সাম্প্রতিক পোস্ট

কাজের মধ্যেই দিন কাটে চরের পারভীন বেগমের

হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ থেকে মুকতার হোসেন
‘আমার নাম পারভীন বেগম। চরে আমার বাড়ি। ছোট থ্যাইকা বড় হইছি চরে। বাপ মা বিয়ে সাদী দিছে স্বামীর সংসার করতেছি। মেয়ে একটা বিয়ে দিছি আর পোলা মেয়েরা লেহা পড়া করতেছে। চরে কৃষি কাজ করি, সারাদিন গরু বাছুর রাহি, বাড়ি ঘরে চকে কামগাছ করি এ্যামবা আমাগো সময় ক্যাটা যায়।’


উপরোক্ত বাক্যগুলোতে হরিরামপুর চরাঞ্চলে বসবাসকারী পারভীন বেগম কথা ধ্বনিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘খুব ভোরে ঘুম থ্যাকা উঠি, কতদিন আযানের কালে উঠি, ব্যাটারা ঘুম থ্যাকা দেরি করে উঠে। আমি ভোরে বাড়ির আসিবাসি কামকাজ সারি, ঘরদুয়ার হুরি (ঝাড়–), থালা-বাটি মাজি। তারপর খড়ি জাবা চুলার পারে যোগার যন্ত্র করি। শাক তরকারী যোগার করে রানদা তুলে দেই। আবার রানদার আগে গরু বাছুর আতালে বান্ধি। তাদের ঘাস দেই, কলাইয়ের ভুষি, ভুট্টার ডাটা খেতে দেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাড়ির ব্যাটা পোলার ঘুম থেকে উঠে কতদিন বাজারে যায়, শাকপাতা, লাউ, দুধ বেছপার যায়। আমি বাড়ির হগলকে খাইবার দেই। আবার সংসারে কাজ শুরু করি। যদি বাড়ি কাজ থ্যাকে যেমন ধরেন, গতর থাকে কালাই, হরষা, বাদাম, ভৃটা, ধানের গতর নেওয়া, তিল, কাউন গতেরের শেষ নাই যহন যেটা আসে। সব কামগাছ করতে হয়। আর যদি বাড়ি ঘরে কামগাছ থাহে তাইলে করি নাইলে চকে ঘাস কাটতি যাই, কত সময় চক থেকে খড়ি যাবা যোগার করে আনি।’


পারভীন বেগমের উপরোক্ত কথা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘুম থেকে উঠার পর তাঁর কাজ শুরু হয় এবং ঘুমানোর আগ পর্যন্ত তিনি কাজেই ব্যস্ত থাকেন। সংসারের টুকটাক কাজের পাশাপাশি মাঠেঘাঠে নানান কাজের সাথে তিনি জড়িত। সন্তানদের দেখাশোনা, রান্নাবান্না করা, পরিবারের সবাইকে খাওয়ানো, দেখভাল করা তো প্রতিদিনই করেন তিনি। এছাড়া ঘরের গৃহপালিত পশুগুলোর দেখভালের দায়িত্ব তাঁর। চরের মতো গ্রামের বেশিভাগ নারীই এভাবে তাদের জীবন পরিচালনা করে আসছেন। পরিবারে কারা বেশি কাজ করেন এ নিয়ে যদি বিশ্লেষণে যাই তাহলে দেখতে পারবো যে নারীরাই সবচে’ বেশি কাজ করেন। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের নারীদের কাজ যেন শেষই হতে চায় না। পারভীন বেগম সন্তানদের দেখাশোনা করেন, তাদের কাপড়চোড় ধুয়ে দেন। ঘর গোছান, বাসনকাসন মাজেন, ঘরের বিছানা ঠিক করেন ইত্যাদি কাজ তো প্রতিদিনই করেন। এর বাইরে তিনি গরুকে ঘাস খেতে দেন, গরুকে গোসল করান, গাছগাছালি পরিচর্যা করেন। এছাড়া তিনি মাঠে পুরুষের পাশাপাশি কৃষিকাজ করেন। এভাবে ঘুম থেকে উঠার পর ঘুমানোর আগ পর্যন্ত তাকে নানান কাজ করতে হয়। এতকিছু করার পরও তিনি কখনো অভিযোগ করেননি, ক্লান্ত হলেও কখনও প্রকাশ করেননি। গ্রামীণ নারীরা তাদের সংসারকে সচল করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেন যদিও তাদের এই পরিশ্রমের মূল্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কদাচিৎ স্বীকৃতি দেয়। চরসহ গ্রামীণ নারীদের এই অবদান অনেকসময়ই প্রকাশিত হয় না।


পারভীন বেমন জানান, তিনি অনেক কাজই করেন। আবার যখন কাজ কম থাকে তখন মাঝে মধ্যে বাড়ির সবাই মিলে বেড়াতে যান। গ্রামে যখন সিন্নি সালাত হয় সেখানে যান, মেলা গান বাজনার শুনতে যান। এভাবে নিজেদেরকে বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতেই তারা তৃপ্তি হন, খুশি হন। এটাই একমাত্র তাদের প্রাপ্য বলে তারা মনে করেন। তিনি জানান, হাট বাজারে তেমন যাওয়া হয় না তাদের।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: