Posted in

আয়রন ও ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণে শাপলা

বাহলুল করিম, সাতক্ষীরা থেকে

বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা। একে প্রাকৃতিক পুষ্টির আঁধার বলা হয়ে থাকে। এটি কেউবা খায় সবজি হিসেবে রান্না করে আবার কেউবা এর ফল থেকে তৈরি করে খৈ। মায়ের বুকের দুধ বাড়াতে, ডায়াবেটিস সমস্যায়, চোখ পরিষ্কার রাখতে, ঋতুস্রাব সমস্যায়, চর্ম ও রক্ত আমাশয়ে, অ্যালার্জি সমস্যায় ও ডায়রিয়া সমস্যায় শাপলা ওষুধের মতো কাজ করে। এছাড়া আয়রন ও ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণে শাপলায় রয়েছে কার্যকরী গুণাগুণ। গ্রামাঞ্চলে শিশুরা এটি দিয়ে মালা তৈরি করে খেলা করে। আবার এটি গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

খালে-বিলে ও বদ্ধ জলাশয়ে শাপলা দেখতে পাওয়া যায়। এটি সাধারণত এক ধরণের জলজ উদ্ভিদ। সাধারণত বাংলাদেশে দুই ধরণের শাপলা দেখতে পাওয়া যায়। একটি লাল অন্যটি সাদা। তবে সাদা শাপলা বেশি পরিমাণে দেখতে পাওয়া যায়। শাপলার মূল পানির নিচে মাটিতে শেকড় বিস্তার করে বিকশিত হয়। সরু নলের মতো কাণ্ড নরম প্রকৃতির ও বেশ লম্বা হয়ে থাকে। কাণ্ডের ভিতর কয়েকটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত। কাণ্ডের ভিতরটা স্পঞ্জের মতো।

শাপলার পাতা অনেকটা লাভ আকৃতির হয়। পাতা পানির উপরে ভেসে থাকতে দেখা যায়। পাতার অগ্রভাগ দেখতে অনেকটা করাতের সুচালো অংশের মতো। পাতার উপরিভাগ গাঢ় সবুজ ও নিচের অংশ কালো বা খয়েরি রঙের হয়।

Shapla Flower 1

শাপলা ফুল লম্বা ডাটায় পানির উপরে ভেসে থাকে। এর ফুল দেখতে অনেকটা তারার মতো। সাদা শাপলা ফুলের পাঁপড়ি সাদা ও লাল শাপলার পাঁপড়ি লাল রঙের হয়ে থাকে। এর ফুলের পাঁপড়িগুলো একসাথে যুক্ত অবস্থায় থাকে। ফুলের মাঝখানে অসংখ্য হলুদ রঙের পুংকেশর থাকে। এর ফুল প্রথমে একটি আবরণে ঢাকা থাকে। ফুল ফুটলে পাঁপড়িগুলো মেলে যায়।

শাপলার ফুল থেকে ফল হয়। যা ঢ্যাপ নামে পরিচিত। ফল দেখতে মারবেল আকৃতির। ফলের ভিতর অসংখ্য গুড়ি গুড়ি বীজ থাকে। বীজ কালো বা হলুদ রঙের হয়ে থাকে। এই বীজ থেকে খৈ তৈরি করা যায়।

সাতক্ষীরা অঞ্চলে প্রায় সব জায়গাতেই কম-বেশি শাপলা ফুল দেখতে পাওয়া যায়। এর স্থানীয় নাম শাপলা। এটি আবার Water Lily, White Water Lily, White Lotus নামেও পরিচিত। এই অঞ্চলের মানুষ শাপলার ডাটা সবজি হিসেবে রান্না করে খায়। শিশুরা আবার এই ফুল দিয়ে মালা গাঁথে।

সাতক্ষীরা অঞ্চলের মানুষ এর ফলকে ঢ্যাপ নামে চেনে। শিশুরা অধিকাংশ সময় এই ঢ্যাপ বা ফল ফাঁটিয়ে এর গুড়ি গুড়ি বীজ খেয়ে থাকে। বীজ খেয়ে শিশুরা খুব মজা পায়। বীজ থেকে অনেকে আবার খৈ তৈরি করে থাকে। খৈ খেতে খুব সুস্বাদু ও প্রচুর পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। এছাড়া শাপলায় রয়েছে নানাবিধ ওষুধি গুণাগুণ। যা আমাদের নানাবিধ রোগ ব্যধি থেকে মুক্ত রাখে।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা শহরের পুষ্টির ফেরিওয়ালা রুহুল কুদ্দুস বলেন, “শাপলা এক ধরণের জলজ উদ্ভিদ। এটি আমাদের অঞ্চলে প্রায় সারাবছর দেখা যায়। শাপলাকে নানাবিধ পুষ্টির আঁধার বলা হয়। শাপলায় রয়েছে নানা রোগের ওষুধ। শাপলা একটি ঠা-া তরকারি। এটি লিভার ও পিত্ত ঠাণ্ডা রাখে। এছাড়া এতে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রণ ও ক্যালসিয়াম আছে। যা আমাদের শরীরে আয়রন ও ক্যালসিয়ামের অভাব অনেকটা পূরণ করে থাকে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে অনেকে এটি গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে। ”
শাপলার ওষুধি গুণাগুণ সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, “শাপলা মায়ের বুকের দুধ বাড়াতে সহায়তা করে থাকে। শাপলার ডাটার ভিতর যে পানি থাকে তা জালিয়ে চোখে দিলে চোখ পরিষ্কার হয়। লাল শাপলা খুব উপকারী। লাল শাপলার চারটি অথবা পাঁচটি ফুল বেঁটে খেলে ঋতুস্রাব পরিষ্কার হয়।”

বিশ্ব মুক্তকোষ উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, ‘শাপলার বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea Nauchalli। এর ইংরেজি নাম Nymphaeaceae। পুষ্প বৃক্ষ পরিবারের এক প্রকার জলজ উদ্ভিদ। এ পরিবারভুক্ত সকল উদ্ভিদই শাপলা নামে পরিচিত। বিশ্বে এই উদ্ভিদের প্রায় ৩৫টি প্রজাতি পাওয়া গেছে।

Shapla Flower 2

শাপলা ফুল দিনের বেলা ফোটে এবং সরাসরি কাণ্ড ও মূলের সাথে যুক্ত থাকে। শাপলার পাতা আর ফুলের কাণ্ড বা ডাটি বা পুস্পদণ্ড পানির নিচে মূলের সাথে যুক্ত থাকে। আর এই মূল যুক্ত থাকে মাটির সঙ্গে এবং পাতা পানির উপর ভেসে থাকে। মূল থেকেই নতুন পাতার জন্ম নেয়। পাতাগুলো গোল এবং সবুজ রঙের হয় কিন্তু নীচের দিকে কালো রঙ। ভাসমান পাতাগুলোর চারদিক ধারালো হয়।

পাতার সাইজ ২০ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার এবং এদের ব্যাপ্তি প্রায় ০.৯ থেকে ১.৮ মি। শাপলা ফুল নানা রঙের দেখা যায় যেমন: গোলাপী, সাদা, নীল, বেগুনি ইত্যাদি। এই ফুলে ৪ থেকে ৫ টি বৃতি থাকে ও ১৩ থেকে ১৫টি পাঁপড়ি থাকে। ফুলগুলো দেখতে তারার মত মনে হয়। কাপের সমান বৃতিগুলো ১১-১৪ সেমি হয়ে থাকে। প্রায় বছরের সব সময় শাপলা ফুটতে দেখা যায় তবে বর্ষা ও শরৎ এই উদ্ভিদ জন্মানোর শ্রেষ্ঠ সময়।

পূর্ণবিকশিত শাপলা ফুলের গর্ভাশয়ে গুড়ি গুড়ি বীজ থাকে। আঠালো এই বীজ বাংলাদেশের গ্রামের মানুষদের খেতে দেখা যায়। এই বীজ ভেজে একধরনের খাবার খৈ তৈরি হয় যার নাম ঢ্যাপের খৈ। উদ্ভিদটির গোড়ায় থাকে আলুর মত এক ধরনের কন্দ যার নাম শালুক, অনেকে এটি সবজি হিসেবে খেয়ে থাকে।

ভারতে আম্বাল নামের আয়ুর্বেদিক ওষুধ বানাতে শাপলাকে ওষুধি গাছ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ওষুধ অপরিপাকজনিত রোগের পথ্য হিসেবে কাজ করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া গেছে এই উদ্ভিদে ডায়াবেটিক রোগের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধি গুণাগুন রয়েছে। এই উদ্ভিদ পানি থেকে তুলে রোদে শুঁকিয়ে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।’

শাপলা খুব পুষ্টি সমৃদ্ধ সবজি। সাধারণত শাকসবজির চেয়ে এর পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। শাপলার রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম। শাপলায় ক্যালসিয়ামের পরিমাণ আলুর চেয়ে সাত গুণ বেশি। শাপলা চর্ম ও রক্ত আমাশয়ের জন্য বেশ উপকারী। লাল শাপলা অ্যালার্জি ও রক্ত আমাশয়ের জন্য বেশ উপকারী। শাপলা প্রধানত অ্যাসিডিটি, অ্যানেসথেসিক, সেরোটিক, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগে ব্যবহৃত হয়।’

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.