পানির জন্য হাহাকার হচ্ছে না কোন প্রতিকার

রাজশাহী থেকে অমিত সরকার
‘আপনারা কি শুনবেন আর কত জানবেন আমাদের কষ্টের কথা, সমাধান কি আমরা মরার পরে হবে? খালি নাম লিখে নিয়ে কথা বলে চলে যান সমাধান তো করেন না। বেলা (সূর্য) মাথায় উঠলে বাহিরে থাকা যায় না। গরু, ছাগলগুলো সব এনে গাছের নিচে ছায়া জায়গায় রাখতে হয়। গরমে শরীর অস্থির হয়। কাজ কাম কিছু করার বুদ্ধি নেই।’ কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার মন্ডুমালা পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের মন্ডুমালা গ্রামের মৃত আফজাল হোসেন এর স্ত্রী রাশেদা বেগম (৫০+)। মন্ডুমালার করিমপুর গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম ও বেড়ে উঠা রাশেদা বেগম দারিদ্রতার কারণে স্কুলের বারান্দায় বই নিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়নি কখনোই। মাত্র ১৫/১৬ বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে চলে আসেন স্বামীর ঘরে। ভূমিহীন স্বামী খাসজমির উপর ছোট মাটির বাড়িতে গড়ে উঠে রাশেদা বেগমের সংসার। আফজাল হোসেন পেশায় ছিলেন দিনমজুর। দিনমজুরি করে যা আয় হতো তাই দিয়ে সংসার চালাতেন। তিন কন্যার জননী রাশেদা বেগম পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী স্বামীকে দশ বছর আগে হারান। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়ে রাশেদা বেগম এখন ছোট মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন। একটি গরু, দুটি ছাগল ৬টি মুরগি পালন করে যা আয় হয় সেখান থেকেই সংসার চলে। জলাশয় না থাকার কারণে হাঁস পালন করতে পারেন না।


জলবায়ুর মাত্রা অতিরিক্ত পরিবর্তনজনিত কারণে রাশেদা বেগমের স্বাভাবিক জীবনধারণ অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন ছোট চার পাঁচ বছর বয়স তখন প্রচন্ড খরায় এলাকায় জমি চাষাবাদ করা যায়নি পরপর তিন বছর। বৃষ্টি ছিল না তখন এমন ডিপও (গভীর নলকূপ) ছিল না। তাই জমিগুলো পড়ে ছিলো। খাওয়ার কষ্ট হয়েছিল এলাকায়। পরে আবার স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন চার পাঁচ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে আমাদের এলাকায় আষাঢ় শ্রাবণ মাসেও বর্ষা হচ্ছে না। বৃষ্টি নেই ভ্যাপসা গরম। পানির কষ্টে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ। আমরা ছোট বেলায় ইন্দিরা (কোয়া) থেকে পানি পেতাম। কিন্তু ডিপগুলো বসার পর ইন্দিরাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এখন বৃষ্টি হচ্ছে না। তাপ বেশি হওয়ায় মাটির নিচের পানি আরও নিচে নেমে গেছে। ডিপগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে আমাদের এলাকায় পানির কষ্ট সব থেকে বেশি হয়েছে।’


রাশেদা বেগম বাড়ির ভিতরে নিয়ে গিয়ে দেখালেন সারি সারি পানি সংরক্ষণ করে রাখা বোতল, জার, কলস, ডেগ, বালতি সবকিছু পানি ভর্তি। রাশেদা বেগম তার পানি সংরক্ষণ দেখাতে গিয়ে বলছিলেন, তার বাড়ির পাশে একজনের বাড়িতে সাবমারসেবল আছে ওখান থেকে পানি টেনে আনি। তারপর সেই পানি দিয়ে গোসল, খাওয়া রান্না করতে হয়। দূর থেকে রোজ এত পানি কলসে করে সংগ্রহ করে আনতে গিয়ে রাশেদা বেগমের মাজার সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পানির অভাবে মাসে ৩/৪ দিন এই গরমেও স্নান না করে থাকতে হয়।’ গরু, ছাগল ও মুরগিগুলোর তীব্র গরমে হঠাৎ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের রোগগুলোও বেড়ে গেছে।


কেনো এমন দিনকে দিন খাবার জল শেষ হয়ে যাচ্ছে? কি মনে হয় আপনার জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সব খেলা, আগের মতন বৃষ্টি নেই। বৃষ্টি না হলে মাটির নিচের পানি বাড়বে না। বৃষ্টি কম হচ্ছে আর নিচ থেকে পানি বেশি তোলা হচ্ছে। তাই নিচের পানি শেষ হয়ে যাচ্ছে।’ তার যুবক বয়সের পরিবেশ ও আবহাওয়া আর বর্তমান সময়ের পরিবেশ ও আবহাওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা গরীব মানুষ মাঠে ঘাটে কাজ করে খাই। আগের দিনের আবহাওয়া আর এখনকার আবহাওয়া আকাশ পাতাল বদলে গেছে। আগে আমরা বুঝতাম পূর্বের বাতাস হয় ঠান্ডা। এই বাতাস বইলে বুঝতাম বৃষ্টি হবে। আর দক্ষিণা বাতাস গরম। এই বাতাস বইলে বুঝতাম খরা হবে। পশ্চিমা বাতাস উঠলেই বৃষ্টি হতো আর উত্তরা বাতাস বইলে বুঝতাম ঝড় হবে সবাই সাবধান হতাম। এখন কিছুই বুঝতে পারিনা। হঠাৎ করে গরম হঠাৎ করে বৃষ্টি আবার হঠাৎ করে ঠান্ডা চলে আসে।’


রাশেদা বেগম আরও বলেন, ‘অতিরিক্ত গরমে আমার প্রেসার বেড়ে যায়। স্বর্দি, কাশি, জ্বর হয়। আমি তেতুল এর আচার, আমের আচারসহ টক জাতীয় খাবার ঘরে রাখি। প্রেশার বাড়লে তেতুল এর টক খেলে তা নিয়ন্ত্রণ থাকে। আশেপাশে ইটভাটা তৈরি করে আমাদের আবহাওয়া আরও বেশি গরম হয়েছে। তীব্র তাপদহ খরা, অনাবৃষ্টিসহ নানাবিধ কারণে এলাকায় কাজের চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে পুরুষরা কাজ হারিয়ে আয়ের আশায় বছরের একটা সময় ৩/৪ মাসের জন্য শহরমূখী হয়।’


শুধু গ্রামে নয় এই পানির সংকট রাজশাহী নগরের প্রান্তিক মানুষের মধ্যেও আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবসহ নানা সংকটে গ্রামাঞ্চলের নি¤œ আয়ের মানুষগুলো তাদের কর্মসংস্থান হারিয়ে কাজের আশায় নগরে এসে বিভিন্ন বস্তিতে বসবাস শুরু করেন। রাজশাহী নগরীর বস্তিগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বস্তিতেই সুপেয় পানির সমস্যা রয়েছে। সাধারণত ৬০ থেকে ৭০টি পরিবারের জন্য ১/২ টি টিউবয়েল রয়েছে খাবার পানির জন্য। রাজশাহী নগরীর রেললাইন ঘেঁষে গড়ে উঠা জামালপুর বস্তির চম্পা বেগম (৪৫+) বলেন, ‘২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জামালপুর এই বস্তিতে বসবাস করি। এই কলনীতে প্রায় ৭৫টি পরিবারের বসবাস। এত মানুষের জন্য মাত্র তিনটি টিউবয়েল রয়েছে। সকলের খাবার পানি ও গোসলের পানি এই টিউবয়েল থেকে সংগ্রহ করতে হয়।’
অতিরিক্ত চাপের কারণে মাঝে মাঝেই টিউবয়েল নষ্ট হয়ে যায়। আবার খরার সময় পানি উঠেনা টিউবয়েলে। তখন দূর থেকে সাপ্লাই পানির ট্যাপ থেকে পানি এনে খাওয়াসহ পরিবারের সকল কাজ করতে হয় বস্তিবাসীদের। বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিনকে দিন নেমে যাওয়ার কারণে গ্রাম কিংবা শহর সব জায়গায় পানির সংকট চরম অবস্থায় পৌছে গেছে। যার প্রভাব সব থেকে বেশি পড়ে নি¤œ আয়ের মানুষের মধ্যে।


উন্নত রাষ্ট্রের বিলাসী জীবনযাপন ব্যবস্থা পৃথিবীর জলবায়ুর স্বাভাবিক পরিবর্তনকে অস্বাভাবিক করে তুলেছে। যার ফলে বাংলাদেশের মত অধিক জনসংখ্যার ছোট দেশগুলো জলবায়ুর এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সমস্যা মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত গরম, অতি খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, ঝড়সহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে, যা বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে অস্বাভাবিক করে তুলেছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের এ উদ্বেগজনক বিপর্যয় রোধে করণীয় নির্ধারণ জরুরি। জানি না কে এগিয়ে আসবেন।

happy wheels 2

Comments