Posted in

গরু ছাগলের হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য গোবর ছিটানো পদ্ধতি

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়

নতুন কিছু সৃষ্টি বা তৈরি করা মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। প্রতিদিন কাজ করতে গিয়ে তারা নানা ধরণের সমস্যায় পড়েন। তা থেকে উত্তোরণ ঘটাতে কখনো বেছে নেয় অন্যের শেখানো কৌশল। আবার কখনো নিজস্ব চিন্তা দিয়ে নিজেই আবিষ্কার করেন সমস্যা মোকাবেলার পদ্ধতি। তাঁদের এই পদ্ধতি সব সময় পরিবেশসম্মত এবং প্রাকৃতিক উপাদান নির্ভর হয়ে থাকে।

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ মানুষই কৃষির সাথে জড়িত। সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা অবধি তাঁদের সকল কার্যক্রম এবং চিন্তা চেতনা কৃষিকে ঘিরেই। তাই যখন কৃষির সাথে সম্পর্কিত কোনো দূর্যোগ চলে আসে তখন সেটাকে তারা গুরুত্ব দেয় বেশি। চাষাবাদের কোনো উপকরণ যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে তারা সব সময় খেয়াল রাখেন। বিশেষ করে নারীরা সংসারের কোনো উপাদান যেমন সযত্নে আগলে রাখেন তেমনি তাঁদের রোপণকৃত বীজ, সব্জী বা গাছের চারারও তেমনি যত্ন করেন।

IMG_20180611_141025
বিভিন্ন রোগ বালাই বা পোকা মাকড়ের আক্রমণ ছাড়াও গরু ও ছাগল ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে। “ছাগলে কি না খায়” এই প্রবাদ বাক্যটি পুরোপুরি প্রমাণ করতে ছাগল সর্বদা কোনো না কোনো গাছের পাতা সুযোগ পেলেই খেতে থাকে। কোনো গাছে যদি একবার ছাগলের মুখ লাগে তবে সেই গাছ কখনোই বড় হয়না।

নীচু আকারের গাছ যেগুলো ছাগল সহজে নাগাল পায় সেগুলোই সবার আগে শেষ করে। তবে উচ্চতার কারণে গরু বড় গাছের পাতা সহজেই খেতে পারে। কিন্তু খসখসে ধরণের পাতা যেমন লাউ, কুমড়া ইত্যাদি পাতা কম খায়। কাঁঠাল, কলা, আম, জাম ইত্যাদি গাছের পাতাও এসব প্রাণির পছন্দের খাবার। সব্জী ও ফলজ গাছের চারাকে বেড়া দিয়ে এ সমস্ত প্রাণিদের হাত থেকে রক্ষা করা যায় না।

তাই বিভিন্ন ফলের চারা গাছ ও সব্জীকে ছাগল, গরুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সুলতানগাতী গ্রামের ফিরোজা আক্তার নিজের বুদ্ধিতে একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। সেটি হলো গাছের পাতায় গোবর ছিটানো পদ্ধতি। গরুর গোবরে এক ধরণের ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। আবার এই গোবর গাছের পাতায় দেয়া হলে শুকিয়ে খসখসে হয়ে যায়। যে কারণে কোনো প্রাণিই তখন গাছের পাতা খেতে পারেনা।

IMG_20180611_141046
এই পদ্ধতিতে কোনো খরচ নেই। শুধু গোবর আর পানি হলেই চলে। গোবর পানিতে ভালো করে গুলে ঝাঁটা বা হাত দিয়ে গাছের পাতার উপর ছিটিয়ে দিলেই কাজ শেষ। গোবর শুকিয়ে পাতার উপর এক ধরণের প্রলেপ তৈরি করে। গরু বা ছাগল প্রথমে পাতা খেয়ে নিলেও পরে আর কোনো গাছের ধারে কাছে যায় না। গাছ বড় হয়ে গেলে তখন আর গোবর ছিটাতে হয়না। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে যেমন ডাটা, মরিচ ইত্যাদি বীজ সংরক্ষণের বেলায় গাছে গোবর ছিটিয়ে রাখেন। কারণ জমি থেকে অন্যান্য সব্জী উঠিয়ে নিলে যখন শুধুমাত্র বীজের জন্য রাখা গাছগুলো দীর্ঘদিন থাকে তখন ছাগল, গরুর আক্রমণ বেশি হয়। এ সময়েও গোবর ছিটানোর এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর।

তবে বর্ষাকালে এটি সঠিক কাজে দেয়না। বৃষ্টির পানিতে গোবর ধুয়ে যায়। অবশ্য এ সময় ছাগল বা গরু ছেড়ে রাখা হয় না। কারণ তখন চারিদিকে পানি থাকে। ঘাস খাওয়ার পর্যাপ্ত জায়গা থাকেনা। শুষ্ক মৌসুমে এই পদ্ধতি অবলম্বন করে ফিরোজা আক্তার সব্জী ও ফলের চারা গাছ রক্ষা করেন। তাঁর পাশাপাশি এই গ্রামে এখন অনেকেই এই চর্চা শুরু করেছেন। শুধু এই গ্রামেই নয়, পার্শ্ববর্তী গ্রাম মাটিকাটা, নসিবপুর গ্রামেও এই চর্চা দেখতে পাওয়া যায়।

আমাদের পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে কৃষিজ উপকরণ সংরক্ষণ করার চর্চা সব সময় চলমান। এই চর্চার মাধ্যমে একদিকে যেমন ফসল রক্ষা করা যায় অন্যদিকে কৃষাণীর জ্ঞানের পরিধি বাড়ে। আবার এ সব কাজের মাধ্যমে সমাজে তাঁদের মর্যাদাও বৃদ্ধি পায়। অনেকে এই সকল পদ্ধতি অনুসরণ করার ফলে তাঁরা সমাজে পরিচিতি লাভ করেন। নারীদের উদ্ভাবনী আর একাগ্রতায় আমাদের কৃষি এখনো টিকে আছে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.