সাম্প্রতিক পোস্ট

গ্রামীণ শস্যপঞ্জিকা : রূপ ও রূপান্তর ( ২য় অংশ)

প্রথম অংশ সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

http://z.barciknews.com/?p=227

 কৃষির ধারাবাহিক ক্রমবিকাশ ও বৈচিত্র্যের রূপান্তর

ঐতিহাসিকভাবে সমীক্ষা অঞ্চলে কৃষিফসলের প্রায়টাই জুড়ে আছে ধান। আজ থেকে ১৫/২০ বছর আগে প্রধান ফসল ধান চাষের পাশাপাশি অন্যতম প্রধান ফসল হিসেবে পাট চাষ করা হত। হোসেনের (২০০১) একটি মাঠকর্ম অভিজ্ঞতা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নেত্রকোণার স্বরমুশিয়া অঞ্চলে তৎকালীন সময়ে বছরে তিনবার ধান চাষ ও পাট আবাদ হতো । রুবিন ও হোসেনের (২০০২) গ্রামসভার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তৎকালীন সময়ে পুখলগাঁওয়ের বিলে স্থানীয় জাতের ধান চাষ হতো । কিন্তু সরকার ও বিশ্বাসদের (২০০৩) একটি গ্রামসভা প্রতিবেদনে নেত্রকোণার স্বরমুশিয়া ইউনিয়নের আইমাদেবীপুর গ্রামের কৃষক সিদ্দিকুর রহমানকে উদ্বৃত করে বলা হয়েছে, আগে পাট আছিল আমাদের সানালী আঁশ অহন আমরা পাট করি না খালি ধান করি । সামাদের (২০০২) প্রকল্প কর্মসূচি বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে নেত্রকোণা অঞ্চলের মালা, বিন্নী ও আইজং ধানের নাম জানা যায় । সামাদের (২০০৩) প্রকল্প কর্মসূচি বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তৎকালীন সময়েও নেত্রকোণা অঞ্চলে দেশি খামা ধানের আবাদ হতো । ২০০৫ সনের স্বরমুশিয়া গ্রামে অনুষ্ঠিত একটি গ্রামসভার বিবরণী থেকে জানা যায় তৎকালীন সময়ে স্থানীয় এলাকায় বোরো মওসুমে কেবলমাত্র ব্রিধান-২৯, কাইস্যাবিন্নী ও আইজং ধান চাষ হতো । ২০০৬ সনে নেত্রকোণার স্বরমুশিয়া (রামজীবনপুর) গ্রামের কৃষক আবদুর রশীদের উঠানে আয়োজিত গ্রামীণ কর্মশালায় উপস্থিত নারীরা স্থানীয় এলাকায় তৎকালীন সময়ে চাষ হওয়া শাকসব্জির একটি তালিকা তৈরি করেন। লাউ, কুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, বাঙ্গী, চিরিন্দা, ঝিঙ্গা, মুগজই, করল্যা, পাতা করল্যা, কাকরুল, উষশি, বেগুন, টমেটো, কাঁচামরিচ, হলুদ, গোলআলু, মিষ্টিআলু, ভেন্ডী, ডেংগা, মূলা, গাজর, শসা, ক্ষিরা, কলা, লালশাক, সাজনা, শালগম, কপি, বাটিশাক, পেঁপে, পটল, ধনিয়াশাক, গুয়ামৌরী ইত্যাদির নাম উল্লিখিত তালিকাটি থেকে পাওয়া যায় ।

২০০৭ সালে নেত্রকোণার রামেশ্বরপুর গ্রামের কৃষক সায়েদ আহম্মদ খান বাচ্চুর বাড়িতে অনুষ্ঠিত ‘স্থায়িত্বশীল কৃষি সম্পর্কিত এক গ্রামীণ কর্মশালায়’ স্থানীয় কৃষাণী হাজেরা বেগম বলেন, কিছুদিন আগেও কৃষকরা এক ক্ষেতে অনেক জাতের চাষ করতো যেমন, পাট, ধান আবার মরিচ, লাউ। তারা একে সময় একেক চাষ করতো। কিন্তু অহন খালি এক জাতের ধান চাষ করে । সামাদের (২০০৮) বার্ষিক কর্মসূচি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বারসিকের সহযোগিতায় নেত্রকোণার স্বরমুশিয়া ইউনিয়নের রামেশ্বরপুরে ২০০৭ সালের আমন মৌসুমে মুগী, তিলবাজাল, পুইট্টাআজং, খামা, গচি, জলকুমড়ি, ভোলানাথ, চানমুন্নী, শাইল এই নয়টি গভীর পানির ধান জাত নিয়ে ‘অংশগ্রহণমূলক জাত বাছাই কার্যক্রম’ সংগঠিত হয়। ২০০৭ সনের আমন মৌসুমেই উপরিল্লিখিত নয়টি জাতসহ অঘনঢেপী, ব্রিধান-৩২, ব্রিধান-১, আইজং, ইউরচাউল, বাদশাভোগ, ছিলটবালাম, চাপালনি, রাজাশাইল, আনামিয়া, আলফা, হরি, লখাইবলাস, মুড়াবাজাল, গেংগেনবিন্নী, কার্তিকবিন্নী, ডাকশাইল, গচ্চ্যা, কালিজিরা, রতিশাইল, কাজলশাইল, মরিচশাইল, অগ্নিশাইল, ব্রিধান-৩৯, ব্রিধান-২৮, বিনা, নাতিশাইল, মুক্তা, ব্রিধান-২৯, বোরোঝাকি, লালকুমড়ি, রায়মুখী, সাকালুরি বিরান, গারো আইজং, চিনেকানাই, বইয়াখাউড়ি, রাঙ্গাবিন্নী, পংখীরাজ, কলমীলতা, তুলশীমালা, চিনিশাইল, শিরবাস, আপাচি, বনফুল, খাইচুরি, কাঠিগচ্চ্যা, লেদ্রাবিন্নী, গোহাটিবিন্নী, বিরুই, দাফা, বিন্নী, চেটচেং, মৌবিন্নী, চাপলানি, আরপারিনা, নুনিয়া, কুমড়োগড়, বাইগনবিচি, চাপশাইল, লাটুং, রিচাক্ষুত্রা, জটাইবালাম, দুধবিন্নী, সাদাগোটাল, দূর্গাভোগ, নাজিরশাইল, মালশিরা, গলচাপা, নোনাখচি, সাহেবখচি, রানীসালট, বুকাইয়ার, গোলাপী, লাল আনামিয়া, স্বর্ণলতা, আশু, বাটা চৌদি, গোবিন্দকালার, কাশিপুডি, চায়না, বালুয়াচুংরা, ঘুশি, আরা, মোটামালতী, হলদেগোটাল, বগুড়া, কার্তিকশাইল, বাঁশফুলবালাম, ঘিগজ, চরোবালাম, তেইশবালাম, বুড়ি, বুচি, পিপঁড়ারচোখ ।

নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যৌথভাবে ৫ জুন ২০০৫ এর বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বৃক্ষমেলা আয়োজন করে ৬-৮ জুলাই ২০০৫। উক্ত বৃক্ষমেলায় বারসিক নিম, হরতকি, বহেরা, আমলী, নাগেশ্বর, অর্জুন, নিশিন্দা, বাশক, ঘৃতকুমারী, কালমেঘ, উলটকম্বল, ভৃঙ্গরাজ, শতমূলী, পাথরকুচি, পান, অশোক, আগর, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, নারকেল, জলপাই, আমড়া, লেবু, রেইনট্রি, সুপারি, জাম গাছের চারা প্রদর্শন করে । ২০০৬ সালের ৩০ জুলাই থেকে পহেলা আগস্ট পর্যন্ত আয়োজিত বৃক্ষমেলায় বারসিক নিম, উলটকম্বল, বহেরা, আমলকী, চন্দন, হরতকি, দারচিনি, অর্জুন, শতমূলি, নাগরাজ, বেল, আতাফল, নারকেল, কাগজিলেবু, জামবুরা, করমচা, জামরুল, কদবেল, ডালিম, বড়ই, পিয়ারা, আম, কাঠাল, জলপাই, সুপারি, জাম, লেচু, মরিচ, এলাচি, বকুল, নয়নতারা, বাগানবিলাস, চালতা, পান ও তুকমা প্রদর্শন করে । ১৭-১৯ জুলাই ২০০৭ তারিখে আয়োজিত বৃক্ষমেলায় বারসিক অশোক, আমলকি, বেল, লেবু, কদবেল, পেঁপে, জামরুল, লেচু, সুপারি, অরবড়ই, নিম, কামরাঙ্গা, চালতা, বহেরা, জামবুরা, আমড়া, করমচা, কমলালেবু, আম, এলাচি, বেলীফুল, পান, লটকন, কাঁঠাল, জলপাই, হরতকি, জাম, অর্জুন, ডালিম, পেয়ারা, চন্দন, নিশিন্দা, কাগজী লেবু, নারকেল, ওলটকম্বল ও আদা প্রদর্শন করে ।

রামেশ্বরপুর গ্রামের সামগ্রিক তথ্যবিবরণ বিষয়ক বারসিক’র (২০০৭) এক সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, একসময় রামেশ্বরপুর গ্রামের কৃষকরা বছরে মোট দুইবার ধান চাষ করত। দুইবার চাষ করার ক্ষেত্রে জমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী যেখানে কৃষক কোন ফসল চাষ করত তা নির্ধারণ করত। বিশেষ করে আমন মৌসুমে মোট কৃষিজমির প্রায় ৯৫-৯৮ ভাগ জমিতে বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করা হতো। গ্রামের কৃষকদের তথ্যমতে, ১৯৭০ সালের দিকেও গ্রামে মোট ৫০-৬০ জাতের ধান চাষ করা হত। উঁচুজমিতে বিরই, বাদশাভোগ, আউশ, রতিশাইল, বতিশাইল, কইলা-জিরা, নীচু জমিতে যেখানে বছরে ৪/৫ মাস পানি জমে থাকে সেখানে ভরত, কাইননল, খামা, তেলুযা বাজাইল ধান চাষ করা হত। উঁচু জমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য পর্যায়ক্রমিকভাবে পাট চাষ করা হতো। আগের দিনে কৃষিকাজের ক্ষেত্রে মাস দিন তারিখের গণনা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বৈশাখ মাসে বৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে আউশ বা পাট চাষ শুরু হত। বৈশাখ মাসের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে আউশ মৌসুমের ধান বাইন করা হত। আষাঢ় মাসের পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে সেই জমির ধান বৃদ্ধি পেত। এছাড়া যেসব জমি পতিত রয়েছে সেই সব জমি রোপণের জন্য কৃষকরা উঁচু জমিতে বীজতলা তৈরি করত আষাঢ় মাসের প্রথম দিকে। আষাঢ় মাসের প্রথম ও শেষের দিকে জমি প্রস্তুত করে বিভিন্ন জাতের ধান লাগানো হত। শ্রাবণ মাসের শেষের দিকে ধান পাট কেটে সেই জমিতে পুনরায় বিভিন্ন জাতের দেশী ধান রোপণ করা হত। কার্তিক মাসের শেষের দিকে যেসব জমির মাটি কাদা পানি থাকতো সেইসব জমিতে ধান গাছের মধ্যেই বিভিন্ন ধরনের তেল, ডাল জাতীয় বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হত। ধান কাটার পর সেই জমিতে কৃষকের প্রয়োজন মত অন্যান্য ফসল যেমন আলু, মরিচ, টমেটোসহ অন্যান্য রবি শস্যের জন্য জমি প্রস্তুত করে সেখানে বৈচিত্র্যময় ফসল চাষ করা হতো। মাঘ মাসে হাওরের নীচু জমিতে চাষ করা হতো বিভিন্ন জাতের বোরো ধান ।

রামেশ্বরপুর গ্রামের কৃষিতান্ত্রিক কর্মকান্ডকে বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথমেই কৃষির অন্যতম একটি উপাদান জমির বণ্টন ব্যবস্থা বা জমির প্রকৃত অবস্থা জানা প্রয়োজন । পাশাপাশি গ্রামীণ শস্যপঞ্জিকা ক্রম পরিবর্তনশীলতার সাথেও গ্রামীণ কৃষিজমির মালিকানা ও ব্যবহারের ধরণের সম্পর্ক রয়েছে। আর তাই গ্রামের কৃষিজমির মালিকানার ও ব্যবহারের সম্পর্কটি বোঝা জরুরি। গ্রামে মোট কৃষি জমির পরিমাণ ৫০০-৬০০ একর (প্রায়)। জমির মালিকানা বা চাষের ক্ষেত্রে চার ধরনের ব্যবস্থা বিদ্যমান। অনেকেই নিজের জমি নিজে চাষ করেন, এসব জমি তারা অনেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা পেয়েছেন বা অনেকে ক্রয় করেছেন। গ্রামে বর্গা, কট/বন্ধক, ঠিকা পদ্ধতিতে বড় বা মাঝারি কৃষক তার নিজের পুরো জমি নিজে না করে অন্য কোন প্রান্তিক বা ভুমিহীন কৃষকদের মাধ্যমে কিছু জাতের মাধ্যমে জমি চাষ করান। এখানে চাষের ক্ষেত্রে জমির মালিকরা চাষীকে ফসল চাষ বাবদ সার ব্যবহারের জন্য কিছু/অর্ধেক খরচ দেন। বাকি চাষসহ অন্যান্য খরচ বহন করেন চাষী নিজে। ফসল উঠার পর জমি চাষী ও জমির মালিক জমিতে উৎপাদিত মোট ফসল অর্ধেক করে ভাগ করে নেন। সেক্ষেত্রে এই চাষ পদ্বতিকে বর্গাচাষ বলা হয়। আরেক ধরনের বর্গাপ্রথাকে বলা হয় কট বা বন্ধকী। জমির মালিক তার নিজস্ব জমি সম্পূর্ণভাবে বিক্রি না করে অন্যের কাছ থেকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিয়ে জমি হস্তান্তর করে। যে সময়ে টাকা পরিশোধ করা হবে সেই সময়ে জমি ফেরত পাবে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য থাকে বন্ধক দেওয়া জমি জমির মালিক একবছর আগে ফেরত পাবে না। এই পদ্ধতিকে স্থানীয়ভাবে জমি কট নেয়া বলে। এই এলাকায় জমি কট বা বন্ধকের ক্ষেত্রে ২০১০-২০১১ সালে কাঠা প্রতি (প্রতি ১০ শতাংশে ১ কাঠা) মোট ১৮,০০০-২০,০০০ টাকা নেওয়া হয়। উল্লেখ্য গ্রামের বন্ধকী জমির বিশ্লেষণ করে দেখা যায় মাঝারী বা প্রান্তিক কৃষক তার নিজস্ব জমি বন্ধক দেয় বেশি। বন্ধক নেয়ার ক্ষেত্রে কোন ব্যবসায়ী বা চাকুরীজীবীরা সবচেয়ে বেশি জমি বন্ধক নেয়। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও’র সদস্যরা এনজিও থেকে ঋণ তুলে জমি বন্ধক নিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে জমির প্রকৃত মালিক যে পর্যন্ত বন্ধকি টাকা পরিশোধ করতে না পারে সে পর্যন্ত জমি ফেরত পায় না। রামেশ্বরপুর গ্রামসহ এই অঞ্চলে বন্ধকী প্রথা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। অনেক সময় দেখা যায় জমির মালিক তার বন্ধকী টাকা পরিশোধ না করতে পেরে অবশেষে তার কাছে জমিটা বিক্রি করে দেয়। এক্ষেত্রে দেখা যায়, অধিকাংশ কৃষক এভাবেই বন্ধকিপ্রথার জন্য তাদের জমি হারাচ্ছে। বিশেষ করে মাঝারী বা প্রান্তিক কৃষকরা, অন্যভাবে বলা যায় গ্রামের কৃষকদের জমি হারানোর/বিক্রি করার প্রথম ধাপ হচ্ছে জমি বন্ধক দেওয়া। এছাড়াও আরো একটা পদ্ধতি হচ্ছে ঠিকা পদ্ধতি। সাধারণ একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্যেকে চাষ করতে দেওয়াকে ঠিকা পদ্ধতি বলে। ঠিকা পদ্ধতিতে সময় উল্লেখ থাকার কারণে মালিক জমি ফেরত পেয়ে যায় তবে এখানে টাকা পরিমাণ কম থাকে। এক কাঠা জমি ৮০০-৯০০ টাকা দিয়ে ঠিকা নিলে এক বছর চাষাবাদ করা যায় ।

রামেশ্বরপুর গ্রামের কৃষিকাজ এখনও অনেকটাই প্রকৃতিনির্ভর। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আধুনিক পদ্ধতির সংযোজন ঘটেছে এই মাত্র। আগেরদিনে চৈত্র থেকে বৈশাখ মাসের শেষের দিকে আউশ ধান বাইন করে লাগানো হত। বর্তমানে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে কৃষকরা জালা চারা রোপণ করে। কৃষকদের প্রাপ্ত তথ্য মতে, আজ থেকে ১৫/২০ বছর আগে এলাকার মোট জমির প্রায় ৫০% আউশ বা পাট চাষ করা হতো। বাইন পদ্ধতিতে অতিরিক্ত ঘাস হওয়ার কারণে কৃষকরা এখন রোপণ পদ্ধতিতে ধান চাষ করে। এছাড়া আউশ ধান চাষের ক্ষেত্রেও কিছুটা পার্থক্য এসেছে। আগে যেখানে আউশ মৌসুমে আউশ জাত ছাড়াও জোসাল্লা, জাষাইল, চান্দিনা, মালা প্রভৃতি দেশী জাতের বৈচিত্র্যময় ধান চাষ করতো এখন সেখানে অধিকাংশ কৃষক কাইশাবিন্নী ধান চাষ করে যা মূলত ভারতের স্থানীয় জাতের ধান। গত ১৫/২০ বছর ধরে এই এলাকায় এ ধান চাষ করা হচ্ছে। কাইশ্যাবিন্নী চাষ করার ক্ষেত্রে কৃষকদের বক্তব্য হচ্ছে এর উৎপাদন বেশি, খরচ কম এবং মোটামুটি শুষ্ক আবহাওয়া সহ্য করতে পারে। এলাকায় জমির পরিমাণ করে (আনুমানিক) দেখা গেছে গ্রামের মোট জমির ১/৪ অংশ বর্তমানে আউশ ধান চাষ করা হয় যা ৭/৮ বছর আগে প্রায় ১/১০ অংশ নেমে এসেছিল। আর যে ১/৪ অংশ আউশ মৌসুমের ধান চাষ করা হয় তার মধ্য প্রায় ৯০% হচ্ছে কাইশাবিন্নী জাত। কিন্তু পূর্বে থেকে এসময়ে পাটের চাষ কমে এসেছে। গ্রামে মোট জমিতে প্রায় ১০ কাঠাও পাট চাষ করা হয় না। আমন মৌসুম শুরু হয় মূলত আষাঢ় মাস থেকে।কিন্তু এই এলাকায় আমন মৌসুমে দু’পর্যায়ে ধান চাষ করা হয়। জেরের জমি তথা নিচু জমিতে বছরে ৪/৫ মাস পানি থাকে জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে আষাঢ় মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এখানে ধান লাগানো হয়। ভরত, মহলশাইল, খামা, খাইনল, গোচী, গেলানাথ ইযর, জলজমতী প্রভৃতি ধান চাষ করা হয়। আমন ধান চাষ করার আরো একটা পদ্ধতি আছে যাকে স্থানীয়ভাবে কওড়া ধান বলে। গ্রামীণ কৃষিকাজের ক্ষেত্রে রবিশস্য একটা গুরুত্বপূর্ণ ফসল। পূর্বে রামেশ্বরপুর গ্রামের রবিশস্যের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফসল ছিল ডাল ও তেল জাতীয় ফসল, মটর খেশারী, বুট, মাসকালাই, ফরু (শরিষা) তিশি ফসল ব্যাপকভাবে চাষ করা হত। বিশেষ করে খেশারীকালাই। এছাড়া আলু, পিঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আদা, হলুদ, টমেটো প্রভৃতি চাষ করা হত। রামেশ্বরপুর গ্রামের বর্তমান রবিশস্যের চাষের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ইরি ধান চাষ করার কারণেই মূলত অনেক ধরনের ফসল চাষ করা সম্ভব হয় না। বর্তমানে অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান কাটার পর যে সব জমির মাটিতে রস থাকে সেসব জমিকে প্রস্তুত করে কৃষকরা আলু, পিঁয়াজ, রসুন, মরিচ, জিরা, টমেটো, মূলা, সবজিসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করে। তবে এই চাষের সংখ্যা খুব কম, বারসিক বিভিন্নভাবে বৈচিত্র্যময় ফসল চাষ করার ক্ষেত্রে কৃষকদের উদ্ধুদ্ধ করে থাকে। বারসিকের কাজের ফলে কৃষিকাজের ক্ষেত্রে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, এখন অনেক কৃষকই কিছু কিছু ক্ষেত্রে রবিশস্য চাষ করে থাকে । পৌষ মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয় ইরি-বোরো মৌসুম। পৌষ মাসে যেসব জায়গায় সেচের সুবিধা আছে সেই সব জায়গায় ইরি ধানের বীজতলা করা হয় ।

রামেশ্বরপুর গ্রামের ডিপটিউবয়েলটি সরকারি হলেও সেটা বর্তমানে চলে ব্যক্তি মালিকানায়। গ্রামের শাহজাহান মেম্বার সরকারের নিকট থেকে ৫ বছরের জন্য ডিপটি লিজ নিয়েছিলেন। ডিপ চালানোর জন্য যে পরিমাণ বিদুৎ খরচ হবে সেটা মেম্বার পরিশোধন করবে, এক্ষেত্রে মাঠে কখন ডিপ ছাড়বে কি পরিমাণ পানি দেবে, প্রতি কাঠা জমি চাষের জন্য কি পরিমাণ টাকা কৃষকদের কাছ থেকে নিবে সে বিষয়গুলো, সবগুলো নির্ধারণ করবে যে ডিপ লিজ নেবে সে। তার নির্ধারিত ফি যদি কেউ পরিশোধ করতে না চায় তবে বীজ চারা থাকা সত্ত্বেও সে জমি চাষ করতে পারে না। এক্ষেত্রে অনেকে আছেন চারা বীজতলা তৈরি করার পরও ধান চাষ করতে পারে না শুধুমাত্র ডিপ মালিকের অযোক্তিক দাবি না মানার কারণে। ১৯৯৭ সন থেকে রামেশ্বরপুর গ্রামে ডিপমেশিন আসার কারণে ইরি ধানের চাষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে টিউবয়েলের সমস্যা, বারসিকের কাজ, অত্যাধিক খরচ, জমির উর্বরতা, বিভিন্ন পোকার আক্রমণ প্রভৃতি কারণে বর্তমানে ইরি চাষের প্রতি কৃষকদের কিছুটা অনীহা দেখা দিয়েছে। ২০০৭ সালে রামেশ্বরপুর গ্রামে ইরি বোরো মৌসুমে প্রায় ১২০০-১৫০০ কাঠা জমিতে ধান চাষ করা হয়। এই মৌসুমের ধান চাষের ক্ষেত্রে রামেশ্বরপুর গ্রামের কৃষকরা মূলত বিরি বা স্থানীয় জাতের ধান যেমন, বি-আর-২৮, ২৯, কাইশাবিন্নী, গোল ইরি, আইজং, গাজী চাষ করে। রামেশ্বরপুর গ্রামের কৃষকদের প্রাপ্ত তথ্যমতে, এই মৌসুমে কৃষকরা জমিতে কাঠাপ্রতি গড়ে ৪ মণ ধান করে থাকেন । রামেশ্বর পুর গ্রামে এই বছর যে সব জমিতে ইরি ধানের চাষ করা হয়েছে সেগুলো চাষ করা হয়েছে শ্যালো বা ডিপ মেশিনের দ্বারা সেচের মাধ্যমে। গ্রামে একটি ডিপ মেশিন ও চারটি শ্যালো রয়েছে। এছাড়া অন্য গ্রামের দুটি মেশিন থেকে পানি এনে এই গ্রামের কিছু ক্ষেতে পানির সাহায্যে চাষ করা হয়। সব মিলিয়ে গ্রামে ২০০৫ সালে ১২৮০ কাঠা জমিতে ইরি ধানের চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে রামেশ্বরপুর গ্রামের ডিপ মেশিনের নিয়ন্ত্রণে ৪৬৬ কাঠা, অভয়পাশা ডিপের নিয়ন্ত্রণ ২০৪ কাঠা, দেশিউড়া ডিপের নিয়ন্ত্রণে ১৮৬ কাঠা। এছাড়াও রামেশ্বরপুর সুনীলের মেশিনে ৯৬ কাঠা, কাওমের স্যালোতে ১০২ কাঠা, নকুলের স্যালেতে ৮২ কাঠা, নজরুলের স্যালোতে ৪৪ কাঠা, ধনেশের মেশিনে ১০০ কাঠা জমি চাষ করা হয়। গ্রামবাসী ও নিজস্ব পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় যেসব কৃষকের একত্রে ৪০/৫০ কাঠা জমি আছে তারা নিজেরাই চেষ্টা করে নিজেদের জমির উপর একটা স্যালো মেশিন বসিয়ে নিজেদের জমি চাষসহ আশে পাশের কৃষকের জমিতে টাকা ও ধানের বিনিময়ে সেচ সুবিধা দেওয়া। কৃষকের তথ্য মতে, একটি নলকুপ ভালো মতো চললে ১০০-১১০ কাঠা জমিতে সেচ সুবিধা দিতে পারে। যেসব জমির মালিকের নিজস্ব মেশিন নেই তারা ইরি চাষ করার ইচ্ছা পোষণ করলে ডিপ বা স্যালো মেশিনের মালিককে অগ্রিম টাকা পরিশোধের মাধ্যমে পানি নিয়ে কৃষিকাজ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে শ্যালো মেশিন ব্যক্তিগত হলেও এলাকার অধিকাংশ ডিপগুলো সরকারি। এলাকার শাজাহান মেম্বার রামেশ্বরপুর গ্রামের ডিপটি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নিরাপত্তা ফি দিয়ে পাঁচ বছরের জন্য লিজ নিয়েছেন। মেশিন চালানোর পর যে পরিমান বিদ্যুৎ বিল আসবে তা ডিপের মালিক শাজাহান মেম্বার দিয়ে দিবেন। এ ক্ষেত্রে শাজাহান মেম্বার জমি চাষের জন্য গ্রামের কৃষকদের নিকট থেকে মোট ৫০ টাকা (জমিতে পানি দেয়ার পূর্বে পরিশোধ করতে হয়) এবং ৩৬ কেজি ধানের বিনিময়ে এক কাঠা জমিতে এই বছর ইরি চাষ করতে যে পরিমাণ পানি দরকার তা ডিপের মাধ্যমে দিবে। এই পদ্ধতিতে গ্রামে ডিপের অধীনে মোট ৪৬৬ কাঠা জমি চাষ হয়। এ বছর চাঁদার ক্ষেত্রে দেশিউড়া ও অভয়পাশা ডিপের শর্ত ছিল একই ধরনের। রামেশ্বরপুর গ্রামের কৃষক নূরুজ্জামানদের জমির পরিমাণ ২০ কাঠা। এর ভেতর ১০ কাঠা জমি ডিপমেশিনের নিয়ন্ত্রণে। ২০০৭ সালের বোরো মওসুমে ডিপের পানি দিয়ে উফশী ধান আবাদের জন্য তিনি অগ্রহায়ণ মাসে বীজতলায় বীজ ফেলেন। ড্রেন করার সময় মালিক নুরুজ্জামানের জমির মধ্য দিয়ে ড্রেন করতে চায় কিন্ত তিনি জমির আইলের পাশ দিয়ে ড্রেন করার জন্য বললে মালিকের সাথে তার মতবিরোধ তৈরি হয়। ডিপের মালিক নূরুজ্জামানের কোন জমিতে পানি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পানি না দেওয়ার কারণে নূরুজ্জামানের পুরো বীজতলা নষ্ট হয়ে যায়। নূুরুজ্জামান বলেন, পানি না পাওয়ার কারণে তার ২০০০-২৫০০ টাকা ক্ষতি হয়েছে ।

 

কেন গ্রামীণ শস্যপঞ্জিকা বদলে যায়?

রহমান ও অন্যান্যরা (২০০৯) মানিকগঞ্জের পুটাইল ইউনিয়নের ফসলচক্রের পরিবর্তনশীলতা বোঝাতে ২০০৯ সনের স্থানীয় এলাকার ফসলবিন্যাসকে ত্রিশ বছর আগের ফসলবিন্যাস দিয়ে মাসভিত্তিক পার্থক্য করে দেখালেও সেখানে পরিবর্তনশীলতার কারণগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না । গ্রামীণ শস্যপঞ্জিকার পরিবর্তনশীলতা একটি গ্রামসমাজের সার্বিক পরিবর্তনশীলতার সাথে উলম্ব ও আনুভূমিকভাবে পরস্পর সম্পর্কিত। কতভাবে যে গ্রামীণ শস্যপঞ্জিকার অদলবদল ও রূপান্তর ঘটে এ পর্যায়ে গবেষিত অঞ্চলের গ্রামীণ অভিজ্ঞতা থেকে আমরা তা বোঝার চেষ্টা করবো। তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের পর গ্রামের শস্যপঞ্জিকায় বেশ বড় ধরনের একটা পরিবর্তন আসে। ১৯৬০ এর পর থেকে দীর্ঘ প্রায় ৪০-৫০ বছরের ভেতর উফশী জাতের ধানগুলো স্থানীয় এলাকায় ইরি ধান নামে পরিচিতি পায় এবং কার্তিক থেকে বৈশাখ পর্যন্ত এই ‘ইরি ধানের’ বোরো মওসুম। কার্তিক মাসে ধানের বীজ ভেজানো হয়, অগ্রহায়ণে জালা ফালানো হয়, ১৫ পৌষের পর থেকে গুছি নেয়া হয় এবং বৈশাখের ১৫ তারিখের ভেতর ধান কাটা শেষ হয়। কৃষিকেন্দ্রিক পরিবর্তনশীলতা গ্রামজীবনে ব্যবহারিক শব্দভান্ডার এবং ভাষাগত ব্যাকরণকেও বদলে দিচ্ছে। ‘আষাঢ়ি রোয়া’, ‘জেরের জমি’ কি ‘পানি ভাঙ্গা ধান’এ শব্দগুলো আর প্রাত্যহিক জীবনে সচরাচর ব্যবহৃত হয় না। আগের দিনে জেরের জমিনে জ্যৈষ্ঠ থেকে ১৫ আষাঢ় পর্যন্ত আষাঢ়ি রোয়া লাগানো হত। আষাঢ় থেকে অগ্রহায়ণ এ সময়কালের আমন মওসুমের ভেতর গভীর পানের ধানই স্থানীয় অঞ্চলে পানিভাঙ্গা ধান নামে পরিচিত ছিল।

রামেশ্বপুর গ্রামের প্রবীণ ও নবীন নারী-পুরুষের সাথে জানা যায়, গ্রামে প্রতিনিয়ত বেশকিছু পরিবর্তন ঘটে চলেছে। পাকিস্তান আমলের আগে গ্রামের পুরুষেরা পাটখড়ি ও ধাতব ক্ষুর দিয়ে দাঁড়ি কামাত। পরবর্তীতে ব্লেডের প্রচলন ঘটে, এখন গ্রামের কাছের অভয়পাশা বাজারে ‘ওয়ান টাইম রেজর’ পর্যন্ত কিনতে পাওয়া যায়। ১৯৮৫ সালের দিক থেকে গ্রামের মানুষ মশার কয়েল ব্যবহার করছে। আগের দিনে কাঠের তৈরি কাহই দিয়ে চুল আঁচড়ালেও এখন প্লাস্টিকের চিরুণীর ব্যবহার বেড়েছে। গ্রামের পুরুষদের অনেকেই ১৯৯০ সালের পর থেকে ‘রাজা’ কনডম ব্যবহার করছেন। হাঁস-মুরগির ডিম পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে ভাজি করে খেলেও প্রায় ৫-৬ বছর যাবত অনেকেই ডিম পোচ করে খাচ্ছেন। নিমের ডাল, আমপাতা ও আউশ ধানের তুষের ছাই দিয়ে দাঁত মাজা হলেও প্রায় ১০-১২ বছর হল গ্রামের অনেকেই প্লাস্টিকের টুথব্রাশ ব্যবহার করছেন। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে এধরণের অসংখ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি গত ১০০ বছরের ভেতর নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিজাত দ্রব্য ও খাদ্যদ্রব্যের ক্রয়মূল্যের বিস্তর বিষম পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯০০ সালের দিনে এক খুচি (প্রায় ১৭০০ গ্রাম) খেসারী কালাই ডালের বাজারদর ছিল ২ পয়সা, কিন্তু ২০১১ সনে স্থানীয় বাজারে এক কেজি খেসারী কালাই ডাল প্রায় ৬৫ টাকা কেজি দরে বিক্রয় হচ্ছে। মেদী, কুমড়ীর মতো মোটা ধানের এক খুচি চালের মূল্য ছিল ১৯০০ সনে ৪ আনা এবং বিরই, বদ্যিরাজ ও ফুলবাইনের মতো চিকন চালের এক খুচির মূল্য ছিল ৬ আনা। কিন্তু ২০১১ সালে স্থানীয় বাজারে এক কেজি চাল ২০-৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।

এই যে গ্রামীণ পরিবর্তনশীলতা তার সাথেই কিন্তু শস্যপঞ্জিকাও তার রূপ পাল্টাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে বা বদলে যেতে বাধ্য হয়েছে। ১৯০০ সনের দিকে রামেশ্বরপুর গ্রামে আনুকচু, ফেনকচু, ওল, শিম, ডাঁটা, মিষ্টিলাউ, দেশিলাউ, কুমড়া, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, পাট, ধুন্দল, কাইক্যাউশি, আলুগোটা, জামআলু, বিন্যাপাতিআলু, গোলআলু, মিষ্টিআলু, শশা, বুট, বাদাম, তিল, তিসি, অড়হড়, কালাই, হলুদ, মরিচ, আদা, ধইন্যা, খেসারী কালাই, মাষকালাই, মুগ, বালিজুরী মরিচ ও সরিষা আবাদ হতো। ১৯৫০ সনের দিকে শস্যফসলের এ বার্ষিক পঞ্জিকায় কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। এসময়ে পুঁইশাক, বাঁধাকপি, মগজই, লালশাক, কলমীশাক, গাজর, ফুলকপি, শালগম ও হল্যান্ডের আলুর আমদানি ঘটে এবং কৃষকেরা তা চাষ করতে অভ্যন্ত হন। ১৯৭৫ সনের দিকে রামেশ্বরপুর গ্রামে পটল আবাদ শুরু হয়। গত দশ বছরে স্বর্ণআলু, হাইব্রিড শাকসব্জির রামেশ্বরপুর গ্রামে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে রামেশ্বরপুর গ্রামে দেশিওল, চুহাই, কাইক্যাউশি ও বালিজুরী মরিচ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে। একসময়ে রামেশ্বরপুরে আউশাডেঙ্গা, বাওয়াডেঙ্গা ও শাইলডেঙ্গার আবাদ হলেও এগুলো বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। আউশাডেঙ্গার সময়কাল চৈত্র থেকে শ্রাবণ, বাওয়াডেঙ্গার সময়কাল চৈত্র থেকে অগ্রহায়ণ এবং শাইলডেঙ্গার সময়কাল পৌষ থেকে বৈশাখ। ২০০০ সালের পর থেকে রামেশ্বরপুর এলাকায় হাইব্রিড শমা, লাউ, কুমড়া, ঝিঙ্গা, পুঁইশাক, পেঁপে, মরিচ চাষাবাদ হচ্ছে। ছোট ছোট কিছু গ্রামীণ অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শস্যপঞ্জিকার রূপান্তরের বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করছি :

ঋতুভিত্তিক শস্যফসলের ক্ষেত্রে গ্রামীণ আচার বিধি বদলে যাচ্ছে

আগে মাইনষে কইতো, তোলা দুধে পুলা বাঁচে না।

আগে আকাশের দিকে চাইয়্যা রইছে,

কখন আকাশ থেইক্যা বৃষ্টি নামবো। এখনের মাইনষের বিদ্যাবুদ্ধি বেশি।

মাটির নিচের তনে জল তুইল্যা চাষ করে।

আমরা জীবনেও হুনছি না যে গাভীরে ভাইটামিন খাওইয়া দুধ বাড়ায়।

গাভীর লেইগ্যা ঘাস আবাদ করে।

এখন তোলা দুধ দিয়াই পুলা বাঁচায়।

গবেষিত অঞ্চলে দেখা গেছে তুলনামূলকভাবে বাঙালি মুসলিম পরিবারের চাইতে বাঙালি হিন্দু কৃষক পরিবারে কৃষিকাজে এখনও বেশি আচার রীতি পালন করা হয়। এক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের তুলনায় প্রবীণেরা, পুরুষেরা তুলনায় নারীরা এগিয়ে। মূলতঃ ১৯৬০ এর পর থেকে তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে রাসায়নিক কৃষির বিস্তার ঘটায় কৃষিকেন্দ্রিক এসব গ্রামীণ আচার রীতির বিলুপ্তি ঘটতে থাকে বলে স্থানীয় ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায়। নটিয়াল ও অন্যান্যরা (২০০৮) ভারতের হিমালয় অঞ্চলের উত্তরাখন্ডের গ্রামীণ কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে কৃষিকেন্দ্রিক গ্রামীণ আচারকৃত্যর গুরুত্ব বিষয়ক এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ঋতুভিত্তিক গ্রামীণ নানান আচার ও অনুষ্ঠান কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে । চলতি গবেষণায় দেখা গেছে, গবেষিত অঞ্চলে চৈত্র মাসে শিমুইর (শিম), ফাল্গুনে মূলা, শ্রাবণে কচু, আষাঢ়ে ওল, জ্যৈষ্ঠে গিমাতিতা শাক, কার্তিকে ওল খায় না অনেকেই। তবে এই বাছবিচার মুসলিম পরিবারের চেয়ে হিন্দু পরিবারগুলোতেই বেশি। যেমন গ্রামের প্রবীণ অনেকেই এখনও মনে করেন বাংলা জ্যৈষ্ঠ মাসে কোনো শস্য ফসল লাগাতে হয় না, কারণ এতে জ্যৈষ্ঠ সন্তানের অমঙ্গল হয়। শ্রাবণ মাসে কলা গাছ লাগানোর নিয়ম নেই। শ্রাবণ মাসে মনসাবর্ত হয় এবং এর সাথে জড়িত বেহুলা-লক্ষিন্দরের কাহিনীতে বেহুলা কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানিয়ে ছিল বলেই শ্রাবণ মাসে কলাগাছ পুতার নিয়ম নেই। বৈশাখ ও আশ্বিনে কলাগাছ লাগানো হয়। শনি ও মঙ্গলবারে সাধারণতঃ কোনো শস্যফসল লাগানোর নিয়ম নেই। ত্রিসন্ধ্যা, সন্ধ্যা, রাত ও ভোর রাতে কোনো কিছু লাগানোর নিয়ম নেই। স্থানীয় মুসলিমরা বুধবারে বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কাটে না, কারণ তারা বুধবারকে মাদারিয়া বার হিসেবে দেখে। মাদার পীরের বারকে মাদারিয়া বার বলে। স্থানীয় হিন্দুদের ভেতর রবি ও বৃহস্পতিবার বাঁশ কাটার নিয়ম নেই। আগের দিনে গ্রামে বৈশাখ মাসে লাউ, কুমড়া, ঝিঙ্গা ও শশা বীজ লাগানো হতো। কিন্তু এখন শশা লাগানোর কোনো নিয়ম নেই, কারণ এখন বারোমাসী হাইব্রিড শশার বীজ বাজারে পাওয়া যায় এবং তাই গ্রামাঞ্চলে বেশি লাগানো হয়। চৈত্র মাসে নিয়ম করে মাছ-আলুর গাছ লাগানো হয় এবং কার্তিক সংক্রান্তিতে মাছ আলু খাওয়া হয়। কার্তিক পূজায় মাছ আলু লাগে। প্রতি বাংলা মাসের অমাবস্যার পরের প্রতিপদে কোনো শাকসব্জি লাগানোর চল নেই বাঙালি হিন্দু কৃষক পরিবারগুলোতে। যদি কেউ ভুলেও এটি করে তবে গ্রামীণ নারীরা একে কুসাইদ বা অমঙ্গল হিসেবে দেখেন। হিন্দু পরিবারগুলোতে অমাবস্যা ও পূর্ণিমাতে তিথিতে কোনো ধরনের শাক খাওয়ার প্রচলন নেই এবং বুধবারে অনেকেই বেগুন খায় না। আষাঢ় মাসের অম্বাবচীর সময় মাটিতে কোনো কোপ দেয়া যায় না, কোনো বীজ বোনা যায় না। মাঘ মাসে অনেকেই মূলা খায় না, চৈত্র মাসে শিমুইর (শিম), শ্রাবণে কচু, কার্তিক মাসে বেগুন-পটল খাওয়া হয় না অনেক হিন্দু পরিবারে। আগের দিনে শ্রাবণ মাসের বারো তারিখ ও এর পর থেকে আমন ধানের গুছি জমিতে লাগানোর চল ছিল, এত নাকি ধানের ফলন ভালো হয়। এ নিয়ে একটি খনার বচনও উল্লেখ করেছেন অনেকেই, শ্রাবণের বারো-ধান রোও যত পারো।

শ্রাবণের বাগ রাবণে খায়

 গবেষিত অঞ্চলের অনেকে বলেছেন, শ্রাবণ মাসে কলা, আম, কাঁঠাল লাগানো হয় না মানে কোনো বাগ-বাগিচা করা হয় না। গ্রামের হিন্দু পরিবার গুলোর প্রচলিত কৃষি-ধারণা হলো শ্রাবণ মাসে রাবণ বাগান করে। শ্রাবণ মাসে বাগ-বাগিচা করলে সেই বাগ-বাগিচা টিকে থাকে না। কিন্তু এ ধারণাটি দিনে দিনে পাল্টে যাচ্ছে, কারণ আষাঢ়-শ্রাবণ মাস মানে বর্ষাকালেই এখন কাঠ ও ফল জাতীয় বৃক্ষের চারা গ্রামেগঞ্জের হাটবাজার ও সরকারি নার্সারীগুলোতে বেশি পাওয়া যায়। তাই মানুষ এ সময়েই এগুলো লাগাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

লক্ষ্মী যাবেন বন্দে : কার সিদ্ধান্তে?

 রামেশ্বরপুরের বাঙালি হিন্দু কৃষক পরিবারের নারীদের ভাষ্য, আগে আমন ধান কাটার সময় অগ্রহায়ণে লক্ষীকে বন্দ থেকে গৃহস্থের ঘরে এনে তোলা হত। শ্রাবণের শেষে লক্ষ্মীকে আবার বন্দে নেয়া হয়, অগ্রহায়ণ পর্যন্ত তিনি বন্দে থাকেন। কিন্তু প্রায় বিশ বছরে এটি বদলে গিয়ে এখন বৈশাখ থেকে জৈষ্ঠ্যের মাঝামাঝি পর্যন্ত বোরো মওসুমের ধান কাটার সময় বন্দ বা ধানজমিন থেকে ধানের দেবী লক্ষীকে গৃহস্থ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।

ধানের অদলবদল

 আগে ১ কাঠাতে আউশ ধান ২মণ হইছে। এখন ইরি ধান ১ কাঠাতে ১০ মণ হয়।

তবু অভাব যায় না। এখন মানুষের শক্তিও কম।

 আটপাড়া উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র মতে, স্থানীয় এলাকায় দেশীয় আমন, আউশ ও বোরো মওসুমের ধান জাতের আবাদের পরিমাণ কমে আসছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র মতে, কাইশ্যাবিন্নী নামে পরিচিত ধান জাতটি ১৯৯৫ সন থেকে নেত্রকোণা এলাকায় রোপা আউশ জাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কৃষি অফিসের সূত্রমতে, জাতটি সুস্বাদু, উৎপাদন ভালো, ফলন ভালো এবং জনপ্রিয়। কেউ কেউ মনে করেন এটি ভারতীয় জাত। নেত্রকোণা জেলায় প্রতিবছর আউশের চাষের এলাকা কমে আসলেও ২০১১ খৃষ্টাব্দের ১৫ মার্চ-৩০ জুনের ভেতর (১৫ ফাল্গুন-১৫ শ্রাবণ) আটপাড়া উপজেলার ১৭০ হেক্টর জমিতে রোপা আউশের আবাদ হয়েছে। ১৭০ হেক্টর জমির ভেতর ১৪৫ হেক্টর জমিতে কাইশ্যাবিন্নী এবং ২৫ হেক্টর জমিতে ব্রিধান-২৬ জাত চাষ করা হয়েছে। আউশ ও স্থানীয় আমন চাষের পরিমাণ কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে উপজেলা কৃষি অফিসের ব্যাখা বোরো মওসুমের উফশী জাতের ফলন বেশি এবং আউশ তোলার পর রোপা আমন চাষ করলে রোপা আমনের ফলন কমে যায় তাই বোরো মওসুমের উফশী জাতই এলাকায় বেশি চায় হয়। আউশ ধান চাষ করলে ১৫ শ্রাবণ পর্যন্ত এ ধান কাটার সময় থাকে, এতে জমিতে রোপা আমন লাগাতে দেরি হয়ে যায়। ফলে রোপা আমনের ফলনের ঘাটতি হয়, কারণ ধান পুষ্ট হতে সময় কম পায়। স্থানীয় এলাকায় ১৯৮০ সন থেকে উফশী ধান আবাদ শুরু হয়েছে আইআর-৮ ধানের মাধ্যমে। ১৯৯০ সনের পর থেকে এলাকায় বিআর-৩ (বিপ্লব) এবং বিআর-১৪ (গাজী) ধানের আবাদ হতো বোরো মওসুমে। ২০১১ সনে সবচে বেশি আবাদ হয়েছে ব্রিধান-২৯। ২০০৩ সাল থেকে এলাকায় হাইব্রিড ধানের আবাদ শুরু হয় এবং প্রথম দিকে কেবলমাত্র হাইব্রিড হীরা ধানই ছিল বোরো মওসুমের সর্বাধিক চাষকৃত ধান। ২০১০ সনে হাইব্রিড-৫০ বা বাংলামতী হাইব্রিড আবাদ শুরু হয়। ২০১১ সনে বোরো মওসুমে হাইব্রিড হীরা ধানের আবাদ বেশি হয়েছে । ২০১১ সনে ব্রিধান-৫১ এবং ব্রিধান-৫২ গভীর পানির ধান হিসেবে উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে কৃষকদের মাঝে কিছুটা দেয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রবীণ পুরুষ কৃষকদের মতে, দিনে দিনে দেশি সুগন্ধী জাতগুলোই সবচে প্রথম বিলুপ্ত হয়েছে। বোরো মওসুমের সুগন্ধি জাত মোগলশাই, লাফা, বাঁশফুল জাতগুলো এলাকা থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে। পিঁপড়ারচোখ, বাদশাভোগ, কালাজিরা, বাউইডর, নুইন্যা, চিনিশাইল ছিল সুগন্ধী আমন জাত। তবে আউশের ভেতর স্থানীয় এলাকায় তেমন কোনো সুগন্ধী জাত ছিল

না। স্থানীয় এলাকার সবচে বড় ধান ছিল বোয়ালিয়া এবং সবচে ছোট কাইল্যাজিরা।

কাইশ্যাবিন্নি : স্থানীয় না বহিরাগত?

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট (১৯৮২) প্রকাশিত দেশী ধানের জাত বইতে ময়মনসিংহ অঞ্চলের কোতোয়ালী, ফুলপুর, গৌরিপুর, সরিষাবাড়ী, গফরগাঁও, ভালুকা, মুক্তাগাছা, ঈশ্বরগঞ্জ, নান্দাইল, হালুয়াঘাট, ফুলবাড়িয়া, ত্রিশাল, নলিতাবাড়ি এলাকার বিভিন্ন মওসুমের দেশী ধান জাতের নাম উল্লিখিত হয়েছে। উক্ত বইতে মুক্তাগাছা অঞ্চলের রোপা আমন মওসুমের ধান হিসেবে কাশিয়াবুনি, হালুয়াঘাটের রোপা আমনের জাত হিসেবে কাশিয়াবিন্নি, ত্রিশালের রোপা আমন জাত হিসেবে কাশিয়াবিন্নির কথা উল্লেখ করা আছে । চলমান লেখাটির সমীক্ষাগ্রাম রামেশ্বরপুর এককালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের অর্ন্তভুক্ত, পাশাপাশি মুক্তাগাছা-হালুয়াঘাট-ত্রিশাল নেত্রকোণার কাছাকাছি অবস্থিত। রামেশ্বরপুর অঞ্চলে আউশ মওসুমের বর্তমানের জনপ্রিয় জাত কাইশ্যাবিন্নি। কিন্তু দেশী ধানের জাত বইতে এ অঞ্চলের রোপা আমনের জাত হিসেবে কাশিয়াবুনি, কাশিয়াবিন্নির নাম অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে ১৯৮২ সালে। দীর্ঘ প্রায় ত্রিশ বছরে রোপা আমন হিসেবে অর্ন্তভুক্ত কাশিয়াবিন্নি জাতটিই কি আজকের রামেশ্বরপুরের আউশ মওসুমের কাইশ্যাবিন্নি ধান? ২০০৫ সালের স্বরমুশিয়া গ্রামে অনুষ্ঠিত একটি গ্রামসভার বিবরণী থেকে জানা যায় তৎকালীন সময়ে স্থানীয় এলাকায় বোরো মওসুমে কেবলমাত্র ব্রিধান-২৯, কাইস্যাবিন্নী ও আইজং ধান চাষ হতো । উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রমতে, কাইশ্যাবিন্নী নামে পরিচিত ধান জাতটি ১৯৯৫ সন থেকে নেত্রকোণা এলাকায় রোপা আউশ জাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কৃষি অফিসের সূত্রমতে, জাতটি সুস্বাদু, উৎপাদন ভাল, ফলন ভালো এবং জনপ্রিয়। কেউ কেউ মনে করেন এটি ভারতীয় জাত।

আবহাওয়াগত বিপর্যয় জলবায়ু অভিজ্ঞতা

আবহাওয়াগত কারণ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে ফসলহানি ঘটলে ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যায় জাতটির উৎপাদন ব্যাহত হলে কৃষকরা জাতটির সামাজিক মূল্যায়ন করে দেখেন যে এটি আর চাষাবাদ করা হবে কি হবে না। জলবায়ুগত কারণেও শস্যপঞ্জিকার কিছু অদলবদল ঘটছে। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, চলতি সময়ের চেয়ে আগের দিনে গরমের প্রাবল্য বেশি ছিল। আগে গরম ছিল চৈত্র-বৈশাখ মাসে। এটি বৈশাইখ্যা-জৈষ্ঠ্যা গরম নামে পরিচিত ছিল। গরমের জ্বালায় মানুষ পানিতে পড়ে থাকতো। এখন গরমের প্রাবল্য কম এবং এটি বারো মাসের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামীণ জনগণের ভাষ্য, চলতি সময়ে ঠাডা বা বজ্রপাতের পরিমাণ কমেছে। যেসব জমিতে বজ্রপাত হয় সেসব জমিতে পরের ৩/৪ বছর আর কিছু হয় না। ১৩৬২ বাংলার আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে স্থানীয় এলাকায় সবচে বড় বন্যা হয়। এরপর আর এতবড় বন্যা এ এলাকায় হয়নি। এরপর স্থানীয় এলাকায় আর কখনোই এতবড় বন্যা হয়নি। রামেশ্বরপুর গ্রামের কৃষকদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায় কুয়াশার প্রকোপে স্থানীয় শস্য ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ডাঁটা, মরিচ ও ফুলকপি অনিয়মিত কুয়াশার জন্য নষ্ট হচ্ছে। এমনকি পৌষ মাসেও অকাল বৃষ্টি হচ্ছে, যার ফলে রবি শস্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনাটি স্থানীয়রা বলেন, পৌষের গাদলার জন্য রবিশস্য ‘টুন্ডা’ হয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সনে বোরো মওসুমে উফশী ধানের অনেক জাতও অধিক কুয়াশায় নষ্ট হয়ে যায়। অনিয়মিত বৃষ্টি ও খরার কারণেও অনেক শস্য আবাদ উঠে যাচ্ছে। ২০০৭-২০০৮ পর্যন্ত বর্ষা মওসুমে বৃষ্টির পরিমাণ মোটামুটি ছিল। কিন্তু ২০০৯ সনে চৈত্র-আষাঢ় পর্যন্ত কোনো বৃষ্টি ছিল না। আবার ২০১০ সনে কিছুটা বৃষ্টি হয়েছে। অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে খেসারীকালাই, আউশ ধান, মাষকালাই ও পাটের চাষ প্রায় উঠেই গেছে। আউশ ও পাটের ধারাবাহিক চাষের পরিবর্তে অধিকাংশ কৃষকের বোরো মওসুমে উফশী ধানে স্থানান্তরকে ব্যাখা করে স্থানীয় কৃষকেরা বলেন, আগে চৈত্র-বৈশাখ মাসে মেঘ-বৃষ্টি হতো। ফলে আউশ ও পাট বৃষ্টির পানির উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এখন নিয়মিত বৃষ্টির কারণে কৃষকদেরকে কৃত্রিম সেচ ব্যবহার করে বাণিজ্যিক কারণে উফশী ধান আবাদ করতে হচ্ছে।

শেষ অংশ সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

http://z.barciknews.com/?p=236

happy wheels 2
%d bloggers like this: