সাম্প্রতিক পোস্ট

করোনা মোকাবেলায় গ্রামীণ নারীর ভূমিকা

ভূমিকা
করোনায় একদিকে যেমন দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা এনে দিয়েছে, তেমনি আমাদের জীবনযাত্রার পরিচিত কিছু অভ্যাসের পরিবর্তন করেছে। সেই সাথে বেড়ে গেছে নারীদের কাজের চাপ। গ্রামীণ নারীদের এমনিতেই অনেক কাজ থাকে। এর সাথে যোগ হয়েছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধিতে যোগান ইত্যাদি। সকল দিকে তাল মিলিয়ে তবে মোকাবেলা করতে হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি।

অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতায় গ্রামীণ নারী
করোনা এমন একটা সময়ে আমাদের দেশে হানা দিয়েছে, যে সময়টা খরিফ-শস্য আবাদের জন্য উপযুক্ত। শুধু আবাদ করা নয় এর সাথে যুক্ত আছে বিক্রয় ব্যবস্থা। কারণ এই ফসলের উপর গ্রামের অনেক পরিবার নির্ভরশীল। নারীরা নিজেদের সংরক্ষিত বীজ এবং অন্যদের থেকে সংগ্রহ করা বীজের মাধ্যমে বিভিন্ন সব্জী চাষ করা শুরু করে। এর পাশাপাশি হাঁস মুরগি পালনের পরিমাণও বৃদ্ধি করে। এছাড়া মৌসুমী ফলমূল বিক্রি করে যে অর্থ উপার্জিত হয় তা দিয়ে সংসারের চাহিদা পূরণ করছে। কারণ বর্তমান সময়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর পুরুষ সদস্যরা বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারছেনা। ফলে তারা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।

এই অবস্থায় সংসারের হাল ধরেছেন গ্রামীণ নারীরা। তারা সবজি বিক্রি করে পুনরায় সবজির বীজ রোপণ, সবজির জাত বৈচিত্র্যতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিভিন্ন উপায়ে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আনতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অনেকে সেলাই করা, কুটির শিল্পের কাজ এগুলোও চালু রেখেছেন সংসারের প্রয়োজনে। এছাড়া বসতভিটার আশেপাশে জন্মে থাকা অচাষকৃত উদ্ভিদ ব্যবহার করে নিজেদের খাদ্য ও ঔষধের চাহিদা পূরণ করছেন। যে কারণে খাদ্য তালিকায় শাক এর অভাব পূরণ হচ্ছে এবং ঔষধি উদ্ভিদ ব্যবহারের ফলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছেনা।
আবার বছরের অন্যান্য সময়ে সংরক্ষিত বিভিন্ন খাদ্য উপকরণ যেমন শুকিয়ে রাখা মাছ, আম ইত্যাদি খাবার হিসেবে গ্রহণ করে বাজারের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এনেছেন।

প্রতিবেশিদের সহযোগিতায় গ্রামীণ নারী
গ্রামীণ সমাজের সদস্যরা একে অপরের সহযোগিতায় সব সময় এগিয়ে আসে। একজন অন্যজনের সুখে দুখে পাশে থাকার চেষ্টা করে। দেশের এই মহামারী পরিস্থিতিতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। পুরুষরা বাড়িতে থাকলেও অন্যদের সুবিধা অসুবিধার বিষয়ে অতোটা গুরুত্ব দেয়না, যতটা একজন নারী দিয়ে থাকেন। কার পরিবারে কি ধরণের সমস্যা হলো এসব সমাধান করতে একজন নারীই এগিয়ে আসেন। তাই যখন দেখেন তার প্রতিবেশিদের সংসারে বিভিন্ন উপকরণের অভাব আছে তখনই নিজের সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন। এই সময়ে গ্রামের নারীদের মধ্যে যাদের বাড়িতে সবজির ভালো উৎপাদন হয়েছে বা গাছে ফল আছে এগুলো দিয়েই দরিদ্র প্রতিবেশিদের সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। শুধু চাষকৃত ফসলই নয়, প্রয়োজনে বীজ, গাছের চারা এগুলোও বিতরণ করছেন প্রতিবেশি ও ভিন্ন গ্রামের মানুষদের মাঝে।

সচেতনতা তৈরীতে গ্রামীণ নারী
করোনা রোগের যেহেতু কোনো প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এর জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থাই উত্তম। প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমাদের অনেক অভ্যাসের পরিবর্তন আনতে হয়েছে এবং সকল বিষয়ে সচেতন থেকে আমাদের করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। নিজের পরিবার ও পরিবারের সদস্যদের ভালো রাখার পাশাপাশি গ্রামের নারীরা অন্যদেরকেও সচেতন করে তুলেছেন। নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধির মাধ্যমে যতটুকু পারা যায়। এছাড়া বিভিন্ন আত্মীয় বা কারো কাছে জেনে হোক এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে আমাদের কি করণীয় এ বিষয়ে সকলের সাথে আলোচনা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।

আমাদের কর্মএলাকায় অনেক নারী আছেন যারা শুধুমাত্র প্রতিবেশিদের নয়, নিজ উদ্যোগে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষকে সচেতন করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সচেতনতার পাশাপাশি দুর্বল মনের মানুষদের মানসিক শক্তি যোগাতেও তারা পরামর্শ দিচ্ছেন।

উদ্যোগ ও সহযোগিতা প্রাপ্তিতে গ্রামীণ নারী:
বর্তমান সময়ে নারীরা শুধু ঘরে বসেই অন্যদের সহযোগিতা করছেনা। গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলো যাতে সরকারি সহযোগিতা বা প্রণোদনা পেতে পারে সে বিষয়েও তারা কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন গ্রামের বা সংগঠনের নারী নেত্রীগণ ইউপিতে যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আদায়ে সচেষ্ট হয়েছেন। গ্রামের দরিদ্র পরিবারসমূহের তালিকা তৈরি, ইউপিতে জমা, সমাজের ধনী ব্যক্তিদের সাথে আলোচনা ইত্যাদি পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারে সহযোগিতা করেছেন। এছাড়া গ্রাম পর্যায়ে স্ব^চ্ছল পরিবারগুলো থেকে বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করে দরিদ্র পরিবারের মাঝে বিতরণ করেছেন।

সংসার পরিচালনায় গ্রামীণ নারী
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নারীদের নানামুখি কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এই সময়ে নিত্য নৈমিত্তিক কাজের পাশাপাশি বাড়তি অনেক ধরণের কাজ করতে হচ্ছে। যদিও এসব এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সকাল বিকাল বাড়ি ঘর জীবাণুমুক্ত করা, সময়মতো পরিবারের সদস্যদের খাবারের ব্যবস্থা করা, সবজি গাছের পরিচর্যা, প্রাণি সম্পদের যতœ, করোনা প্রতিরোধমূলক খাবার তৈরি, নিজে পরিচ্ছন্ন থাকা ও সকলকে পরিচ্ছন্ন রাখার সব কাজ নারীদেরকেই সামাল দিতে হচ্ছে।

তাছাড়া পুরুষ সদস্যরা বাড়িতে থাকায় তাদের আছে নানা ধরণের ফরমায়েশি কাজ। একটার পর একটা কাজ করতে গিয়ে নারীদের মনের উপরও চাপ পড়ে। এ সময়ে বিনোদনের সুযোগ নেই। বিনোদন বলতে একসাথে অনেকে বসে গল্প করাই নারীদের বিনোদনের অংশ। পরিবারের প্রবীণ ও ভিন্নভাবে সক্ষম সদস্যদের প্রতি আলাদা যতœ নেয়া, তাঁদের শুশ্রুষা করা, সময় মতো খাবার দেয়া সব কিছুতেই সমান নজর রেখে চলতে হচ্ছে।
পরিবারের সদস্যদের সুস্থতা এবং সংসারকে সচল রাখতে গিয়ে নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই নারীরা সকল কিছু একা সামাল দিচ্ছেন। সময় ভাগ করে, দ্রুততার সাথে এবং পকিল্পনা মাফিক সারাদিনের কাজ করে বিচক্ষণতার সাথে সংসার পরিচালনা করে যাচ্ছেন তারা।

পরিশেষে
একজন নারী একটি পরিবারের ভিত্তি। তিনি একদিকে যেমন কৃষাণী, তেমনি কারো মা, কারো স্ত্রী, কারো ভাবী, কারো আবার অতি পরিচিত প্রিয় মুখ। নিজের পরিবার, পরিবারের মানুষের মতই অন্যদেরও আপন করে নিতে তারা সব সময় এগিয়ে থাকেন। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো মনোবল বা সাহস তাঁদের আছে। আমরা যতই তাঁদের দুর্বল বলে পেছনে ফেলে রাখতে চাইনা কেন, নিজের প্রচেষ্টায় সকল কাজে তাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেই।

happy wheels 2
%d bloggers like this: