সাম্প্রতিক পোস্ট

হোমিও ডাক্তার আজিজুল হকের পাখির প্রতি ভালোবাসা

হোমিও ডাক্তার আজিজুল হকের পাখির প্রতি ভালোবাসা

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখির গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষিসহ সকল ক্ষেত্রে রাসায়নিক দ্রব্যের অত্যধিক ব্যবহারের ফলে বিষাক্ত খাদ্য খেয়ে পাখির প্রজাতিগুলো দিনদিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশ তার ভারসাম্য হারাচ্ছে, সঠিক পরাগায়ন না হওয়ায় ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। প্রাকৃতিক বন ধ্বংসের ফলে উঁচু গাছ ও শতবর্ষী গাছ কমে যাওয়ার ফলে পাখি হারাচ্ছে তাদের নিরাপদ আবাসস্থল। আগ্রাসি প্রজাতির গাছের চাষ বৃদ্ধি এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে অতিথি পাখিও আগের মতো আর তেমন আসছে না। তবে যে পরিমাণে এখনও অতিথি পাখি এদেশে আসছে সেগুলোর জন্য নিরাপদ খাবার, নিরাপদ আবাসস্থল ও নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করে সেগুলোকে বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করা সম্ভব। প্রয়োজন ব্যক্তি, সংগঠন ও সরকারিভাবে এসব স্থানীয় জাতের পাখি ও অতিথি পাখির জন্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ।

bIrd
নেত্রকোনা জেলার বলাইশিমুল ইউনিয়নের রেইনট্রিতলা গ্রামের এমনই একজন পাখি বন্ধু ডাক্তার আজিজুল হক (৬৫)। স্থানীয় প্রজাতির ও অতিথি পাখি রক্ষায় ডা. আজিজুল হকের গৃহীত উদ্যোগ সত্যি প্রশংসনীয়। তিনি পাখিদের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি করে দেন, প্রতিদিন ভোরবেলায় পাখিদের খাবার দেন, বোতল কেটে গাছে গাছে তাতে পানি ও খাবার দেন এবং কোন পাখি অসুস্থ হলে তিনি চিকিৎসা করেন। তারপর পাখিগুলো খাদ্যের সন্ধ্যানে চলে যায়, বেলা শেষে পাখিগুলো আবার ফিরে তাদের আপন নিড়ে, আপন ঠিকানায়। এ যেন পাখির এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। গ্রামবাসীরা হোমিও ডাক্তার আজিজুল হক এর বাড়িকে পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করেছে।

আজিজুল হক যুব ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাখির পরিচিতি ও পাখি রক্ষায় অনুষ্ঠান করেন। সেখানে তিনি পাখি সেজে অভিনয় করেন, বিভিন্ন স্লোগান উচ্চারণ করেন যেমন: ‘আপনাদের প্রয়োজনেই আমাদের বাচাঁন, আমরা পরিবেশকে রক্ষা করি, আমরা কৃষক ও প্রকৃতির বন্ধু, আমরা মানুষকে রোগ থেকে মুক্ত রাখি। আমাদেরকে শিকারীর হাত থেকে, বিষ/কীটনাশকের কবল থেকে বাচাঁন।’ তিনি শিক্ষার্থী ও নতুন প্রজন্মকে পাখি রক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রচার করতে গিয়ে বলেন, “এক সময় গ্রাম বাংলার মানুষের ঘুম ভাঙতো পাখির কিচিরমিচির শব্দে, অথচ আজকাল চেনা পরিচিত সেই পাখিদের দেখা পাওয়াই দূরহ। গ্রামে কিছু পাখি দেখা গেলেও শহরে কাক ছাড়া অন্য কোন পাখি দেখা মেলা ভার। গ্রাম থেকেও দিন দিন পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আর এজন্য আমরাই দায়ী।” তিনি আরও বলেন, “অবাধে পাখি শিকার, নিরাপদ আবাসস্থল ধ্বংস করা, আগ্রাসি প্রজাতির বৃক্ষ রোপণের ফলে নিরাপদ আবস্থলের সংকট ও খাদ্যের অভাব ও কীটনাশকের অবাধ ব্যবহারের ফলে পাখির বৈচিত্র্যতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। যে ঘুঘু ও দোয়েল পাখির ডাকে মানুষের ঘুম ভাঙতো, শিকারীদের অত্যাচারে সেই ঘুঘু ও দোয়েল আজ বিলুপ্তপ্রায়। ঝাঁক বেঁধে আকাশে বক ওড়ার দৃশ্যও এখন আর দেখা যায় না। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে নানান প্রজাতির বক। নদী, বিল, পুকুর পাড়ে মাছ রাঙা পাখির মাছ ধরার দৃশ্য আজ আর চোখে পড়েনা। মাছরাঙার সংখ্যা ও প্রজাতি দিন দিন কমে যাচ্ছে।”

333
ডা. আজিজুল হক একজন প্রকৃত পাখি প্রেমিক, তিনি পাখিগুলোকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখেন। তাঁর বাড়িতে অনেক লোকজন আসে পাখির দৃশ্য দেখার জন্য। তবে তিনি তাদেরকে পাখির যাতে সমস্যা না হয় বা পাখি যাতে ভয় না পায় সে জন্য নিরবে পাখি দেখতে বলেন।

পাখি হচ্ছে মানুষ তথা প্রকৃতির প্রকৃত বন্ধু। তাই মানুষ ও প্রকৃতির প্রয়োজনেই পাখিকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন প্রজন্মের পাখি সম্পর্কে, পাখির প্রজাতি, পরিবেশ ও প্রকৃতি এবং প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় পাখির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানার জন্য পাখি সংরক্ষণে তাই সকলের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ এখনই গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় প্রকৃতির অন্যতম বন্ধু পাখির বৈচিত্র্যময় প্রজাতি একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। প্রকৃতি ও পরিবেশ হয়ে পড়বে ভারসাম্যহীন, যা হয়তো মানুষের পক্ষে পূরণ কখনো সম্ভব হবে না।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: