সাম্প্রতিক পোস্ট

মানিকগঞ্জে  গাজর বিপ্লব! রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে

মানিকগঞ্জে গাজর বিপ্লব! রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে

মানিকগঞ্জ থেকে আব্দুর রাজ্জাক ঃ 

প্রতিবছরের ন্যায় এবারো সিংগাইরে সোনালি সবজি গাজর চাষের বিপ্লব ঘটেছে। বাম্পার ফলনে ভালো মূল্য পাওয়ায় কৃষকদের মুখে ফুঠেছে হাসির ঝিলিক। পাশাপাশি ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে এ অঞ্চলের গাজর চাষীরা। ঢাকাসহ দেশের সর্বত্রই রয়েছে সিংগারের গাজরের ব্যাপক চাহিদা। দেশের গন্ডি পেরিয়ে এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এ গাজর।

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা দেশের গাজর খ্যাত এলাকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে প্রায় এক যুগ। যদিও এ এলাকায় গাজর চাষ শুরু হয়েছে আরো দু‘দশক আগে থেকে। শুরুতে এ উপজেলার জয়মন্টপ ইউনিয়নের দেউলী-দশানিসহ আশে-পাশের গ্রামের কতিপয় চাষি স্বল্প পরিসরে গাজর চাষ শুরু করেন। এলাকার মাটি গাজর চাষের বিশেষ উপযোগি এবং মাত্র ৩ মাসে উৎপাদন খরচ বাদে মোটা অংকের টাকা লাভ হওয়ায় প্রতিবছর এর আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজার জাতের অনুপযোগি গাজর ও পাতা গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় চাষি পরিবারগুলো গরু পালন করে বাড়তি আয়ের লাভ মুখ দেখছেন। ফলে এখানকার চাষিরা অন্য যে কোন ফসলের চেয়ে লাভবান হচ্ছেন গাজর চাষ করে। গাজরে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিন ও ভিটামিন-বি। সালাদ, হালুয়া ও স্যুপ ছাড়াও সবজি হিসেবে গাজর বেশ জনপ্রিয়।

0002

এক সময়ে যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরাতো। বাসযোগ্য কোনো ঘর ছিলো না। তারা আজ শুধু গাজর চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাদের বাড়িতে গড়ে উঠেছে টিনের ঘর বা বিল্ডিং। বছরের পর বছর গাজর চাষ করে তাদের পরিবারে এসেছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। ঘুরিয়েছেন ভাগ্যের চাকা। জয়মন্টপ, কিটিংচর, লক্ষ্মীপুর , কানাইনগর, নীলটেক, মোসলেমাবাদ, মেদুলিয়া, ভাকুম, নয়াডাঙ্গী, বিন্নাডাঙ্গী, চর-দূর্গাপুর, আজিপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের ৬ হাজার কৃষক এখন সাবলম্বী। অধিক লাভ হওয়ায় নিজেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরির্বতনে গাজর চাষের দিকে ঝুঁকছেন এ অঞ্চলের কৃষকেরা।

উপজেলার গাজর চাষ হওয়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এখন চলছে গাজর তোলা ও বাজার জাত করার মহা কর্মযজ্ঞ। জমি থেকে তোলা পরিপুষ্ট গাজর খাল-বিলের আশে-পাশে কিংবা বাড়িতে গর্ত করে চাষিরা সারিবদ্ধভাবে বসে পায়ের ধাক্কায়-ধাক্কায় করছেন ধোয়ার কাজ। কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে সারি গান। ধোয়া শেষ হতেই গাজরগুলো বস্তা ভর্তি করে ট্রাকযোগে চলে যাচ্ছে রাজধানীর কাওরান বাজার, শ্যাম বাজার, মিরপুর ও সাভারে। সেখানে বিক্রি হচ্ছে পাইকারী ও খুচরা মূল্যে। দামও পাচ্ছেন ভালো। বর্তমানে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে সিংগাইরের সোনালি সবজি এ গাজর। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যর দেশগুলোতে সিংগাইরের গাজরের চাহিদা ব্যাপক।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর প্রায় ৮ হাজার ৩শ বিঘা (সাড়ে ১১শ হেক্টর) জমিতে গাজর চাষ হয়েছে। ফলনও হয়েছে ভালো। দাম পাচ্ছেন আশানুরূপ। উর্বরমাটি অুনকূল পরিবেশ ও ভালো বীজ সরবরাহ থাকায় ভালো ফলন হয়েছে।

এদিকে, গাজর রাখার জন্য সিংগাইরের জয়মন্টপ-ভাকুম গ্রামে কণ্ঠ শিল্পী মমতাজ বেগম এমপি‘র ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মিত “মধু–উজালা” নামে একমাত্র হিমাগার আছে তাও ধারণ ক্ষমতা অনেক কম। যেখানে মাত্র সাড়ে ৪ হাজার মেট্রিক টন আলু-গাজর রাখা যায় । প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। যার কারণে বাধ্য হয়ে মৌসুমে অল্প দামেই গাজর বিক্রি করতে হয়। এ এলাকায় আরও হিমাগার নির্মাণ করা হলে এ অঞ্চলের কৃষকরা আরও লাভবান হতো। মাত্র ৩ মাস সংরক্ষণ করা গেলেই প্রায় দ্বিগুণ দামে গাজর বিক্রি করা যায়।

তবে এ এলাকার কিছু সংখ্যক কৃষক ঢাকা ও কুমিল্লার হিমাগারে গাজর রাখেন। গাজর চাষি ও ব্যবসায়ী কানাইনগর গ্রামের আলী সর্দার (৫০) বলেন, “এ বছর ১২ বিঘা জমিতে গাজর চাষ করেছি। পাশাপাশি ব্যবসার জন্য ৭০ বিঘা জমির গাজর চাষিদের কাছ থেকে কিনেছি।” দাম থাকার কারণে খরচ বাদে লাভবান হচ্ছেন বলে তিনি জানান। আরেক কৃষক আফজাল হোসেন (২৮) বলেন, “এ মৌসুমে খরচ বাদে বিঘা প্রতি প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকা লাভ হচ্ছে। উৎপাদিত গাজর হিমাগারে রাখতে পারলে আরো ২-৩ গুণ বেমি দামে বিক্রি করতে পারতাম।”

0001

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. টিপু সুলতান বলেন, “আর্থিকভাবে এ অঞ্চলের প্রধান ফসল গাজর। বছরের প্রায় ১০ কোটি টাকার গাজর বিক্রি হয়। কৃষি অফিসের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও ভালো বীজের কারণে এ বছর গাজরের বাম্পার ফলন হয়েছে।”

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গর্ভনর ড. আতিউর রহমান জয়মন্টপ ইউনিয়নের চরদূর্গাপুর এলাকায় গাজর চাষ পরিদর্শন করেন। এ সময় চাষিদের দাবির মুখে তিনি এলাকায় কৃষি ব্যাংকের শাখা চালু ও গাজরসহ সবজি সংরক্ষণের জন্য হিমাগার করার প্রতিশ্রুতি দেন। কৃষিবান্ধব সরকারের সময়োপযোগি পদক্ষেপে মাত্র ১০ মাসের মাথায় ওই বছরের ৯ ডিসেম্বর কৃষি ব্যাংকের শাখা উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। সেই সাথে ৫৯ জন চাষির মধ্যে সহজ শর্তে ১৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা কৃষি ঋণ বিতরণ করেন তিনি। অথচ সেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: