সাম্প্রতিক পোস্ট

বাড়ি বাড়ি উন্নত চুলা বানিয়ে দেন নায়েমা বেগম

রাজশাহী থেকে অনিতা বর্মণ

আমাদের গ্রাম-গঞ্জের নারীরা নিজের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে লোকায়ত জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে জলবাযু পরিবর্তন মোকাবেলায় পরিবেশবান্ধব কিছু কাজ করে আসছেন। তেমনই একটি কাজ হচ্ছে মাটি দিয়ে নানা নকশার ও বিভিন্ন নামের চুলা তৈরি করা। চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের উপাদান বিলুপ্ত বা ধ্বংস হয়ে যারা কারণে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষেরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশের সর্বত্র জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আমাদের দেশের গ্রাম বাংলার মানুষেরা কাঠ, খড়, নাড়া, গোবরের তৈরি ঘুটা, লতাপাতা ও ঘাস জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু বর্তমানে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে এ সব জ্বালানির উপকরণ কমে যাচ্ছে। এজন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী স্বল্প পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহারে দিকে মনোযাগী হচ্ছেন। এক্ষেত্রে উন্নত চুলার প্রয়োজন হয় যে চুলায় জ্বালানি কম লাগে। তবে সবাই এ উন্নত চুলা তৈরি করতে পারেন না। তাই উন্নত চুলা ব্যবহার করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না বিধায় জ্বালানি সাশ্রয় করতে সমস্যা হয়।
chula
এই সংকট মোকাবেলায় চাঁপাইব্বাবগঞ্জ জেলার নাচোল থানার নেজামপুর ইউনিয়নে অবস্থিত পুকুরিয়া পাড়া মোজার আওয়াল পাড়া গ্রামের নায়েমা বেগম (৩৬) এগিয়ে আসেন। তিনি বন্ধু চুলার একজন অভিজ্ঞ কারিগর। বিগত দু’বছর যাবৎ তিনি এ চুলা তৈরি করে চলেছেন। পরিবেশবান্ধব বন্ধু চুলা একদিকে যেমন কম জ্বালানি লাগে, তেমনি অল্প সময়ে রান্না করা যায় এবং ধোঁয়া হয় না বললেই চলে। ফলে ঘরের মধ্যে কোন কালি পড়ে না। পরিবেশবান্ধব এ চুলা বানাতে খরচ কম। একটি সিমেন্টের পাইপ (৩ ইঞ্চি ব্যাস ও ৬/৭ ফুট লম্বা), লোহার শিক/রড এক ফুট আকারের ৫/৭টি এবং ৬/৮ ঝুড়ি নরম মাটি সব মিলে ৩/৪ শত টাকা লাগে বন্ধু চুলা তৈরি করতে।

এই চুলাকে তিনি জ্বালানি সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব বন্ধু চুলা হিসেবে উলেখ্য করে বলেন, “আমি অনেক সাধনার পর পরিবেশ উপযোগি এ চুলা তৈরি করতে পেরেছি। আমি প্রশিক্ষক নোবাহারের কাছ থেকে একটি প্রশিক্ষণে উন্নত চুলা তৈরির কৌশল শিখি। সেই প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর আমি নিজে নিজ বাড়িতে এই চুলা তৈরি করে ব্যবহার করতে লাগলাম।” তিনি আরও বলেন, “এ চুলায় সব ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা যায়। তাছাড়া ঘরের মধ্যে এক ফোঁটা ধোঁয়া হয় না এবং হাড়ি কড়াতে কালি কম হয়। এই চুলা সকলের ঘরে ঘরে পৌঁছানোর জন্য আমি এই গ্রামের প্রত্যেকের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই চুলার গুনাগুন সর্ম্পকে জানিয়েছি। আমার এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।”
chuila-1
নায়েমা বেগম বলেন, “পার্শ্ববতী গ্রাম বরেন্দা, ডাকাতপুকুর, পুকুরিয়া পাড়া, ফুলকুড়ি গ্রামের নারীদের এই চুলা তৈরিতে সহযোগিতা করেছি। তাছাড়া নাচোল উপজেলা নাচোল মাস্টারপাড়া, কসবা ইউনিয়নে খড়িবোনা গ্রামের প্রশিক্ষণ এর জন্য ৪ জন নারীকে এই চুলা তৈরির কৌশল শিখিয়েছি। রাজশাহী ও গোদাগাড়ি গিয়েও চুলা তৈরিতে সহযোগিতা করেছি। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০/৭০ টি চুলা তৈরি করেছি।” শুধুমাত্র এ চুলা নিজের বাড়িতে তৈরি করে বসে থাকেনি নায়েমা বেগম বরং নিজ গ্রামের প্রায় ২৪টি বাড়িতে নিজের হাতে চুলা বানিয়ে দিয়েছেন। জ্বালানি সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব বন্ধু চুলা তৈরির জ্ঞানকে আরো প্রসারিত করতে চান তিনি।

নায়েমা বেগমের সংসার মোটামোটি স্বচ্ছল। নিজস্ব জায়গা বলতে বসতভিটার ৪ শতাংশ খাস জমি। আবাদি জমি বলতে তেমন কোন জায়গা নেই। ১০ বিঘা জমি বর্গা চাষ করেন।

happy wheels 2
%d bloggers like this: