Posted in

করোনা ভাইরাস এবং পরিবেশ

সিলভানুস লামিন
ভূমিকা
করোনা ভাইরাস সারাবিশ্বের মানষের কাছে একটি আতংকের নাম, একটি ভয়াবহতার নাম এবং একটি অনিশ্চয়তার নাম। গত বছর ডিসেম্বর চীনের উহান থেকে উৎপত্তির পর থেকেই এই ভাইরাসটি আজ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই প্রবেশ করেছে, ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, মানুষ মারছে এবং আতংকগ্রস্ত করছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো উলটপালট করে দিয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থাকে অচল করে রেখেছে এবং মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি করেছে এই ভাইরাসটি। বিশ্বে এর আগেও অনেক মহামারী এসেছিলো তবে করোনার মতো এত ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব কোন মহামারীই সৃষ্টি করেনি। করোনা ভাইরাস কোন ভৌগলিক সীমানা মানেনি, তোয়াক্কা করেনি কোন সুরক্ষা ব্যবস্থাকে। অদৃশ্য এই ভাইরাসটি যেন মানুষের ‘যমদূত’। ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বে এই ভাইরাসে মানুষের প্রাণহানী হয়েছে ১৩ লাখ ৬৫ হাজারের অধিক এবং আক্রান্ত করেছে ৫ কোটি ৭২ লাখের বেশি মানুষকে। গতকাল (২৩ নভেম্বর) পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনায় ৬ হাজার ৪১৬ জনের প্রাণহানী হয়েছে এবং আক্রান্ত করেছে ৪ লাখ, ৪৯ হাজার ৭৬০ জনকে। মানুষের প্রাণহানীসহ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি করোনায় পরিবেশের ওপর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় প্রভাব সৃষ্টি করেছে।

পরিবেশের ওপর করোনার নেতিবাচক প্রভাব
গত বছর চীনের উহান রাজ্যে করোনা ভাইরাসের প্রার্দুভাবের পর থেকে যে পরিমাণ মেডিকেল বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে সেগুলো সেই রাজ্যের পরিবেশের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। একটি প্রতিবেদন মতে, উহানে যখন এই ভাইরাস ব্যাপকভাবে মানুষকে আক্রান্ত করেছে তখন স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রম বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিদিন গড়ে ২৪০ টন মেডিকেল বর্জ্য তৈরি হয়েছে হাসপাতালগুলোতে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এই বর্জ্যরে পরিমাণ ৬ গুণ বেশি! এত গেল শুধু চীনের একটি রাজ্যের পরিসংখ্যান। বিশ্বব্যাপী এই মেডিকেল বর্জ্যরে পরিমাণ যে অনেক বেশি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়া করোনার প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক মাস্ক ব্যবহারের হার অনেকগুণ বেড়েছে। পরিবেশের ওপর প্ল্যাস্টিকের প্রভাব যে কী সেটা আমরা কমবেশি ভালো করেই জানি! এই প্ল্যাস্টিক মাস্কের বেশির ভাগই তৈরি হয় ঢ়ড়ষুঢ়ৎড়ঢ়ুষবহব নামে একটি উপাদান থেকে, যা সহজে পচনশীল নয় এবং এটি অনেকদিন পরিবেশে থেকে যায়। অন্যদিকে আমরা যদি মানুষকে পরিবেশের অন্যতম উপাদান হিসেবে দেখি তাহলে করোনা সবচে’ বেশি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। করোনায় মানুষের প্রাণহানী হওয়ার ঘটনা দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে। যারা সুস্থ হয়েছেন তাদের শরীরে নানান ধরনের জটিলতা দেখা দিয়েছে বলে পত্রিকান্তরে আমরা সেটা জানতে পারি। অন্যদিকে করোনায় আতংকগ্রস্ত মানুষ দিনের পর দিন নিজেকে সঙ্গনিরোধ করে, স্বাভাবিক চলাফেরাকে হ্রাস করে এবং আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা সাক্ষাত, গল্পগুজবের করার অভ্যাস কমিয়ে দেওয়ার কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। ফলশ্রুতিতে মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে যার প্রভাব তাদের পরিবারের ওপর পড়ে।

পরিবেশের ওপর করোনার ইতিবাচক প্রভাব
করোনা ভাইরাসের আগমনের প্রথম কয়েকমাস মানুষের চলাফেরা, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য কার্যক্রম বলতে গেলে বন্ধ ছিলো। করোনা ভাইরাসের শংক্রমণ কমানোর জন্য বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই বেশ কয়েকমাস ‘লকডাউন’ ঘোষণা করেছে। এ লকডাউনের সময় কলকারখানার উৎপাদন, অফিস আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহনসহ অনেককিছু বন্ধ ছিলো। এ বছরের মে মাসে পারিচালিত একটি গবেষণা ফলাফল অনুযায়ী, লকডাউনের সময় শুধু এপ্রিল মাসেই বিশ্বব্যাপী দৈনিক কার্বন নিঃসরণ ১৭% হ্রাস পেয়েছে, যা কার্বন নিঃসরণের বার্ষিক হার ৭% কমে যেতে পারে বলে তারা মনে করেন। মূলত লকডাউনের সময় কলকারখানায় উৎপাদন ও যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় কার্বন নিঃসরণের এই হ্রাস হয়েছে। এছাড়া গবেষকগণ বায়ু ও পানি দূষণের হারও অনেকটা হ্রাস পেয়েছে লকডাউনের ওই সময়ে। বিশ্বের অনেক এলাকায় বায়ু দূষণ (বিশেষ করে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড ও কার্বন ডাই অক্সাইড) তুলনামূলকভাবে হ্রাস পেয়েছে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞই বলেছেন, এই ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে খুশি হওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ ইতিবাচক প্রভাবগুলো খুবই ক্ষণস্থায়ী!

উপসংহার
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের শাসন মানুষের সামাজিক স্বাধীনতা কিছুটা হলেও ব্যাঘাত ঘটেছে। মানুষের চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে মজবুত করার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসা খাতের এই ক্রমবর্ধমান কার্যক্রমের কারণে সারাবিশ্বে মেডিকেল বর্জ্য অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া প্ল্যাস্টিক মাস্ক উৎপাদন ও ব্যবহারও বৃদ্ধি পেয়েছে যা প্রত্যক্ষভাবে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। এই নেতিবাচকতা প্রভাবের পাশাপাশি কিছু ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। মানুষের চলাফেরা, যানবাহন চলাচল, কলকারখানার উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার কারণে গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস পাচ্ছে বিগত কয়েকমাসে, বায়ু ও পানি দূষণও কিছুটা কমেছে এবং পরিবেশ ও প্রকৃতির ওপর চাপও কমেছে। তবে এটি খুবই ক্ষণস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব। কারণ করোনার কারণে সবচে’ বেশি ক্ষতিগ্রস্ততার শিকার হচ্ছে মানুষ। মানুষ নিজেও পরিবেশের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। করোনা মানুষকে ধ্বংস করছে, অসুস্থ করছে এবং আতংকিত করছে!

ফিচার ইমেজটি ইন্টারনেটের উন্মুক্ত উৎস থেকে নেওয়া

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.