সাম্প্রতিক পোস্ট

গ্রামীণ শস্যপঞ্জিকা : রূপ ও রূপান্তর (প্রথম অংশ)

বাংলাদেশের বন্যাপ্লাবন সমভূমি অঞ্চলের গ্রামীণ শস্যফসলপঞ্জিকার সাম্প্রতিক পরিবর্তনশীলতা বিষয়ে একটি প্রতিবেশীয় সমীক্ষা

:: পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক ::

শব্দসংক্ষেপ: পঞ্জিকা, গ্রামীণ শস্যপঞ্জিকা, শস্যপঞ্জিকার রূপ, শস্যপঞ্জিকার রূপান্তর, বন্যাপ্লাবন সমভূমি অঞ্চল নেত্রকোণা, বাংলাদেশ

সারসংক্ষেপ

বাংলাদেশের বন্যাপ্লাবণ সমভূমি অঞ্চল নেত্রকোণা জেলার আটপাড়া উপজেলার স্বরমুশিয়া ইউনিয়নের রামেশ্বরপুর গ্রামে ১৪১৮ বাংলার শ্রাবণ মাসের মাঠকর্ম সমীক্ষার ভেতর দিয়ে গবেষিত এলাকার গ্রামীণ শস্যফসলপঞ্জিকার রূপ ও রূপান্তর বিষয়ে চলতি সমীক্ষাপত্রটি তৈরি হয়েছে। রামেশ্বরপুর গ্রামের ১৯০০-২০১১ পর্যন্ত বিগত ১০০ বছরের শস্যপঞ্জিকার খতিয়ান উক্ত গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বাংলা পঞ্জিকার সাথে গ্রামীণ কৃষিজীবনের ব্যবহারিক সম্পর্ক এবং কৃষি ও ফসলের পরিবর্তনশীলতার প্রভাব গ্রামীণ কৃষিজীবনকে কিভাবে প্রভাবিত করে চলতি লেখাটিতে তাও আলোচিত হয়েছে। পঞ্জিকাকেন্দ্রিক জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্নতা, গ্রামীণ ক্ষমতা সম্পর্ক, লিঙ্গীয় অসমতা, সাংস্কৃতিক রূপান্তর, বাজার নির্ভরশীলতা, বহিরাগত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প, জাতের বিশুদ্ধতা, তথাকথিত আধুনিক রাসায়নিক কৃষির বিস্তার, গ্রামীণ আচার-রীতির পরিবর্তন, কৃষকের নিজস্ব পছন্দ, জমির ভূবৈশিষ্ট্য, আবহাওয়া ও জলবায়ুগত বিপর্যয়, লোকায়ত বিজ্ঞান ও গ্রামীণ জীবনের প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলা, বেসরকারি উন্নয়ন কর্মসূচি, আলোকগ্রহণশীলতার পরিবর্তন ও ঋতুভিত্তিক কৃষিজমির রঙের পরিবর্তন কিভাবে গ্রামীণ শস্যপঞ্জিকার রূপান্তরকে প্রভাবিত করে চলতি সমীক্ষায় সেদিকগুলোই স্থানীয় জনগণের ব্যাখ্যা ও বয়ানে হাজির করা হয়েছে। সকল বহিরাগত আঘাত থেকে গ্রামীণ শস্যপঞ্জিকার স্বকীয় বিকাশমানতার গুরু ত্ব তুলে ধরেছে এই লেখাটি।

শুরুর অংশ

বাংলাদেশের বন্যাপ্লাবণ সমভূমি অঞ্চলে এখনও জনপ্রিয় সব প্রচলিত রূপকথা বা কিচ্ছা কাহিনীতে দেখা যায় রূপকথার এক প্রধান চরিত্র রাক্ষসদের প্রাণ থাকে ভোমরা পতঙ্গের ভেতর। বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলের কৃষিই হলো এখনও গ্রামবাংলার প্রাণভোমরা। রূপকথার রূপ ও উপস্থাপনের যেমন রূপান্তর ঘটছে প্রতিনিয়ত, তেমনি দিনে দিনে রূপবদল ঘটছে গ্রামীণ কৃষিকাহিনীর। প্রতিনিয়ত এক রূপান্তরিত কৃষির সাথে রূপ বদলে বদলে বেড়ে ও বেঁচে থাকছে আজ ও আগামীর বাংলাদেশ। গ্রামবাংলা যেমন ছয় ঋতু আর বারো মাসে তার রূপ বদলায়। প্রতিমাস ও ঋতুতে কৃষিরও রূপ তেমনি পাল্টে যায়। হয়তো কৃষি ও ঋতুর নির্মম উল্টেপাল্টে যাওয়া ও রক্তাক্ত অনিয়ম নিয়েও আমরা আলোচনা করবো। তবে আজকের আলাপের কেন্দ্রীয় জায়গাটি হচ্ছে দেশের গ্রামীণ কৃষির শস্যপঞ্জিকার রূপ ও রূপান্তর। শস্যপঞ্জিকা হলো কোনো একটি অঞ্চলের শস্যফসলের নামতালিকার বার্ষিক খতিয়ান। কোনো একটি অঞ্চলে বছরের প্রতিমাসে কোন কোন শস্য ফসল বোনা/লাগানো হয় এবং কাটা/তোলা হয় তার একটি সংক্ষিপ্ত হিসাব হলো এই শস্যপঞ্জিকা। কোনো একটি অঞ্চলে কোনো জাত বা প্রজাতির বার্ষিক স্থায়িত্বকাল সম্পর্কেও একটি ধারণা পাওয়া যায় শস্যপঞ্জিকা থেকেই। এটি মাসভিত্তিক শস্যফসলের নাম ব্যবহার করেও হতে পারে আবার শস্যফসলভিত্তিকও এটি করা যেতে পারে। শস্যপঞ্জিকা দেখে সহজে একটি অঞ্চলে বছরে কি কি ধরণের শস্য পাওয়া যায় তার একটি প্রাথমিক ধারণা জন্মে, যা পরবর্তী উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনার বুনিয়াদ তৈরি করে। বাংলাদেশের বন্যাপ্লাবণ সমভূমি অঞ্চলের গ্রামীণ শস্যপঞ্জিকার সাম্প্রতিক পরিবর্তনশীলতা বিষয়ে প্রতিবেশীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাথমিক আলোচনা শুরুর জন্যই চলতি লেখাটির সূত্রপাত। এ জন্য বেছে নেয়া হয়েছে দেশের উত্তর-পূর্বের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত নেত্রকোণা অঞ্চলের আটপাড়া উপজেলার স্বরমুশিয়া ইউনিয়নের রামেশ্বরপুর গ্রামকে। দেশের খাদ্য ভান্ডারের অন্যতম জোগানদার এই হাওরাঞ্চলটি দেশের ঐতিহাসিক টংক, হাতীখেদা, তেভাগা ও নানকার কৃষক আন্দোলনের জন্যও স্মরণীয়। বারসিক ২০০১ সাল থেকে উক্ত গ্রামে কাজ করে আসছে। বারসিকের ধারাবাহিক কাজের সূত্র, নথি ও দলিল চলতি লেখাটিকে সহযোগিতা করেছে। প্রতিবেশীয় সমীক্ষা কাজটিকে আরো গতিশীল করেছে চলমান কর্মসূচি ও স্থানীয় জনগণের সাথে সাংগঠনিক সখ্যতার বিষয়সমূহ। চলতি সমীক্ষার ভেতর দিয়ে এটি স্পষ্ট হয়েছে কোনো গ্রামীণ কৃষির শস্যপঞ্জিকার রূপ ও বিরাজমানতা রূপান্তরিত বা বদলে যাওয়া বা পরিবর্তিত হওয়ার অনেকগুলো বহিরাগত কার্যকারণ থাকে। যার সাথে জড়িত রয়েছে স্থানীয় কৃষি সংস্কৃতি, ক্ষমতা সম্পর্ক, বাজার ব্যবস্থা, প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়নের দাপট, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ও নীতিমালা, উৎপাদনকারীর শ্রেণী, লিঙ্গ ও সাংস্কৃতিক অবস্থান, বিজ্ঞাপন ও বহিরাগত বলপ্রয়োগ, আবহাওয়া ও জলবায়ুগত প্রভাব, ভূমি ও কৃষিউপকরণ বিক্রেতা ও মালিকের সিদ্ধান্ত ও চাপ এবং সর্বোপরি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রতি সচরাচর অবহেলা ও অস্বীকৃতি। কোনো একটি অঞ্চলের শস্যপঞ্জিকা ওই অঞ্চলের কৃষি ও জনজীবনের বৈচিত্র্য ও সুরক্ষাময় জীবনের নির্দেশক। ভিন্ন ভিন্ন মাস ও ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন শস্যপঞ্জিকা একটি অঞ্চলের প্রাণসম্পদ ও জনগণের লোকায়ত বিজ্ঞানের জটিলতম সম্পর্ককেই তুলে ধরে। খুব কমই এটি প্রতিবেশ ও সংস্কৃতিভেদে ব্যতিক্রম হতে পারে। বাংলাদেশের কোনো একটি গ্রামের একশ বছরের শস্যপঞ্জিকার রূপ ও রূপান্তর বিষয়ে কোনো প্রতিবেশীয় সমীক্ষা এর আগে নজরে আসেনি। সেক্ষেত্রে গ্রামীণ শস্যপঞ্জিকা বিশ্লেষণকেন্দ্রিক একেবারেই প্রথম পর্যায়ের এধরণের লেখাতে তথ্য, তত্ত্বীয় কাঠামো এবং বিশ্লেষণের জায়গাগুলো খুব একটা যুতসই, পরস্পরসম্পর্কিত ও বৈচিত্র্যময় করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

 নিহত তুষাই নদীর পাড়ের এক কৃষি গ্রাম

 ইডা নাই ভিডা নাই

নদীর পারে ঘর

ফাতে খাঁ নাম রাখছে

রায় রামেশ্বর।

ব্রহ্মপুত্রের এক ছুটন্ত জলধারা তুষাই নদী। মুঘল সম্রাট আকবরের নির্দেশে তাঁর সহচর ফতেহ খাঁ সুবর্ণগ্রামের দিকে যাত্রাকালে তুষাই নদী পারের একটি গ্রামের নাম রাখেন রামেশ্বরপুর। কিন্তু তুষাই নদীটির কোনো চিহ্নই এখন আর নেই। স্থানীয় এলাকার জীবিত প্রবীণ মজিদ ব্যাপারির ভাষ্যমতে, এককালে তুষাই নদীটি রামেশ্বরপুর ও দেশীউড়া গ্রামের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ছিল । নদীটির কোনো চিহ্ন বা পাড় পাওয়া যায় না। দেশীউড়া গ্রামের উচাহিলা বাজার ছিল তুষাইপাড়ের বড় বাজার, জায়গাটি আজো উঁচু ঢিবি হয়ে আছে। নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলার ১নং স্বরমুশিয়া ইউনিয়নের ৪৫টি গ্রামের ভেতর দুটি মৌজা নিয়ে রামেশ্বরপুর এক প্রাচীন জনপদ। ময়মনসিংহ গীতিকার মতো এ অঞ্চলের কৃষিও গড়ে ওঠেছে স্থানীয় প্রাণ-প্রকৃতি ও প্রতিবেশের বৈচিত্র্য ও ধরণকে সাথে নিয়ে। আইয়োব (২০০৭) এর লেখা থেকে জানা যায়, রামেশ্বরপুর, সালকী, মাটিকাটা, পাহাড়পুর ইত্যাদি গ্রামগুলোর ভূমির ধরণ ও নামকরণ ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। রামেশ্বরপুর, পাহাড়পুর প্রভৃতি গ্রামগুলো গ্রিক নাগরিকদের নগরের আদলে নামকরণ। গ্রামগুলোর নামের শেষে পুর শব্দ ব্যবহার তার সাক্ষ্য বহন করে । রামেশ্বরপুর গ্রামের জনগণ মূলতঃ কৃষিকাজের মাধ্যমেই তাদের জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করেন। নেত্রকোণা জেলার পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত ১৯৫.১৩ বর্গ কিমি আয়তনের আটপাড়া উপজেলার মোট ১.২৯ বর্গ কি.মি নিয়ে রামেশ্বরপুর গ্রাম। গ্রামের কৃষকদের তথ্য মতে, গ্রামে মোট কৃষিজমির পরিমাণ ৫০০-৬০০ একর (প্রায়)। গ্রামে মোট একর সরকারি জমি (খাস) রয়েছে। বাকী জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন। আটপাড়া উপজেলার বাগড়া হাওর, গণেশের হাওর, কামরাইলের হাওর, নাঘড়া হাওর, ধলিবন হাওর, আটাশি বিল, গামা বিল, এলাচি বিলসমূহ অঞ্চলটিকে নিম্নজলাভ’মির ভূ-প্রতিবেশীয় বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে। আটপাড়া উপজেলার মোট জনসংখ্যা ১২০৪৯১ জন, মোট জনসংখার ৫১.১৫ % পুরুষ ও ৪৮.৮৫% নারী। উপজেলায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৯৭% মুসলমান ২.৩৮% হিন্দু ও ০.১৪% অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। শিক্ষার গড় হার ২৪% নারী ১৮.৭০% ও পুরুষ ২৯.৩%। চলতি লেখাটির সমীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে এই রামেশ্বরপুর গ্রামটিকেই বাছাই করা হয়। বর্ষাকালে মূলতঃ বৃষ্টির পানি, তুষাই নদীর জল এবং স্থানীয় পুকুর-বিল ও হাওরের পানির উপর নির্ভর করেই স্থানীয় এলাকার প্রাকৃতিক সেচ ব্যবস্থা গড়ে ওঠলেও এলাকার প্রধান জলধারা তুষাই নদী প্রায় বিশ বছর আগেই মরে যেতে বাধ্য হয়েছে। যন্ত্র দিয়ে মাটির তলার জল টেনে তুলে কৃত্রিম সেচ কার্যক্রম শুরু হয়েছে মূলতঃ ২০০৫ সালের দিকে। গ্রামটিতে ধান, পাট চাষের পাশাপাশি ডাল ও মওসুমি সব্জি চাষের কথা জানা যায়। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ সূত্রমতে, আটপাড়া উপজেলার ৮০ শতাংশই কৃষিজীবী। কৃষিপ্রধান এ উপজেলায় বছরের তিন মৌসুমেই ধান আবাদ হয়ে থাকে। এর ভেতর বোরো ও আমন ধানের আবাদ বেশি এবং এর পরেই আউশের অবস্থান। ধান ছাড়াও পাট, গম, ডালজাতীয় শস্য ও শাকসব্জির আবাদ হয়ে থাকে । ব্রহ্মপুত্র পললভূমি ও সুরমা পললভূমির এ অঞ্চল কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চল-৯ এর অর্ন্তভূক্ত হলেও এর কিছু অংশ কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চল-২১ এর ভেতরেও পড়েছে। আটপাড়া উপজেলার মোট আয়তন ১৯৩ বর্গ কি.মি. এবং মোট কৃষিজমির পরিমাণ ১৯,৩০০ হেক্টর। এর ভেতর মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১৫,৭৮৭ হেক্টর। বোরো, আউশ ও আমন ধানের পাশাপাশি গম, পাট, সরিষা ও শাকসব্জি চাষের জমির পরিমাণ উপজেলা কৃষিতথ্য মানচিত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। আটপাড়া উপজেলার ২.৩০৫ হেক্টর জমি গভীর নলকূপ, ৫,৭১০ হেক্টর জমি অগভীর নলকূপ, ৩২৮০ হেক্টর জমি এলএলপি এবং ১৬৫ হেক্টর জমি অন্যান্য সেচের আওতার অধীন। আটপাড়া উপজেলার কৃষি অফিসের সূত্র মতে, উপজেলায় মোট ৫৩,১৮৭ মে.টন খাদ্য শস্য উৎপাদিত হয় এবং উদ্বৃত্ত থাকে ২৮,২৬৩ মে.টন। বার্ষিক ২১,৯৪৩ মে. টন খাদ্য শস্য এই উপজেলার জন্য প্রয়োজন এবং প্রতিজনের জন্য দৈনিক ৪৫৩.৬০ মে.টন খাদ্য শস্য প্রয়োজন । উপজেলার মোট ১৩, ৪৯, ২৫ জনসংখ্যার ভেতর ১৬৭৪ জন বড়কৃষক, ৪৬২২ জন মধ্যম কৃষক, ৫৮১১ জন ক্ষুদ্র কৃষক, ৪৫৫৫ জন প্রান্তিক ও ২০৫০ জন ভূমিহীন কৃষক। আটপাড়া উপজেলার কৃষি অফিস থেকে এলাকায় ‘চাষীপর্যায়ে উন্নতমানের ধান, গম ও পাট বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প’; ‘চাষীপর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প’; ‘পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ ও মরিচ উৎপাদন বৃদ্ধির সমন্বিত প্রকল্প’; ‘এ্যাকশন প্ল্যান কর্মসূচির আওতায় ১৭.১৫% বোরো ধান উৎপাদন বৃদ্ধি’; ‘সমন্বিত ফসল ব্যবস্থাপনা (আইসিএম)’; ‘লিফ কালার চার্ট (এলসিসি)’ ইত্যাদি প্রকল্প ২০১০-২০১১ বর্ষের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। আটপাড়া উপজেলার স্বরমুশিয়া ইউনিয়ন তিনটি কৃষিব্লক নিয়ে গঠিত। তিনটি ব্লকের ভেতর অভয়পাশা কৃষিব্লকের আয়তন ৯৩০ হেক্টর। ফসলের নিবিড়তা ২২২% এবং জমি ব্যবহারের নিবিড়তা ৯৩%। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে এলাকায় ‘ডাল-বোনা আউশ-রোপা আমনের’ পাশাপাশি ‘সরিষা-বোরো-রোপা আমন’, ‘সব্জি-বোনা আউশ-রোপা আমন’ এবং ‘বোরো-ধৈঞ্চা-রোপা আমন’ ক্রপিং-প্যাটার্নসমূহ গ্রহণ করা হয়েছে।

 পঞ্জিকা শস্যফসলপঞ্জিকা

 আষাঢ়ের পঞ্চদিনে রোপয়ে যে ধান

সুখে থাকে কৃষি বল বাড়য়ে সম্মান।

ভাদ্রের চারি আশ্বিনের চারি

কলাই রোবে যত পারি।

আশ্বিনের ঊনিশ কার্তিকের ঊনিশ

বাদ দিয়ে যত পারিস মটর কলাই বুনিস।

ফা-ুনের আট চৈত্রের আট

সেই তিল দায়ে কাট।

(উপরিল্লিখিত খনার বচনসমূহ একইসাথে মাসভিত্তিক শস্যফসলের উপযোগিতাও তুলে ধরে, যা শস্যপঞ্জিকার অন্যতম বিবেচ্য বিষয়)

মিত্র (১৪০৫) পঞ্জিকা বিষয়ক তার একটি লেখায় জানিয়েছেন, পঞ্জিকা কথাটি সংস্কৃত শব্দ। যাতে মাস, বার, তিথি, নক্ষত্র প্রভৃতি বিষয় জানা যায় তাই পঞ্জিকা। পঞ্জিকার পরিসর বিস্তৃত। এর বর্ণনাগুলো খুঁটিনাটি বিষয়বহুল। পঞ্জিকার প্রচলন শুধু বঙ্গদেশ তথা ভারতবর্ষে নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও ভিন্ন ভিন্ন নামে এর প্রচলন রয়েছে। বঙ্গদেশে মুদ্রিত পঞ্জিকার বয়স মোটামুটি দু’শ বছর। খ্রীষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে রচিত ‘সূর্যসিদ্ধান্ত অনুসরণে খ্রীষ্টীয় ষোড়শ শতকের শেষ দশকে রচিত রাঘবানন্দের স্মারণী গ্রন্থই আধুনিক বাংলা পঞ্জিকার মূল উপাদান। যতদূর জানা যায় ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘রামহরি পঞ্জিকা’ হল বঙ্গদেশের প্রথম মূদ্রিত পঞ্জিকা। বিগত দু’শ বছরে বঙ্গদেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে পঞ্জিকা প্রকাশিত হলেও সেসমস্ত পঞ্জিকার প্রচলন এখন আর নেই। গুপ্তপ্রেশ পঞ্জিকা (১২৭৬ বঙ্গাব্দ), পি. এিম. বাকচির ডাইরেক্টরী পঞ্জিকা (১২৯০), বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা (১২৯৭), পূর্ণচন্দ্র ডাইরেক্টরী পঞ্জিকা (১৩২৫), মদনগুপ্তের ডাইরেক্টরী পঞ্জিকা (১৩৯০ বঙ্গাব্দ), বেণীমাধব শীলের ডাইরেক্টরী পঞ্জিকা (১৩৯২) প্রভৃতি পঞ্জিকাগুলোই হল বর্তমান কালের উল্লেযোগ্য বাংলা ডাইরেক্টরী পঞ্জিকা। পাঁচটি অঙ্গ নিয়ে পঞ্চাঙ্গ বা পঞ্জিকা। তাই বাংলা পঞ্জিকাতেও বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও কারণ এই পাঁচটি ভাগ রয়েছে । বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত ‘সুদর্শন ডাইরেক্টরী পঞ্জিকা ১৪১৮’ অনুযায়ী, শাস্ত্রীয় বিধান যথাসময়ে অনুসরণ করে ইহকালে সুষ্ঠুভাবে জীবনযাপন ও পরকালে অক্ষয় স্বর্গলাভের নিমিত্তে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের জন্য কাল বা সময়ের পাঁচটি বিশেষ ভাগ বিস্তারিতভাবে যে বইতে লেখা থাকে তাকেই পঞ্জিকা বলে । মিত্র (১৪০৫) পঞ্জিকা বিষয়ক লেখায় ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’ প্রকাশিত নির্মলচন্দ্র লাহিড়ীর ভারতকোষ (১৯৬৮/৬; ৬ খন্ড; পৃ. ২৮৪-৮৫) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, পঞ্জিকা বা পঞ্জী বা পাঁজী হলো যে পুস্তকে বছরের প্রতিদিনের তারিখ, তিথি, পর্বদিন, শুভদিন ইত্যাদি থাকে। সংস্কৃত সাহিত্যে এবং ভারতের অন্যান্য রাজ্যে এটি পঞ্চাঙ্গ নামেও পরিচিত । সকল ধরণের তথ্য প্রথম থেকেই পঞ্জিকাতে একবারে জায়গা করে নেয়নি। গ্রাহকের চাহিদা অনুসারে পঞ্জিকাতেও বছর বছর নিত্যনতুন তথ্য ও বিবরণের সমাবেশ ঘটেছিল। এ নিয়ে চৌধুরী (১৪০৫) তার একটি লেখায় জানিয়েছেন, ১৮২৫-২৬ খৃষ্টাব্দে পঞ্জিকার সঙ্গে আদারতের ফি, ডাকের মাশুল ইত্যাদি তথ্য সংযোজিত হয়েছে। ১৮৩৫-৩৬ সালের দিকে দেখা যাচ্ছে পঞ্জিকায় ভারতের ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। ছুটির হিসাব, জোয়ার-ভাটা, টাকা-পয়সা বিনিময় হার এসবও যুক্ত হয়। ১৮৫৫-৫৬ এবং ১৮৫৬-৫৭ সালে প্রকাশিত পঞ্জিকাতে অন্যান্য কিছুর সাথে যুক্ত হয় মাসিক কৃষিকাজের বিবরণ । পঞ্জিকায় কৃষিবিষয়ক তথ্যসমূহ ‘কৃষিতত্ত্ব’ নামে বিবরণ করা হয়। কোন মাসে কি ধরণের শস্য-ফসল চাষ করা যায় বা উত্তোলনের মাস কোনটি এবং চাষ করার শুভাশুভ লগ্ন ও তিথি সচরাচর পঞ্জিকাতে লেখা থাকে। মিত্র (১৪০৫) পঞ্জিকার মলমাস বিষয়ক একটি লেখায় কৃষির সাথে পঞ্জিকার সম্পর্ক বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। আমাদের বারব্রত, পাল-পার্বণ কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে সবসময়েই সামঞ্জস্য রেখে অনুষ্ঠিত হয়। পৌষ মাস ফসল সংগ্রহের মাস। সারাবছরের ভাত-কাপড়ের সংস্থান ঘরে তুলতে হবে, মহাজনের ধার শোধ করে কি হাতে থাকে তার হিসাব করতে হবে, তবে সামাজিক বা ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কৃত্যাদি সম্পন্ন করার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। তাই এ মাসে কৃষিনির্ভর জনগণের অন্য কোনদিকে তাকাবার অবকাশ নেই। এ সময়েই সব উৎসব ও মেলার সমারোহ । পঞ্জিকার পাশাপাশি শস্যপঞ্জিকা বা শস্যফসলপঞ্জিকা’ কৃষিপরিসরে বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়। কোনো একটি অঞ্চলের বার্ষিক শস্য-ফসলের সামগ্রিক খতিয়ান হলো শস্যপঞ্জিকা। একনজরে যা দেখে বছরের কোন সময়ে ওই এলাকায় কোন কোন ফসল চাষ বা উত্তোলন করা হয় এবং একটি ফসলের সার্বিক স্থায়িত্বকাল সম্পর্কে শস্যপঞ্জিকা থেকে জানা যায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা শস্যপঞ্জিার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছে, The Crop Calendar provides information about sowing and planting seasons and agronomic practices of the crops grown by farmers in a particular agro-ecological zone. It is a tool developed to assist farmers, extension workers, civil society and the private sector to be able to access and make available quality seeds of specific crop varieties for a particular agro-ecological zone at the appropriate sowing/planting season. আমেরিকার সাউভি দ্বীপে অবস্থিত Sauvie Island farms তাদের একটি বার্ষিক শস্যপঞ্জিকায় তাদের খামারে বছরের যেসব ঋতুতে বিভিন্ন ফুল ফলাদির উপস্থিতি থাকে সে সময়টাকেই কেবলমাত্র উক্ত ফলফলাদির ঋতুকাল হিসেবে দেখিয়েছেন । ইউএসডিএ তাদের একটি ওয়েবসাইটে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্থানের শস্যপঞ্জিকা বিষয়ক বিবরণের ক্ষেত্রে নির্বাচিত শস্য-ফসল বপণ ও উত্তোলন উভয়কালকেই দেখিয়েছে । শস্যপঞ্জিকাসংক্রান্ত একটি ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায় প্রতিমাসে প্রতিটি ফসলের চাষ উপযোগিতাসহ উত্তোলনও শস্যপঞ্জিকার বিবৃত বিষয় ।

 রবি আর বৃহস্পতিবার হইল কৃষিকাজের জন্য শুভবার। শুভ তারিখ দেইখ্যা আমরা হালচাষ শুরু করি।

এহন ট্রাক্টর আওনে আর বার ক্ষণ গণণা নাই। একটা হইলেই হইলো।

 রামেশ্বরপুর গ্রামে বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার মূলতঃ বাঙালি মুসলিম পরিবারের চাইতে হিন্দু পরিবারসমূহে তুলনামূলকভাবে বেশি। মাত্র ২০-৩০ বছর আগেও অনেক হিন্দু পরিবারে বাৎসরিক পঞ্জিকা কেনার রেওয়াজ ছিল। পঞ্জিকা দেখে ঘর সঞ্চার, গৃহপ্রবেশ, হলকর্ষণ, জমিরোপণ, জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে সম্পর্কিত কৃত্য পালন করা হতো। চলতি সময়ে পঞ্জিকা দেখে চাষাবাদের রেওয়াজ পাল্টে গেছে। যেসব পরিবারের সাথে চলতি সমীক্ষার জন্য আলাপ হয়েছে এমন ২টি পরিবারে কেবলমাত্র ছোট বাংলা পঞ্জিকা (হাফ পঞ্জিকা নামে পরিচিত) আছে। রামেশ্বরপুরের স্থানীয়ভাষায় পঞ্জিকাকে পাঞ্জি বা পুঞ্জিয়া বলে। তারা বলেন, আমরা সরকারি পুঞ্জিয়া দিয়া কাম করি না, আমরার বাংলা পাঞ্জির কাম’। বাংলাদেশে এখন বাংলা সনের দুটি ধারা প্রচলিত হয়েছে। একটি হলো বাংলা সনের ঐতিহাসিক প্রাচীন ধারা যা বাংলা পঞ্জিকা নামে গ্রামাঞ্চলের মানুষ যারা মূলতঃ বাংলা সন-তারিখ মেনে চলেন তারা পালন করেন। অন্যটি রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত বাংলা পঞ্জিকা। রাষ্ট্রের সুবিধার জন্য প্রতিবছরের ১৪ এপ্রিল তারিখকে বাংলা সনের পহেলা বৈশাখ ধরে এই পঞ্জিকাটি তৈরি করা হয়েছে। সরকারি কাজে, গণমাধ্যমে এবং মূদ্রণে এই তারিখটির চল হলেও গ্রামাঞ্চলে এই পঞ্জিকার কোনো গুরুত্ব নেই। কারণ এর সাথে মূল বাংলা পঞ্জিকার দিন তারিখের বিস্তর ফারাক। এছাড়াও মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য মুসলমানী মোহাম্মদী পঞ্জিকা এবং সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য লোকনাথ, বিশুদ্ধ পঞ্জিকার জনপ্রিয়তা বেশি। স্থানীয় কৃষক পরিবারের তথ্যমতে, নতুন ঘর তৈরির সময় এবং জমিতে বছরের প্রথম হাল-চাষের সময় এখনও কোনো কোনো পরিবারে এটি পঞ্জিকা দেখে করা হয়। হিন্দু কৃষক পরিবারের মতে, তারা রবি ও বৃহস্পতিবারে হাল চাষ শুরু করেন, এদিনগুলোকে তারা শুভবার হিসেবে দেখেন। তবে অনেকেই বলেন, এখন ট্রাক্টরভিত্তিক চাষ শুরু হওয়ায় পঞ্জিকার তিথি বার দেখে হাল-চাষের প্রচলন কমে গেছে। আমরা পরবর্তীতে গ্রামীণ শস্যপঞ্জিকার পরিবর্তনশীলতার কারণ ও রূপগুলো জানাবোঝার চেষ্টা করবো। তবে তার আগে আমরা গবেষিত অঞ্চলের কৃষির ধারাবাহিক ক্রমবিকাশ এবং কৃষির সাথে সম্পর্কিত শস্য ফসলবৈচিত্র্যের রূপান্তরের স্থানিক ইতিহাসটি নিয়ে কিছুটা আলোচনা করবো।

পরের অংশটুকু সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

http://z.barciknews.com/?p=230

happy wheels 2
%d bloggers like this: