সাম্প্রতিক পোস্ট

জৈব সার ব্যবহার করবো মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখবো

সিংগাইর মানিকগঞ্জ থেকে শাহীনুর রহমান
সিংগাইর উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের কাস্তা গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষিই তাদের জীবন জীবিকার প্রধান উৎস। কৃষি যখন কৃষকের নিয়ন্ত্রণে ছিল তখন কৃষি কাজে কৃষকের লাভ ছিল। সময় মত বর্ষা হতো, মাটিতে পলি পড়তো, আউশ আমন , খেসারি, মুসুরি মাসকালাই, তিল, কাউন, ছোলা কালিমটর, কাউন, পাট, সরিষাসহ নানা ধরনের স্থানীয় জাতের চৈতালি ফসলের পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ হতো।

কিন্তু বর্তমানে অধিক জনসংখ্যার খাদ্যর যোগান দিতে গিয়ে একদিকে যেমন স্থানীয় জাতে ফসলের বিলুপ্ত ঘটছে তেমনি অধিক ফলনের আশায় কৃষকগণ বর্তমানে রাসায়নিক কৃষির উপর বেশি ঝুঁকে পড়েছেন। তাছাড়া কোম্পানিনির্ভর সার বীজের উপর কৃষককের নির্ভরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এতে করে মাটির স্বাস্থ্য যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি নিরাপদ খাদ্যের অভাবে মানব স্বাস্থ্য ও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বর্তমানে করোনাকালিন সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও দেশে সরকারিভাবে জনগোষ্ঠীর করোনা প্রতিরোধে নিরাপদ খাদ্য ও ভিটামিন সি যুক্ত খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে নিয়মিত। আবার সরকারের কৃষি বিভাগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা গুলোও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখায় জমিতে জৈব সার ব্যাবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

সেই ধারাবাহিকতায় জনগোষ্ঠীর মাঝে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য এবং কৃষক পর্যায়ে জৈব কৃষির সম্প্রসারণ করার লক্ষ্যে বারসিক ও কাস্তা বারোওয়ারি কৃষক কৃষাণি সংগঠনের যৌথ আয়োজনে জৈবসার, জৈব বালাইনাশক তৈরির ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহার বিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে সম্প্রতি। প্রশিক্ষণে সহায়ক হিসেবে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন স্থায়িত্বশীল কৃষি চর্চাকারি সমৃদ্ধ কৃষক মহাদেব মন্ডল। সংগঠনের সহ-সভাপতি লিপিকা মন্ডলের সভাপতিত্বে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন কৃষক হীরালাল মন্ডল, প্রদীপ মন্ডল, আব্দুল খালেক, আব্দুল হালিম, ফরহাদ হোসেন, আমেনা বেগম, মর্জিনা বেগম, ফাতেমা বেগম , মহেলা বেগম, খোদেজা বেগম, বারসিক কর্মকতা শিমুল কুমার বিশ্বাস, মাসুদুর রহমান, শারমিন আক্তার প্রমুখ।


প্রশিক্ষণে সহায়ক মহাদেব মন্ডল অংশগ্রহণকারী কৃষক কৃষাণিদের জৈব সার ও জৈববালাইনাশক তৈরি পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহার সম্পর্কে সরাসরি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন। মহাদেব মন্ডল বলেন, ‘আমরা সাধারণত ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময়ই রাসায়নিক সার, বিষ ব্যবহার করে থাকি যে কারণে আমাদের ফসলের উৎপাদন খরচ অনেকাংশে বেড়ে যায় কৃষক আর লাভ খুঁজে পায় না। রাসায়নিক সার ও বিষ একদিকে মাটির জন্য যেমন ক্ষতিকর অন্যদিকে মানব স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। আমরা ইচ্ছা করলেই খুব সহজেই মাটির স্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য জৈবসার ও জৈববালাই নাশক তৈরি করে ব্যবহার করতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সাধারণত গোবরকেই জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করে থাকি। গোবর ছাড়াও জৈব সারের মধ্যে রয়েছে সবুজ সার, তরল সার, গর্ত কম্পোষ্ট, টাইকো কম্পোষ্ট, উঠান ঝাড়– দেওয়া মাটি, তরকারির খোসা ইত্যাদি। এগুলো জৈব সার হিসেবে আমরা ব্যবহার করতে পারি।


মহাদেব মন্ডল জানান, উদ্ভিদের জন্য ১৬ প্রকার খাদ্য উপাদান দরকার হয়। কিন্তু রাসানিয়ক সারে সকল ধরনের খাদ্য উপাদান বিদ্যমান থাকে না। জৈবসারে সকল ধরনের খাদ্য উপাদান বিদ্যমান থাকে। আমরা জানি কেঁচোকে প্রাকৃতিক লাঙ্গল বলা হয়ে থাকে। একটা সময় জমিতে প্রচুর পরিমাণে কেঁচো থাকতো, মাটি উর্বর থাকতো। মাটির অণুজীব বৃদ্ধি পেত। আমরা কেঁচোসার তৈরি করে জমিতে ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করতে পারি এবং মাটির মধ্যে অণুজীব তৈরি করতে পারি। কেঁেচা সার তৈরিতে সাধারণত একটি ২০ থেকে ২২ ইঞ্চি মুখ খোলা একটি চারি, ১৫ দিনের আধাপচা ঠান্ডা গোবর ১৫ কেজি, ২৫০ গ্রাম কেঁচো, ৫ কেজি কলাগাছ-এসব উপকরণ প্রয়োজন হয়। চাড়িটি নতুন হলে ১ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে নিতে হবে। চাড়িটি ঠান্ডা ও নিরাপদ জায়গায় রেখে চাড়ির ভিতর ২ কেজি কলাগাছের টুকরো দিতে হবে। তারপর ১৫ কেজি আধাপচা গোবর দিয়ে স্তর বানাতে হবে। এরপর ২৫০ গ্রাম কেঁচো ছেড়ে দিয়ে প্রায় ৩ কেজি কলাগাছের টুকরো বিছিয়ে দিতে হবে। এভাবে ৩ মাসের মধ্যে দুগন্ধবিহীন চা পাতার মত দানাদার উন্নত মানের একটি কেঁচো সার তৈরি হবে।


মহাদেব মন্ডল জানান, ফসলের পোকামাকড় থেকে রক্ষা পেতে মেহগনির গোটা, ভাটিপাতা, পাটের দানা, নিমপাতা দিয়ে পানির সাথে মিশিয়ে সিদ্ধ করে জৈব বালাইনাশক তৈরি করা যায়। প্রশিক্ষণ মূল্যায়ণে কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, ‘জৈব সার তৈরির উপকরণ আমাদের বাড়িতেই আছে আমরা চেষ্টা করলেই সবাই জৈব সার তৈরি করতে পারি। আমরা মাটির স্বাস্থ্য ও মানুষের স্বাস্থ্যর কথা চিন্তা করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করার জন্য রাসায়নিক এর ব্যবহার কমাতে চাই।’

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: