Posted in

ছুটির দিনে সাদা শাপলার খোঁজে চলনবিলের দুঃসাহসী সাত কিশোর

চাটমোহর, পাবনা থেকে ইকবাল কবীর রনজু

গত ১০ আগস্ট শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় সকাল সকাল সাংবাদিক শুভাশীষ ভট্রাচার্য তুষারকে সাথে নিয়ে খবর সংগ্রহ ও ছবি তুলতে বেড়িয়ে পড়ি বাংলাদেশের বৃহত বিল চলনবিল এলাকায়। প্রখর রৌদ্র তাপ উপেক্ষা করে শ্রাবণ দুপুরে কয়েক ঘন্টা ছুটাছুটির পর একটু জিরিয়ে নিতে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মান্নাননগরের উত্তর পাশে বিলের মধ্যকার রাস্তা পার্শ্ববর্তী বাশের চড়াটে কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম নেবার সময় একটি ডিঙি নৌকায় চলনবিলের কয়েকজন কিশোরকে দূর থেকে আসতে দেখি। সড়কের ব্রীজের নিচ দিয়ে পার হয়ে ওরা যখন পশ্চিম দিকে যাচ্ছিল তখন খবর যেন আপনা আপনি ধরা দিল। নৌকা বোঝাই আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা। কিশোর ছেলেদের ডাকতেই ওরা ডিঙি নৌকার গতি পথ ঘুড়িয়ে বৈঠা মারতে মারতে নগ্ন গায়ে চলে আসে আমাদের কাছে। রাস্তার পাশে ভিড়িয়ে দেয় ডিঙি নৌকা।

shapla pic-1ওদের সাথে আলাপচারিতায় জানতে পারি সবার বাড়ি মাগুড়া বিনোদ ইউনিয়নের শামপুর ও হামকুড়িয়া গ্রামে। শুক্রবার ছুটির দিনে স্কুল বন্ধ থাকায় মজা করার জন্য মনসুর দের ডিঙি নৌকা নিয়ে বেড়িয়ে পরেছিল সাদা শাপলার খোঁজে। আমবাড়িয়া গ্রামের পূর্ব পাশের পোমরুল বিল থেকে শাপলা তুলে ফিরছিল ওরা। শাপলা ও সাত কিশোরের ভরে ছোট ডিঙি নৌকা মাঝে মধ্যেই উল্টে যাবার উপক্রম হলে ৮ থেকে ১২ বছরের কিশোরদের কেউ কেউ পানিতে পড়ে যাচ্ছিল। চলনবিলের ছেলে বলে কথা। ফের তারা নৌকায় উঠে বর্ণনা করছিল নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা। শাপলার মালা গেথে, শাপলা ফুলের কান্ড খেয়ে শাপলার সৌন্দর্যের কথা, বহুবিধ ব্যবহারের কথা, শাপলার কন্দ শালুক, গর্ভাশয়ের ঢ্যাপের খৈ, মোয়া খাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করছিল তারা। দেখতে দেখতে বেলা বয়ে যায়। ক্ষুধার্ত থাকায় সাত কিশোর চলে যাওয়ার অনুমতি চায়। কথার মাঝেই হরেক রকম ছবি তুলতে ভূল করি না আমরা।

জলজ উদ্ভিদ সাদা শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। প্রাচীন কাল থেকে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৩৫ প্রজাতির মতান্তরে প্রায় ৮০ প্রজাতির শাপলা ধান ক্ষেত, জলাশয়, পুকুর ও হ্রদে ছড়িয়ে পরে। পুকুরের সৌন্দর্য বাড়াতে অনেকে পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির শাপলার চাষ করে থাকেন।Plantae জগতের উদ্ভিদ শাপলাকে ইংরেজীতে বলা হয় Water Lily. এটি Nymphaeaceae পরিবার ভূক্ত।

শাপলার পাতা এবং ফুলের ডাটি পানির নিচের মাটিতে থাকা কন্দ মূলের সাথে যুক্ত থাকে। পাতা পানিতে ভাসমান অবস্থায় থাকে। শাপলার গোলাকার সবুজ পাতার নিচের দিকটা কালচে রঙের হয়। জলে ফুটে থাকা সাদা, নীল, বেগুনী, গোলাপী শাপলা ফুল সহজেই নজড় কারে সকলের। প্রায় সারা বছর এ ফুল ফুটলেও আষাঢ় থেকে আশি^ন মাস পর্যন্ত এ ফুল ফোঁটার বেশি উপযুক্ত সময়।

shapla pic-2বাংলাদেশে টাকা-পয়সা ও দলিল-পত্রে শাপলা ফুলের জলছাপ দেখতে পাওয়া যায়। শ্রীলংকায় নীল মহানেল নামে পরিচিত শাপলা সে দেশেটিরও জাতীয় ফুল। বাংলা, সংস্কৃত, পালিসহ বিভিন্ন ভাষায় রচিত বই পুস্তকে শাপলার শ্রেষ্ঠতা ও পবিত্রতার উল্লেখ পাওয়া যায়। শ্রীলংকার বৌদ্ধদের দৃঢ় বিশ্বাস গৌতম বুদ্ধের পায়ের ছাপে শাপলা ফুলের চিহ্ন পাওয়া যায়। তাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এ ফুল পবিত্রতার প্রতীক বলে বিবেচিত হয়। আবার হিন্দুদের সর্পদেবী মনসা পূজায় শাপলা ফুল দেবার রেওয়াজ পরিলক্ষিত হয়। ইতিহাস ও পুরাণ মতে জলজ উদ্ভিদ শাপলা প্রায় ৩০০ খৃষ্ট পূর্ব কালের পুরোনো। গ্রীক দার্শনিক থিউফ্রাস্টাস এর মতে, প্রাচীন গ্রীসে জল দেবীদের সন্তুষ্টি লাভের জন্য গ্রীকরা শাপলা ফুল উৎসর্গ করতেন। মিশরীয়রাও নীল ও হলুদ শাপলা ফুলের প্রতি অনুরাগী ছিলেন।

shapla pic-6বাগানের জলাধার, লেক বা অ্যাকোয়ারিয়াম সাজানোর পাশাপাশি বহুমুখী খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয় শাপলার কান্ড বীজ ও কন্দ। বাংলাদেশ ভারত মিশর চীন জাপানসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে শাপলার কান্ড ও শালুক নামক কন্দ সবজী হিসেবে খাওয়া হয়। শাপলার গোলাকার গর্ভাশয়ের ছোট ছোট লাল কালো আঠালো বীজ গ্রাম এলাকার মানুষেরা খেয়ে থাকে। অনেকে এই বীজ শুকিয়ে ভেজে খৈ তৈরী করে যা ঢ্যাপের খৈ নামে পরিচিত। অপরিপাকজনিত রোগের আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরীতেও শাপলার ব্যবহার হয়ে থাকে। শাপলায় ডায়াবেটিক রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় ওষুধী গুনাগুন ও রয়েছে। গবাদী পশুর খাদ্য হিসেবে শাপলার কান্ড ও পাতার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।

কেবল হিন্দু বৌদ্ধ নয়; গ্রীক বা মিশরীয় নয়, প্রাচীন বা মধ্য যুগ নয় আধুনিক কালেও নিজ সৈন্দর্য গুনে ধর্ম জাত কালের উর্ধ্বে সকলের মনে স্থায়ী আসন গড়েছে আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.