সাম্প্রতিক পোস্ট

একজন সাহেরা’র ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

একজন সাহেরা’র ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়

লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের কান্দাপাড়া গ্রামের সাহেরা আক্তার। তাঁর বাবা একজন সামান্য কৃষক ছিলেন। ৫ বোন ও ৬ ভাইয়ের মধ্যে সাহেরা তৃতীয় সন্তান। এত বড় সংসারের খাওয়ার খরচ মেটাতে দরিদ্র বাবা হিমশিম খেতেন। তাই অভাবের সংসারে তিনি লেখাপড়া করতে পারেননি। সংসারের বোঝা কমাতে তাঁর মা সব বোনদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন। অন্যসব বোনদের মতই তাঁকে ১৫/১৬বছর বয়সে পার্শ¦বর্তী আমাটি গ্রামের মো. ইনজিল মিয়ার সাথে বিয়ে দিয়ে দেন।

স্বামীও কৃষিকাজ করতেন। বিয়ের পরে কিছুদিন তিনি বাবার বাড়িতেই ছিলেন। তখন তাঁর স্বামীও মাঝে মাঝে এখানে এসে থাকতো। বিয়ের সময় সাহেরার বাবা অনেক কষ্ট করে তাঁর স্বামীকে একটা সাইকেল ও একটা গরু যৌতুক হিসেবে দেয়। কিছুদিন পরে তাঁর স্বামী এইগুলো বিক্রি করে দেয়। তারপর আরো কিছু টাকা দেয় তাকে ব্যবসা করার জন্য। এই টাকাও তিনি নষ্ট করেন। এরপর আরেকবার মিথ্যা কথা বলে সাহেরার মায়ের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যান।

সাহেরার যখন ৭ মাসের বাচ্চা পেটে তখন তাঁর স্বামী অসুস্থতার কথা বলে তাঁকে শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে যায়। তারপর থেকেই শুরু হয় সাহেরার উপর অমানুষিক নির্যাতন। তিনি শ্বশুরবাড়িতে যাবার পর জানতে পারেন তাঁর স্বামী অন্য একজনকে পছন্দ করেন এবং তাকে বিয়ে করতে চান। নিজের বাড়ি ছেড়ে ওই নারীর বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করেন। সাহেরার কোনো খবর নিতেন না। এই নিয়ে শুরু হয় সংসারে অশান্তি। কিছু বললেই মারধোর করতেন। এমন কোনো দিন নেই তখন সাহেরার গায়ে হাত তোলেনি। তাঁর স্বামীকে এই পথ থেকে ফেরানোর জন্য তিনি অনেক কবিরাজের কাছেও গিয়েছিলেন। কত ধরণের তাবিজ, কবজ ব্যবহার করেছেন তাকে ভালো করার জন্য। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এইভাবে তিন বছর কেটে যায়। পর পর সাহেরার দুটি মেয়ে সন্তানের জন্ম হয়।
ততোদিনে গ্রামের সকল মানুষ জেনে যায় ইনজিল মিয়ার কীর্তিকলাপের কথা। গ্রাম্য শালিসের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাহেরার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে। বিয়ের পর বৌ নিয়ে ঢাকা পালিয়ে ঢাকা চলে যায় এবং সেখানেই থাকতে শুরু করে। সাহেরা থেকে যায় তাঁর শ্বশুরবাড়িতে।
বছর খানেক পরে সাহেরার স্বামী দুই মেয়েসহ তাঁকে ঢাকা নিয়ে যায়। তখন তার দ্বিতীয় বৌ সেখানে ছিলনা। ফিরে এসে যখন তাঁদের দেখতে পায়, তখন আবার তারা দুইজনে মিলে মারধোর করে তাড়িয়ে দেয়। সাহেরা আবার শ্বশুরবাড়িতে চলে আসেন। প্রায় ছয় বছর পর তাঁর স্বামী দ্বিতীয় বৌ নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। এবং এখানেই থাকতে শুরু করে। একদিন সাহেরার স্বামীর দ্বিতীয় বৌ বাড়ি থেকে সুপারি চুরির অভিযোগ তোলে তাঁর উপর। তখন ছিল মাঘ মাস, প্রচ- শীত। বিকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত তাঁর স্বামী তাঁকে মারতে থাকে। এক পর্যায়ে অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে রাতের অন্ধকারে তিনি প্রতিবেশির বাড়িতে আশ্রয় নেন। স্বামীর বড় বোন সেখান থেকে তাঁকে উদ্ধার করে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। রাতের বেলাতেই তিনি তাঁর দুই মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান।

এরপর শুরু হয় সাহেরার জীবনের অন্য রকম সংগ্রাম। বড় মেয়েটি তখন স্কুলে পড়ে। বাবার বাড়িতে একটি ভাঙ্গা ঘরে তাঁদের থাকার জায়গা হলো। কিন্তু তিনজনের খাওয়ার খরচ, অন্যদিকে মেয়ের লেখাপাড়ার খরচ এসব যোগার করার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। মাঝে মধ্যে ভাইয়েরা খাবারের খরচ দিতো, তবে তাদের বৌদের জন্য সেটা বেশিদিন সম্ভব হয়নি। অনেক চিন্তাভাবনা করে গ্রামের অন্যদের বাড়িতে তিনি কাজ করতে শুরু করেন। কখনো ধান শুকিয়ে, কখনো গিরস্থালী কাজ করে যা উপার্জন হতো তাই দিয়ে মেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের চাহিদা পূরণ করতে থাকলেন।

সাহেরার বড় মেয়েটা যখন এসএসসি পরীক্ষা দিবে তখন ফরম ফিলাপ করার মতো কোনো টাকা ছিলনা। উপায় না পেয়ে বাড়ির একটি পুরনো সাইকেল বিক্রি করে এবং আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে মেয়ের ফরম ফিলাপ করিয়েছিলেন। তাঁর মেয়ে ২০০৬ সালে এসএসসি পাশ করে। কিন্তু ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও টাকার অভাবে মেয়েকে কলেজে ভর্ত্তি করতে পারেননি। ছোট মেয়েটিরও লেখাপড়া হয়নি।

এসএসসি পাশ করার পর বড় মেয়েটি ঢাকা গিয়ে একটি গার্মেন্টস এ চাকরি নেয়। কিছুদিন পরে তিনিও ছোট মেয়েটিকে নিয়ে সেখানে চলে যান। বড় মেয়ে খুব কম টাকা বেতনের চাকরি করতো। যা দিয়ে ঢাকায় থেকে তিনজনের সংসার চলতোনা। তাই তিনি আশে পাশে থাকা কর্মজীবি মানুষদের রান্না করে খাওয়ানোর কাজ শুরু করলেন।

প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হতো, পরে তিনি মানিয়ে নিয়েছেন। স্বামীর অত্যাচারে তিনি মাথায় বেশ আঘাত পেয়েছিলেন, যে কারণে একটু পরিশ্রমের কাজ করলেই খুব কষ্ট হতো। এছাড়া চোখে আঘাতের কারণে চোখেও কম দেখতেন এবং প্রায়ই তাঁর চোখে ব্যথা হতো, পানি পড়তো। তবুও যন্ত্রণা সহ্য করে, লাকড়ির চুলায় রান্না করতেন।

এভাবে প্রায় পাঁচ বছর তিনি রান্না করার কাজ করলেন। সংসারের খরচ চালিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয় করলেন। বড় মেয়েটিও চাকরিতে একটু ভালো উপার্জন করতে লাগলো। মেয়েও সংসারে কিছু খরচ দিতো। কিন্তু সেটা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মেয়ে নিজের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করায় সেটা বন্ধ হয়ে যায়। ছোট মেয়েকে নিয়ে তিনি অসহায় হয়ে পড়েন। মাথা আর চোখে সমস্যা দেখা দেয়ায় রান্নার কাজও তখন ছেড়ে দিয়েছিলেন।

উপায় না পেয়ে প্রায় দুই বছর আগে তিনি নিজের গ্রামে, বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। নিজের জমানো টাকা দিয়ে বোনের কাছ থেকে ২০ শতাংশ জায়গা কিনে সেখানে একটি ঘর তৈরি করেন। বড় মেয়ে যেখানে চাকরি করতো সেখান থেকে তার বিদেশে যাওয়ার সুযোগ আসে। সাহেরা তখন নিজে টাকা দিয়ে মেয়েকে বিদেশে পাঠায়।

বাকি টাকা দিয়ে কিছু জমি বন্ধক রেখেছেন। সেই জমি থেকে যে ধান পাওয়া যায়, তা দিয়ে সারা বছরের খাওয়া চলে। বাড়িতে হাঁস, মুরগি পালন করেন। বিদেশ থেকে বড় মেয়ে মাঝে মাঝে কিছু টাকা পাঠায়। যা দিয়ে তাঁর বেশ ভালোভাবেই দিন চলে যায়।

ছোট মেয়ের যখন তিন বছর বয়স ছিল তখনই সাহেরা শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে এসেছেন। এত বছরের মধ্যে তাঁর স্বামী একবারের জন্যও তাঁদের খবর নেয়নি। তিনিও আর সেখানে ফিরে যাননি। মেয়েদের জন্য সাহেরা দ্বিতীয় বিয়েও করেননি। বাবা, মা দুজনের ¯েœহ দিয়ে তিনি একাই তাঁর সন্তানদের বড় করেছেন। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখন তিনি একটু শান্তিতে মৃত্যুবরণ করতে চান।

একজন নারী শত অত্যাচার সহ্য করেও বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। আমাদের সমাজে এমন শত শত সাহেরা আছেন, যাদের জীবন কাহিনী অজানাই থেকে যায়। তাঁর নিজের জীবন কাহিনী বলতে গিয়ে চোখে পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না। সভ্য সমাজে পুরুষদের বর্বরতা কতোটা নির্মম হতে পারে, সেটা সাহেরা আক্তারের জীবন থেকে জানা যায়। তবু তিনি থেমে থাকেননি। যেভাবেই হোক, বাঁচার পথ খুঁজে নিয়েছিলেন। এখনো বেঁচে আছেন। সাহেরারা বেঁচে থাকে। সমাজের, সংসারের নিষ্ঠুরতাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়, যাবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: