Posted in

লোকায়ত পদ্ধতিতে দিপালী রানীর লেবু সংরক্ষণ

সাতক্ষীরা, শ্যামনগর থেকে চম্পা রানী মল্লিক
দিপালী রানী মল্লিক (৫৫)। স্বামী দিলিপ কুমার মল্লিক (৬০)। উপকূলীয় অঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের হরিনগর গ্রামে তার বাড়ি। তিনি একজন গৃহিনী। সংসার জীবনে এসেছিলেন খুবই কম বয়সে। তখন তিনি মাত্র নবম শ্রেণীতে উঠছিলেন। পড়াশোনা করার খুব আগ্রহ ছিলো তার এবং তিনি মেধাবীও ছিলেন। পরিবারও ছিলো স্বচ্ছল কিন্তু তার পিতা ছিলেন ব্যতিক্রম। মেয়েদেরকে যতœ করতেন কিন্তু মেয়েদের উন্নত শিক্ষা বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন না। তবে দিপালী রানী সচেতন হয়ে গড়ে উঠেছিলেন। সংসার জীবনে এসেই তিনি পিতার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা ও সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলেন। এরপর তিনি সুন্দরভাবে তার সন্তানদেরকে খেয়াল রাখেন এবং মেয়ে সন্তানদেরকে আলাদা না ভেবে ছেলে মেয়ে সবাইকে সমানভাবে মানুষ করতে থাকেন। তিনি শুধু সন্তান; সঞ্চয় নিয়েই নয় পরিবারের প্রতিটি বিষয়েই খেয়াল রাখতেন। তিনি তার বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের মরিচ ও সবজি লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর মধ্যে থেকে ভালো জাত খুঁজে বের করেন এবং বীজ সংরক্ষণের প্রতি তিনি ছিলেন অনেক আগ্রহী। দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হওয়ায় তিনি বিভিন্ন ধরনের শুকনো খাবারও সংরক্ষণ করেন যেমন: চাল কুমড়ার বড়ি, ওলকপির বড়ি, ফুলকপি শুকনা, বাঁধাকপি শুকনো, চিড়া, মুড়ি কেওড়ার চকলেট, কাঁচা আমের চকলেট, লেবু লবণ, শুকনো চিংড়ি ইত্যাদি। প্রতিটি খাবারই উপকারী ও স্বাস্থ্যসম্মত। এগুলোর উপকারিতা সম্পর্কে জানতে গ্রামের অনেকেই তার কাছে আসেন। তিনি ধৈর্য্য সহকারে প্রত্যেককে এগুলো তৈরির নিয়ম বলে দেন এমনকি তৈরিও করে দেন।


সবগুলো খাবারের মধ্যে ‘লেবু লবণটি’ ছিলো যেন একটু ব্যতিক্রম। এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়। কারণ এটি প্রায় সকলের কাছে অজানা। তাই তার কাছে ‘লেবু লবণ’ বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাতি লেবু বা কাগজি লেবুর আছে অনেক গুনাগুণ। লেবুর রস তরকারি, ডাল প্রভৃতিতে মিশিয়ে খাওয়া হয় কিছুটা স্বাদ বাড়াবার জন্যে। এছাড়াও বাজারে বিভিন্ন ধরনের লেবু পাওয়া যায় যেমন: গন্ধরাজ লেবু, বাতাবি লেবু, কমলা লেবু ইত্যাদি। আমি মনে করি সকল লেবুর মধ্যে পাতি লেবু বা কাগজি লেবুর উপকারিতা বেশি। এটিতে ভেটামিন সি আছে। এটি স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।’


তিনি আরোও বলেন, ‘আমাদের এই উপকূলীয় অঞ্চলে এই লেবুগুলো বছরে ছয়মাস (বৈশাখ- আশির্^ন) খুব বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় এবং বাকি ছয়মাস (কার্ত্তিক-চৈত্র্য) খুব কম পাওয়া যায়। তবে এই সময়ে বারোমাসী কিছু গাছের লেবু বাজারে খুব কম মিলে এবং মূল্যও থাকে অনেক বেশি। যা সবার পক্ষে খাওয়া সম্ভব হয়না। সেক্ষেত্রে এভাবে ‘লেবু লবণ’ দিয়ে লেবু সংরক্ষণ খুবই প্রয়োজনীয়। এটি আমি আমার মত করেই করতে শিখেছি স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিপাটিভাবে।’


দিপালী রানী মল্লিক বলেন, ‘আমি যখন দেখেছি আশি^ন মাসের শেষের দিকে লেবু পাকা শুরু হয় এবং প্রচুর পরিমাণে গাছের নিচে পড়ে নষ্ট হতে থাকে। আমি তখনই ভেবেছিলাম লবণ দিয়ে তো অনেক কিছু সংরক্ষণ করা যায় তাহলে লেবু কেন নয়? তাই পরীক্ষামূলকভাবে আমি এক কেজি লেবু ভালোভাবে ধুয়ে মুখ এবং দু’পাশ ছেটে ফেলে গা হালকা চিরে মুছে নিয়ে একটি বোয়ামে ভরি। এরপর ৫০০ গ্রাম লবণ দিয়ে ঝাঁকিয়ে প্রতিদিন রৌদ্রে দিই। একসপ্তাহ পরে এটি খাওয়ার উপযুক্ত হয়ে যায়। আস্তে আস্তে আমি এর বহু উপকার বুঝতে পারি এবং অন্যদেরকে জানাই। এভাবে আমার প্রতিবেশীসহ অনেক মানুষ আমার কাছ থেকে অনেক কিছুই জানছে এবং আমার সহযোগতিা নিয়ে তারাও তৈরি করার চেষ্টা করছে। আমি তিনবছর ধরে এই কাজটি করে আসছি, আমি চাই আরো বেশি মানুষ এভাবে লেবু লবণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করুক এবং রোগব্যধির হাত থেকে মুক্তি পাক।’


উপকূলীয় এলাকায় দিপালি রানীর মতো যেসব নারী এসকল লোকায়ত পদ্ধতি উদ্ভাবন ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে তাদের জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে তা আরো বেশি বেশি সম্প্রসারিত হোক এটিই আমাদের সকলের চাওয়া।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.