Posted in

সোনা ঠেলে লোনা ঢোকানো

শ্যামনগর,সাতক্ষীরা থেকে মফিজুর রহমান

“লবণ পানির ঘের হলো, আর আমাদের ডাক্তারের কাছে যাওয়া শুরু হল। লবণ পানির কারণে এ অঞ্চল থেকে তিতির, কাঠ ময়ূর, বালিহাঁস, লাল মাছরাঙ্গা, ডাক, চন্দনা, হরিয়াল, ব্যাঙ, সাপ, বেজি, শামুক, স্থানীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও পাখিসহ অসংখ্য প্রাণবৈচিত্র্য হারিয়ে গেছে।” একান্ত আলাপচারিতায় এভাবেই লবণাক্ততার প্রভাব বর্ণনা করছিলেন  সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাখিমারা গ্রামের কদবানু বেগম (৭০)।

কদবানু বেগম আরও জানান, নিশুতি রাতে ডাহুকের মিষ্টি ডাক এখন আর শোনা যায় না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসতো ঘুঘুর ডাক। এখন আর সে ডাক শোনা যায় না। কয়েক প্রজাতির ঘুঘু পাখিও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ঝাকে ঝাকে বাবুই পাখির হাত থেকে ক্ষেতের পাকা ধান রক্ষা করতে পাহারা দিতে হতো সারাদিন। সেই বাবুই পাখি এখন আর চোখে পড়ে না। আগের দিনে গরমকালে আকাশে উড়তো চাতক পাখি। বলা হত, চাতক উড়লে বৃষ্টি হবে। সে চাতকের এখন আর দেখা মেলে না। কমে গেছে শিকারি পাখি চিলের সংখ্যা। ছো মেরে কখন নিয়ে যাবে হাঁস-মুরগির বাচ্চা-এ নিয়ে ভাবতে হয় না বাড়ির গৃহিনীদের। প্রকৃতির সুইপার শকুন এবং পানির সুইপার বলে খ্যাত গুই সাপের দেখা মেলা ভার। কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাস দিয়ে ঝাঁক বেঁধে উড়ে যেত বকের দল, সে দৃশ্য আর দেখা যায় না।
2
এলাকা থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক উপাদান তথা গাছপালা, ঘাস এবং নানা ধরনের উদ্ভিদ হারিয়ে যাওয়ায় মানুষের জীবন-জীবিকায় নানান পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। একসময় জ্বালানির অভাব হতো না এলাকায়। তবে চিংড়ি চাষের পর থেকে জ্বালানির প্রকট অভাব দেখা দিয়েছে। পাখিমারা গ্রামের মাফিজা বেগম জানান, কখনও জ্বালানির অভাব হয়নি। আগে এলাকায় ধান চাষ হতো। গরু ছিল। বাড়িতে অনেক গাছ ছিল। কিন্তু ২৫/৩০ বছর আগে থেকে এলাকায় লবণ পানির ঘের শুরু হলে ধান চাষ বন্ধ হয়ে যায়। এলাকা থেকে গরুও হারিয়ে যায়। ধীরে ধীরে শুরু হয় জ্বালানির অভাব। এভাবে মানুষ বাধ্য হয়েই জ্বালানি কাঠের বিকল্প খুঁজতে শুরু করে। এই প্রসঙ্গে পাখিমারা গ্রামের আলেয়া, ছবুরা, তাহমিনা, কদবানু ও মিরাতুন নেছা জানান, জ্বালানির অভাব মেটাতে নদীর চরের ধানি ঘাস ব্যবহার করেন। ঘেরা দিয়ে ধানি ঘাস বড় করায় ছাগলে খেতে পারে না। আগে তাদের প্রতিমাসে চার মণ জ্বালানি কাঠ লাগতো। এখন আর লাগে না। ওই সময় ঘেরা দিয়ে ধানি ঘাস বড় করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিল বারসিক। ঘেরা দেওয়ার জন্য উপকরণ সহযোগিতাও দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। যা অনেক উপকারে আসছে বলে মনে  করেন তারা। প্রাক্তন ইউপি সদস্য আশরাফ হোসেন বলেন, “বনায়ন সৃষ্টি ও রক্ষা ছাড়া মানুষের জ্বালানির কষ্ট দূর করা সম্ভব না। যে যার অবস্থান থেকে এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। তাতে আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেও রক্ষা পাব।”

3
পদ্মপুকুর গ্রামের মাফুরা বেগম জানান, লবণ পানির ঘেরের কারণে এলাকার মানুষ পূর্বপরুষের পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে। কারণ ১০ বিঘার একটি চিংড়ি ঘেরে সারাবছর একজন কর্মচারী হলে চলে। কিন্তু ১০ বিঘার কৃষি জমিতে এক মাস ৩০ জন লোক কাজ করতে পারে। বর্ষাকালে জমি চাষ, রোয়া, ধান লাগানো, ঘাস বাছা, ধান কাটা ও মাড়ায় করার জন্য তিনজন মানুষের ৩ মাস ভালোমত কাজ হতো। কিন্তু চিংড়ি ঘেরে ৩৩ জন লোকের কাজ একজন মানুষ করছে। এর ফলে ৩২ জন মানুষকে কাজের জন্য পেশা পরিবর্তন করে অন্য এলাকায় কাজের জন্য যেতে হচ্ছে। কৃষি কাজ ছেড়ে মানুষ এখন দূর দূরান্তের ইটভাটায়, মাটির কাজ, ভ্যান চালানোসহ বিভিন্ন কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। বছরে নয় মাস পুরুষদের বাইরে থাকতে হচ্ছে। ফলে অভিভাবক শূন্য পরিবারটির সব দায়িত্ব পড়ছে নারীর উপর। কাজের জন্য বাইরে থাকা পুরুষেরা সময় মত সাংসারিক খরচ বাড়িতে পাঠাতে পারছে না। ফলে নারীদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সন্তানসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবন ধারণের জন্য অর্থ উপার্জন করার দায়িত্ব ওই নারীকে নিতে হচ্ছে।
1
স্থানীয়রা জানান, লবণ পানির ঘের শুরু হওয়ার আগে পদ্মপুকুর ইউনিয়নের সব গ্রামে প্রত্যেক পারিবারেই হাঁস, মুরগি, ভেড়া, ছাগল ও গরু, মহিষ পালন করা হতো। কিন্তু গ্রামের চারিদিকে লবণ পানির ঘের হওয়ায় গবাদিপশু-পাখির খাদ্য, অ-চাষকৃত উদ্ভিদ, চারণভূমি ও সুপেয় পানির উৎস বিনষ্ট হয়ে যায়। ফলে বিলুপ্তর পথে প্রাণবৈচিত্র্য। বিপন্ন হচ্ছে প্রান্তিক জীবন ও জীবিকা। এভাবে সোনার ফসলের পরিবর্তে এলাকায় লোনা জলের আধিক্য দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। মাঠের সবুজ আভা হারিয়ে আজ বিবর্ণ রূপ ধারণ করেছে। ধূসর কৃষিমাঠে আজ জায়গা করে নিয়েছে লোনা জলনির্ভর চিংড়ি চাষ। অধিক লাভের আশায় মানুষ সোনাকে দূরে ঠেলে লোনাকে আপন করে নেওয়ার কারণে নানান সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন এলাকায় প্রাকৃতিক কোন উপাদানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। প্রাকৃতিক উপাদান হারিয়ে গেলে মানুষের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক, আন্তঃনির্ভরশীলতা এবং বৈচিত্র্যময় জীবন ও জীবিকাও হারিয়ে যাবে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.