সাম্প্রতিক পোস্ট

পানিতে বন্দী জীবনযাপন আমাদের

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল
বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল হলো দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এই এলাকায় প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ লেগেই আছে। এখানে কখনো নদী ভাঙন, কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কখনো অনাবৃষ্টি, কখনো অতিবৃষ্টি আর তার সাথে আছে তো লবণাক্ততার বিষাক্ততা। উপকূলীয় মানুষেরা এসব আপদ-বিপদের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে জীবনপথে এগিয়ে চলেছেন নিরন্তরভাবে। বছরের প্রতি মাসে ঘুরে ফিরে দুর্যোগ এসে সব কিছু তছনছ করে দেয়। আবার সেখান থেকে নতুন করে পথ চলা শুরু করতে হয়। এভাবে চলতে চলতে যেন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তাদের। সেখান থেকে উঠে দাড়ানোয় যেন কষ্টকর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যারা দুর্যোগে তাদের নিজেদের বসতভিটাটুকু হারিযে আজ উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছেন তাদেও কষ্ট বেশি। এ সব উদ্বাস্তু মানুষদেরকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে খাস জায়গায় সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় পুর্নবাসন করা হয়েছে। শ্যামনগর উপজেলায় বিভিন্ন স্থানে এরকম আশ্রয়ন প্রকল্প বা পুর্নবাসন কেন্দ্র আছে।

তেমনি একটি আশ্রয়ন প্রকল্প হলো শ্যামনগর উপজেলার নুরনগর ইউনিয়নের সৈয়দালিপুর আশ্রয়ন প্রকল্প, যা ২০০৭ সালে সৈয়দালিপুর গ্রামের মাদার নদীর চরে ১ একর ২০ শতক জাযগার উপরে তৈরি হয়। এখানে একটি শেডে ১০টি ঘর তৈরি করা হয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘দশ ঘর’ নামে পরিচিত। ২০০৯ সালের আইলার পরে এখানে ঘরবাড়ি হারানো ২টি ইউনিয়নের ৩ টি গ্রামের ১০টি পরিবারের পুর্নবাসন করা হয়। আইলা ঘটে যাওয়া দীর্ঘ সময়ের পরেও কিন্তু তারা নিজেদের বাস্তুভিটায় ফিরে যেতে পারিনি। আশ্রয়ন প্রকল্পের জনগোষ্ঠীর সুষ্ঠুভাবে বসবাসের জন্য গৃহায়ন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সুপেয পানি, স্যানিটেশন ও যোগাযোগ রাস্তা করা হয়।
গত জুলাই মাসের শেষের দিকে উপকূলীয় এলাকায় অতিবৃষ্টি হয়। আর এ অতিবৃষ্টির কারণে উপজেলার প্রায় ১২টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্লাবিত হয়। এলাকার পুকুর, খাল, বিল, বসতভিা, চিংড়ি ঘের, আমনের বীজতলা, বাড়ির উঠান, গোয়াল ঘর, রান্না ঘর এমনকি কিছু স্থানের বসতঘরের মধ্যে পানি চলে আসে। সব কিছু মিলিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ। তারই একটি চিত্র সৈয়দালিপুর আশ্রয়ন প্রকল্প।


ঘটে যাওয়া এই অতিবৃষ্টির কারণে অসহায়ত্ব জীপনযাপন পার করতে হচ্ছে তাদের। আশ্রয়ন প্রকল্পের চারিদিকে পানি আর পানি। ঘর থেকে পা বের করার কোন উপায় নেই। তারা যেন একটি দ্বীপের মধ্যে বসবাস করছেন। তাদের ব্যবহারযোগ্য রান্নাঘর, বাথরুম, যাতায়াত রাস্তা, পুকুর সব তলিয়ে আছে। ঘরের মধ্যেও পানি। ঘরের মধ্যে কোন রকমে খাটের (চৌকি) উপরে থাকতে হচ্ছে। এছাড়াও ঘরগুলো দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়াতে ঘরের মধ্যে বৃষ্টির পানি পড়ছে।

ভারী বৃষ্টি পরবর্তী মাঠ পর্যবেক্ষণ ও যোগাযোগের মাধ্যমে আশ্রয়ন জনগোষ্ঠীর সাথে কথা হয়। তাদের কি ধরনের সমস্যা হচ্ছে? কি করছে তারা? কিভাবে দিন কাটাচ্ছে ইত্যাদি বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করা হয়। সেক্ষেত্রে আশ্রয়ন জনগোষ্টী আব্দুর রশিদ, ফিরোজা বেগম, জাহাঙ্গীর আলম, রোজিনা বেগমরা জানান, ‘আমরা যেন মরে আছি। আমরা পানিতে বন্দী জীবনযাপন করছি। আমরা যেমন ঘর থেকে বের হতে পারছিনা। আবার ঘরের মধ্যে থাকতেও পারছিনা। যে বৃষ্টি হয়েছে তাতেই আমাদের আশ্রয়ন জনগোষ্টীর অনেক বড় ক্ষতি করে দিয়েছে। আমাদের রাস্তা, পুকুর, রান্না ঘর, বাথরুম, বসতঘর সব পানি আর পানি। কারো কাছ থেকে কিছু চেযে যে রান্না করে খাবো সে জায়গাটুকু নেই। রান্নাঘরগুলো পানি ভর্তি ও ভেঙে পড়েছে। বাথরুমগুলোতে পানিতে। এখানে এভাবে কিছুদিন থাকলে আমরা যেমন অসুস্থ হয়ে পড়বো, তেমনি খাবার খেতে পারবো না। বাধ্য হয়ে ঘর ছেড়ে দিতে হবে।’


তারা আরো জানান যে, ‘বর্তমান যে মহামারীর করোনার ভয়। আমাদের কাছে তার থেকে যেন এই বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতাকেই বড় মনে হচ্ছে। সারজীবন পানির মধ্যে থেকে এখন এই পানিকেই ভয় পেতে হচ্ছে। আমাদের মতো জনগোষ্ঠী যাদের নিজেদের সামর্থ্য না থাকায় আজ আমরা এই আশ্রয়ন প্রকল্পে বাস করছি। আমাদের যত সমস্যা তা সব যেন হয় এই বর্ষাকালে। কারণ প্রতিবছর একটু ভারী বৃষ্টি হলেই আমাদের এখানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয। পুকুর ভরে ঘরের কানায় কানায় পানি থাকে। বাথরুমগুলো অকেজো হযে যায়। রাস্তাগুলোতে যেমন পানি তেমনি কাদা থাকে। ঘরগুলোতে বৃষ্টির পানি পড়ে। আর সেখানে এবার যে ভারী বৃষ্টি হলো যা আমরা গত ৪০ বছরের মধ্যে দেখিনি। এই ভারী বৃষ্টিতে আমাদের ঘরের মধ্যে পানি চলে এসেছে। আমাদের সব রকমের ব্যবহৃত সম্পদ অধিকাংশই পানির মধ্যে তলিয়ে আছে। কবে যে এই পানি কমবে, আর এই ক্ষতি যে কিভাবে কাঠিয়ে উঠবো তা নিয়ে ভাবলে চোখে পানি চলে আসে।’


তারা আরোও জানান, প্রতিবছর পানি শুর হলেই আমাদের নাকানি চুপানি খেতে হয়। তাদের সমস্যার কথা বিভিন্ন জায়গায় বলা হলেও তার কোন সুফল আসেনি। বর্তমান সময়ে যে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এই জলাবদ্ধতা থেকেই তাদের এলাকা আশ্রয়ন প্রকল্পের পুর্নবাসিত জনগোষ্ঠী জানমাল রক্ষায় সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে তারা মনে করেন। তবেই হয়তোবা এলাকার সকল জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: