সাম্প্রতিক পোস্ট

সব মানুষের নিরাপদ পানি পাওয়ার অধিকার রয়েছে

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে বিশ^জিৎ মন্ডল ও আল ইমরান

পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া পৃথিবীতে কোন প্রাণই বেঁচে থাকতে পারেনা। পানির সঙ্গে আমাদের নিত্য দিনের সম্পর্ক। পানি ছাড়াও আমরা এক বিন্দুও চলতে পারি না। আমাদের জীবন ধারণের জন্য আমরা কতটা সুপেয় পানি বা নিরাপদ পানি পান করতে পারছি তা ভাবার বিষয়্। আমরা মূলত ভুগর্ভস্থ ও মাটির উপরিভাগের পানি ব্যবহার করি। উপকূলীয় এলাকাতে পানির কোন সমস্যা নেই। এখানে আছে পর্যাপ্ত পানি। দুচোখ খুললে শুধু পানি আর পানি। কিন্তু সুপেয় পানির মারাত্মক অভাব।

pic-1

ভৌগলিক ও কৃষিপ্রতিবেশগত ভিন্নতার কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভু-গর্ভস্থ পানি লোনা। এ এলাকার সুপেয় পানির উৎস খাল, ডোবা, নালা ও পুকুর। কিন্তু সমুদ্রকুলবর্তী হওয়াতে এখানে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েই থাকে, সাথে আছে মানব সৃষ্ট দুর্যোগ। প্রাকৃতিক ও মানব সুষ্ট দুর্যোগ একাকার হয়ে এখানকার মিষ্টি পানিকে লবণাক্ততায় রূপান্তরিত হচ্ছে। এখানে অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষের কারণে লবণ পানির প্রবেশ করে সুপেয় পানির আধার যেমন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সাথে কৃষি পরিবেশও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উপকূলবর্তী এ মানুষেরা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক ও মানব সুষ্ট এ দুর্যোগের সাথে মোকাবেলা টিকে আছে। বৈরী এ পরিবেশের সাথে কিভাবে মোকাবেলা করে টিকে থাকা যায় তার জন্য সবসময় নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হয়। তারা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় নিজেদের উদ্যোগকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেন।

এরকমই একটি উদ্যোগ নিয়েছেন শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নের জয়নগর ও গোবিন্দপুর গ্রামে জনগোষ্ঠীরা। তাদের সুপেয় পানির সমস্যা সমাধানে সম্মিলিতভাবে কাজ করেছেন। গ্রাম দুটিতে বিভিন্ন ধরনের কৃষি কাজ হয়ে থাকে। উপজেলায় যত রকমের তরকারি বাজারজাতকরণ হয় তার কিছু অংশ এসব গ্রাম থেকে উৎপাদিত হয়। এখানকার অধিকাংশ পুকুরগুলোতে সুপেয় পানি থাকে এবং এখানকার কিছু স্থানের নিচের পানিও সুপেয়। তবে গ্রীস্ম মৌসুমের সময় অধিকাংশ পুকুর শুকিয়ে যায়। ফলে সবজি চাষের ক্ষেত্রে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। এক্ষেত্রে কাশিমাড়ি ইউনিয়নের সিডিও ইয়থ টিম ও জয়নগর কৃষি নারী সংগঠনের সদস্যরা এলাকার সুপেয় পানি ও কৃষি উপযোগী পানির সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগসহ গ্রাম ও সংগঠন পর্যায়ে বিভিন্ন আলোচনা করেন।

pic-3

এক পর্যায়ে তারা বারসিকের নিকট তাদের পানির সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, ‘গ্রাম দুটিতে নিচের পানির লেয়ার ভালো এখানে সুপেয় পানির ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করার উপযুক্ত। এখানে যদি টিউবওয়েল স্থাপন করা যায় তাহলে এই দুটি গ্রামের শত-শত পরিবার সুপেয় পানির সমস্যা সমাধান হবে। সাথে কিছু পরিবারে কৃষি কাজও করতে পারবে। এরপর বারসিক স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানের জন্য বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করে। অবহিত করায় এক পর্যায়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তদন্ত হয় এবং যেখানে স্থাপন করা হলে অধিকাংশ মানুষের জন্য সুবিধা হবে তা জনগোষ্ঠীর সাথে আলোচনা করে স্থান নির্ধারণ করা হয়।

জয়নগর গ্রামের টি জয়নগর কৃষি নারী সংগঠনের সভানেত্রী অর্চনা রানীর বাড়ি এবং গোবিন্দপুর গ্রামের সিডিও ইয়থ টিমের অফিস সংলগ্ন স্থানে স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। সেক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপনের জন্য সরকারি ফি ২টি টিউবওয়েলের জন্য ১৫ হাজার টাকা জমা দিতে হয়। ফি জমা দানের ক্ষেত্রে জয়নগর কৃষি নারী সংগঠনকে বারসিক আংশিক সহায়তা করে। সে লক্ষ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসে গ্রাম দুটিতে ২টি ডিপ টিউবওয়েল স্থাপিত হয়।

ডিপ টিউবওয়েল প্রাপ্ত জয়নগর গ্রামের কৃষানী অর্চনা রানী বলেন, ‘আমাদের ৪০টি পরিবারের সুপেয় পানির সমস্যা সমাধান হলো। পাশাপাশি আমরা ১২ মাস সবজি করতে পারবো। আমাদের পানির সমস্যা যে সমাধান হলো এ ঋণ শোধ করতে পারবো না।’ অন্যদিকে গোবিন্দপুর গ্রামের যুবরা বলেন, ‘আমরা এলাকার মানুষের সুপেয় পানির সমস্যা সমাধান করতে পেরেছি। আমরা মনে করি সব মানুষের নিরাপদ পানি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আমরা পানি দিয়ে মানুষকে সেবা দিতে পারছি। এটা আমাদের অনেক বড় পাওয়া। এখন কৃষি কাজে যাতে ভালো করে করতে পারে কৃষকেরা। এর জন্য আমরা একটি সেচ কমিটি তৈরি করবো যাতে পর্যায়ক্রমে কৃষকেরা সেচ দিতে পারেন।’

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: