবং প্রকৃতির মতোই তারা নানাভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছে অনেকবার। ভাবতে কষ্ট লাগে এই ভেবে যে, আমিও এই মানুষগুলোর বংশধর অথচ আমার ভেতরে কত জটিলতা, কত স্বার্থপরতা এখন!

দুই
খাসি আদিবাসীরা বাংলাদেশের পাহাড়ি ও বন এলাকায় বাস করতে পছন্দ করেন। কারণ তাদের জীবিকা প্রকৃতিনির্ভর। প্রকৃতি ছাড়া তাদের অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায় না। কারণ প্রকৃতিই তাদের জীবন রক্ষার একমাত্র অবলম্বন বলে তারা মনে করেন। প্রকৃতি থেকে তারা তাদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করেন। তাই প্রকৃতি তথা পাহাড়, বন বা জঙ্গল ব্যবস্থাপনায় তারা খুবই দক্ষ। বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় যেসব পাহাড়, বন রয়েছে সেগুলো আজও টিকে আছে শুধুমাত্র এই খাসি আদিবাসীদের জন্য। খাসি এলাকার যেসব পাহাড়, টিলা বা বন রয়েছে সেগুলোতে এখনও অনেক ধরনের জীববৈচিত্র্য বিদ্যমান। বিভিন্ন ধরনের দেশীয় প্রজাতির অসংখ্য গাছ রয়েছে। খাসিরা গাছ লালন-পালন করেন। কারণ তাদের পানচাষ গাছকেন্দ্রিক। গাছ না থাকলে তাদের কৃষিকাজ বলতে গেলে অচল। তাই প্রয়োজনের তাগিদেই তারা নানান ধরনের গাছ রোপণ, প্রাকৃতিকভাবে জন্ম দেওয়া গাছ পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করেন। খাসি গ্রামে গেলে যে দৃশ্যটা সর্বপ্রথমে চোখে পড়বে তা হলো সারি সারি গাছপালার গায়ে আপন মনে আকড়ে ধরে থাকা লতা জাতীয় পান এবং চারদিক ঘন ঝোপঝাড়। এছাড়া খাসিদের জীবনযাত্রা, জীবিকা অবলম্বন পদ্ধতি, প্রকৃতির সাথে নিবিড় যোগাযোগ, প্রকৃতিনির্ভর চাষাবাদ পদ্ধতিসহ আরও অনেক অনন্য দৃশ্য সহজেই চোখে পড়বে। আমি বর্তমানে যে গ্রামে বাস করি তার নাম হচ্ছে নিরালা পুঞ্জি। গ্রামটি সমতল থেকে প্রায় দেড়শ’ থেকে দুইশ’ ফুট উচুতে অবস্থিত। জানা যায়, খাসিদের গ্রামগুলোর মধ্যে এই পুঞ্জিটিই সবচে’ উচুতে অবস্থিত। গ্রামটিতে খাসিরা দীর্ঘদিন ধরে পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। অবশ্য বর্তমানে পানের পাশাপাশি কেউ কেউ সুপারি, লেবু, আনারস আবাদ করে সংসারের জন্য অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত করে। নিরালা পুঞ্জিতে প্রায় একশ’ ৭০ খাসি পরিবার রয়েছে। খাসিদের কৃষি হচ্ছে প্রকৃতিনির্ভর। এই কৃষি চর্চার ক্ষেত্রে খাসিরা তাদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান বা লোকায়ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেন। বাংলাদেশে প্রায় ৯৯ ভাগ খাসি পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। পান চাষ প্রক্রিয়ায় খাসিরা কখনও রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে না। বরং তাদের লোকায়ত জ্ঞান ও চর্চার ওপর ভিত্তি করেই এই চাষ প্রক্রিয়া পরিচালনা করে থাকে। নিরাল পুঞ্জির খাসিদের পান জুমে অসংখ্য দেশী ও নাম না জানা গাছপালা, বিভিন্ন পশু-পাখি, হরেক রকমের লতা জাতীয় উদ্ভিদ ইত্যাদি দেখা যায়। পুঞ্জির খাসিরা জানান, সন্ধ্যা হওয়ার পর বন মোরগের ডাক শোনা যায়। এছাড়া খাসিদের জুম এলাকায় যাওয়ার সময় অসংখ্য প্রজাতির পাখির কলকাকলি শোনা যায় এখনও। বেঁচে থাকার তাগিদেই খাসিরা প্রকৃতিঘনিষ্ঠ এই কৃষিব্যবস্থা পরিচালনা করেছে। তাই একজন খাসি মানুষ জন্মের পর থেকে প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে তার হাতে খড়ি হয়। কারণ জন্মের পর সে যে কৃষিব্যবস্থার সাথে পরিচিত হয় সেই কৃষিব্যবস্থাই তাকে শিখিয়ে দেয় কীভাবে প্রকৃতির কোন ক্ষতি না করে ফসল উৎপাদন করা যায়; জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন হিসেবে প্রকৃতির সম্পদের স্থায়িত্বশীল ব্যবহার করতে হয়। তবে দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, অন্যান্য কৃষিব্যবস্থায় ভর্তুকিসহ বিভিন্ন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলেও খাসিদের পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চায় সরকারি ও বেসরকারি কোনও পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা নেই। প্রকৃতিনির্ভর পান চাষে জলবায়ুজনিত খরা, শিলাবৃষ্টি হলে খাসিদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।

তিন
একটি পরিসংখ্যান মতে, বিশ্বের মোট ভূখণ্ডের ৩১% হচ্ছে বন এবং এর পরিমাণ ৪ বিলিয়ন হেক্টর। বন আমাদের পৃথিবীর সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুসংস্থান ধারণ করে; বন হচ্ছে নানা ধরনের পশু-পাখি এবং উদ্ভিদকনার নিরাপদ আবাস। খাসি আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকা পর্যালোচনা করলে দেখতো পাবো যে, খাসিহ আমরা সবাই যে খাদ্য খাই, যে পোশাক পড়ি, যেসব ঔষুধ খাই নিজেদের নিরোগ করার জন্য কিংবা যে আসবাবপত্র ব্যবহার করি এরকমই প্রায় ৫ হাজার পণ্যসামগ্রীর মূল যোগানদার হচ্ছে এই বন। বন মাটির ক্ষয়রোধ করে, জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করে (আমাদের সুন্দরবন উপকূল এলাকাকে অসংখ্যবার রক্ষা করেছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে)। অন্যদিকে আমাদের আদিবাসীদের ধর্মীয় অনেক উৎসব বনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। তবে বনের নানান অবদান ও উপকারিতার পরও বনাঞ্চল ধ্বংসের প্রতিযোগিতা চলছে বিশ্বব্যাপী। আমাদের খাসি এলাকার বেশ কিছু পুঞ্জি বিলুপ্ত হয়েছে এবং এখনও খাসিদের এলাকা দখল করার অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সহজ, সরল খাসিরা এর প্রতিবাদ করলেই নানান সহিংসতার শিকার হয়েছে অনেকবার। তাই নিজ গ্রামসহ প্রকৃতি তথা বন, পাহাড় রক্ষার জন্য খাসিরা সুদীর্ঘকাল থেকে সংগ্রাম করে আসছেন। অন্যদিকে আমরা যদি বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতির দিকে তাকাই তাহলে সেখানেও আমরা বন দখলসহ প্রকৃতিকে তছনছ করার নানান চিত্র দেখতে পাই। একটি পরিসংখ্যান মতে, বিগত ৮ হাজার বছরে বিশ্বের প্রায় ৪৫% বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে এর মধ্যে অধিকাংশই ধ্বংস হয়েছে বিগত দশকে, নিদির্ষ্ট করে বললে শিল্প বিপ্লব এবং আধুনিক কৃষির শুরুর পর থেকে। বনাঞ্চল ধ্বংসের হার এখন কিছুটা কমে গেলেও জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও) হিসেব করে দেখেছে যে, বন ধ্বংসের কারণে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ১৩ মিলিয়ন হেক্টর বনাঞ্চল হারিয়ে যাচ্ছে, যার পরিমাণ লুক্সেমবার্গের আয়তন থেকে ১৩ গুণ এবং সিঙ্গাপুরের আয়তন থেকে ১৮০ গুণ বড়। বনাঞ্চল উজাড় ও বনাঞ্চল ধ্বংস থেকে বছরে ১৫% গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসৃত হয়। বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে বনপ্রাণবৈচিত্র্য বিলুপ্ত হওয়ার হার দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চার
খাসি আদিবাসীরা তাদের জীবন দিয়ে অনেকবার বনকে রক্ষা করেছে। খাসি ছাড়াও অন্যান্য আদিবাসীরা তাদের জীবন বির্সজন দিয়েছেন অসংখ্যবার বনকে তথা বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানকে রক্ষা করার জন্য। কিন্তু দুঃখের সাথেই বলতে হয় যে, দেশের বিভিন্ন ধরনের পর্যটন কাঠামো আদিবাসীদের এলাকাতেই বেশি গড়ে তোলা হয়েছে। ইকোপার্ক, সামাজিক বনায়ন করার জন্য সরকার অনেকবার আদিবাসীদের এলাকাকে বেছে নিয়েছে। অথচ বন রক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় সবচে’ বেশি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে খাসিসহ অন্যান্য আদিবাসীরাই। তাই তো দেখা গেছে, বাংলাদেশে যে এলাকায় এখনও বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রয়েছে সেখানেই রয়েছে আদিবাসীদের আবাসস্থল। আদিবাসীরা ওই এলাকা থেকে চলে গেলে কিংবা উচ্ছেদ হলে সেই এলাকায় গড়ে ওঠা এসব বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই তো বনসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার জন্য সরকার আদিবাসীদের সম্পৃক্ত করা উচিত এবং আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। কারণ খাসিসহ অন্যান্য আদিবাসীরা বাঁচলে এ দেশের অবশিষ্ট বনাঞ্চলও বাঁচবে। আর বনাঞ্চল বাঁচলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ ও দপ্তরও সফল হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: