সাম্প্রতিক পোস্ট

মাতৃভাষায় আমরা কতটা দক্ষ?

মাতৃভাষায় আমরা কতটা দক্ষ?

সিলভানুস লামিন

এক
মাতৃভাষায় আমরা কতটা দক্ষ? অনেকের কাছেই হয়তো প্রশ্নটি অবান্তর! তারা হয়তো বলবেন জন্মের পর থেকেই তো আমরা এ ভাষা চর্চা করে এসেছি এবং এখনও চর্চা করি। জন্মের পর থেকেই যে ভাষাটা আমরা চর্চা করি সেই ভাষায় তো আমরা বেশি দক্ষ হবোই। যুক্তিটা কিন্তু ফেলে দেওয়ার মতো নয়। আসলেই তো, জন্মের পর থেকেই আমরা আমাদের মাতৃভাষার চর্চা করে আসছি এবং এখনও সেই ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করি। কথা বলা শেখার পর থেকেই আমরা আমাদের মায়ের ভাষায় কথা বলি। আমাদের চেয়ে এই ভাষায় আর কেউ বেশি দক্ষ হতে পারে না! বলা হয়, মাতৃভাষায় মানুষ যেভাবে তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে অন্য আরও কোন ভাষাতেই সেভাবে তা করতে পারে না। আমাদের জন্য মাতৃভাষাটি তাই একটি আর্শীবাদ, একটি গৌরব এবং একটি সম্পদস্বরূপ। মাতৃভাষায় আমরা সহজে শিখতে পারি, পড়তে পারি এবং প্রকাশ করতে পারি। অন্যদিকে মাতৃভাষা হচ্ছে আমাদের আত্মপরিচয়ের সূচক! মাতৃভাষা আমাদের অস্তিত্বের সাথেও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। মাতৃভাষায় আমরা মনের ভেতরের অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবটিও প্রকাশ করতে পারি, যোগাযোগ করতে পারি। আমাদের চিন্তা, ধ্যান, আশা-আকাঙ্খা এবং স্বপ্নের ভালো বহিঃপ্রকাশ হয় মাতৃভাষায়। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা ও সম্মানকে সমুন্নত করে রাখার জন্য ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার জীবন বির্সজন দিয়ে এই ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্বের আর কোন দেশ মাতৃভাষার জন্য জীবন বির্সজন দেওয়ার কোন নজির নেই। ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাকে সম্মান জানিয়ে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

আমরা কী আসলেই আমাদের স্ব স্ব মাতৃভাষায় খুবই দক্ষ? তাহলে আসুন আমরা আত্মমূল্যায়ন করি। দেখি, আমরা বাংলায় কতটা দক্ষ? এ দক্ষতা কিন্তু শুধু বলাতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলা ভাষায় দক্ষতা বলতে আমরা বাংলায় কতটা ভালো লিখি, আমাদের বাক্য গঠন কতটা নির্ভুল, আমাদের শব্দভাণ্ডার কতটা সমৃদ্ধ, আমাদের উচ্চারণ কতটা স্পষ্ট এবং বাংলা বানানে আমরা কতটা সচেতন ও নির্ভুল সেটাকেও নির্দেশ করে। এসব মানদণ্ডে যদি আমরা বিচার করি তাহলে দেখতে পাবো যে, আমরা অনেকেই বাংলায় খুব বেশি দক্ষ নই বরং বেশির ভাগক্ষেত্রেই আমরা ‘দুর্বল’ শ্রেণীতে পড়ি। একটি পরিপূর্ণ ও অর্থপূর্ণ বাংলা বাক্য তখনই সম্পন্ন হয় যখন সেই বাক্যটি ব্যাকরণবিধি অনুসরণ করে লেখা হয় এবং বানান নির্ভুল থাকে! আমাদের বাক্যগঠন হয়তো সুন্দর ও অর্থপূর্ণ কিন্তু সেই বাক্যে যদি বানানটি নির্ভুল না থাকে তাহলে সেটি পুরোপুরি সঠিক ও নির্ভুল বাক্য হতে পারে না। আমরা প্রায়ই দেখি বিভিন্ন সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, পোস্টার, বিজ্ঞাপন এবং এমনকি টেলিভিশনের স্ক্রলে লেখা বাক্যগুলো নির্ভুলভাবে লেখা হয় না। বাক্যগঠন ঠিক থাকলেও (বানান ভুল হলে বাক্যগঠন ঠিক হওয়ার নয়) বানানে আমরা যে কত দুর্বল সেটা প্রকাশ পায়। আমরা প্রায়ই ‘ন’ ও ‘ণ’ এর পার্থক্য বুঝিনা। আমরা তাই অনেক সময় ভুল বাক্য লিখি; যেমন: ‘কৃষক একবিঘায় জমিতে ১৫ ‘মন’ ধান উৎপাদন করেন’ লিখি। এখানে ‘মন’ হবে না; ‘মণ’ হবে। অন্যদিকে ‘ষ’, ‘স’ ও ‘শ’ মধ্যকার পার্থক্যও বুঝি না। এরকম আরও উদাহরণ রয়েছে। আমি ব্যাকরণবিদ নই। তাই এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা আমরা জন্য ঠিক হবে না। আমি আসলে যেটা বলতে চাই সেটা হল: ‘আমরা একটু সচেতন হলে এবং আমরা ইচ্ছে করলেই ছোট্ট ছোটু ভুলগুলো আমরা নিজেরাই ঠিক করতে পারি। এজন্য ব্যাকরণবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। মনে রাখি, আমি যদি আমার মাতৃভাষায় দক্ষ না হই তাহলে কোনভাবেই অন্যভাষায় দক্ষ হতে পারবো না। অনেকে ইংরেজিসহ অন্য ভাষা শেখার জন্য নানান চেষ্টা করেন। আমি বলবো, আগে আপনার নিজের ভাষায় দক্ষতা অর্জন করুন। আপনি আপনার মাতৃভাষায় যদি দক্ষতা অর্জন করতে পারেন তাহলে অন্যভাষাতে দক্ষতা অর্জন করতে আপনার বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। কারণ আমাদের স্ব স্ব মাতৃভাষা (বাঙালি ও আদিবাসীসহ) হচ্ছে আমাদের সবার শিক্ষাপ্রক্রিয়ার ভিত্তি। ভিত্তি দূর্বল হলে শিক্ষা অর্জনও ব্যাহত হয়।

বাংলাদেশে যারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন বিশেষ করে বাঙালি জাতি, তারা কত ভাগ্যবান। তাদের নিজেদের অক্ষর আছে, ব্যাকরণ আছে, লিখিত সাহিত্য আছে। দেশের ক্ষুদ্রজাতিসত্তা বা আদিবাসীদের দিকে তাকাই, তাদের অনেকের তো নিজস্ব অক্ষরই নেই। ব্যাকরণ বা সাহিত্য তো দূরের কথা! তাঁরা রোমান কিংবা বাংল অক্ষর ব্যবহার করেন নিজের ভাষার লিখিত রূপ দেওয়ার জন্য। অনেকের ভাষা তো শুধু মৌখিক রূপই বিদ্যমান রয়েছে! একটি পরিসংখ্যান মতে, বিশ্বের ৬ হাজার অধিক ভাষার মধ্যে প্রায় ৫০% বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বলা হয়, প্রতি ১৪ দিনে এক একটি ভাষা বিলুপ্ত হয়। একটি ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার অর্থ হচ্ছে সেই ভাষার সাথে সংশ্লিষ্ট ঐতিহ্য, ইতিহাস, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, পরিবেশ, উত্তরাধিকার এবং সংস্কৃতিও বিলুপ্ত হয়। তাই তো দেখা গেছে, বাংলাদেশে ডালু, পাত্র, মাহালিসহ আরও অনেক আদিবাসী ভাষা আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষাই আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বলা হয়, একটি ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার সাথে সাথে আমরা একটি ছবি বা চিত্র হারাই, যেটাকে নিয়ে আমাদের মস্তিস্ক হয়তো চিন্তা করার উপলক্ষ পেতো! কারণ ভাষা নিয়ে গবেষণা করা হলে মানবজাতি কীভাবে জ্ঞার্নাজন এবং যোগাযোগ করে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রকৃতির সাথে তাদের সম্পর্ক, সম্পদব্যবস্থাপনা, ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা জানা যায়। অন্যদিকে বিশ্বের অনেক ভাষার মৌখিক গান, সাহিত্য, রূপকথা, প্রবাদবাক্য রয়েছে যেগুলোর লিখিত কোন রূপ নেই। ওইসব ভাষা বিলুপ্ত হওয়া মানে এসব সাহিত্য ও সঙ্গীতের চিরতরে বিলীন হওয়া। তাই আমাদের দেশের সব ভাষাকে রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ প্রতিটি ভাষার ভেতরে লুকিয়ে আছে না জানা কত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা সাহিত্য ও রূপকথা!

তাই আসুন শুধু ফেব্রুয়ারি মাসই নয়; বছরব্যাপী নিজের মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষা ও সংরক্ষণের দিকে মনোযোগী হই। এ ভাষার চর্চা সর্বস্তরেই নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখি নিজে সঠিক চর্চার মধ্য দিয়ে। এ ভাষাকে বিকৃত থেকে বিরত থাকি। বাংলা ভাষা চর্চা তথা, বলা, লেখা, উচ্চারণ ও বানানে পারদর্শী হই। একইভাবে আসুন আমরা অন্য ভাষার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল হই। ওইসব ভাষার চর্চা, সংরক্ষণ ও রক্ষায় ভূমিকা রাখি। এতে করে আমাদের ভাষাশহীদের আত্মত্যাগ স্বার্থক হবে বলে আমি মনে করি।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: