Posted in

হোসনা আক্তারের বাড়িতে বৈচিত্র্যময় শিম চাষ

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়

নেত্রকোনা শহর থেকে সাত কিলোমিটার পূর্বদিকে নেত্রকোনা মদন রোডে পিচের মাথার পাশেই দরুন হাসামপুর গ্রাম। সেই গ্রামেই ভূমিহীন উদ্যোগী নারী হোসনা আক্তারের বসবাস। তাঁর স্বামী মর্তজু আলী। পরিবারে সদস্য সংখ্যা সাত জন। চার ছেলে ও এক মেয়ে। স্বামীর পেশা কৃষি। তবে তাদের ধান চাষের নিজস্ব কোন জমি নেই।

শুধুমাত্র বসতভিটা সহ ১৯ শতাংশ জমি আছে। এই জমিতে যেহেতু ধান চাষ করা সম্ভব নয় তাই এখানে নিজ উদ্যোগে শুরু করেন জৈব পদ্ধিতিতে সবজি চাষ। বাড়ির চার পাশে এমনকি উঠানে মাচা, এই মাচা উপরই সারাবছর সবজি করে থাকেন। শিম, ডাটা, আলু, মিষ্টিআলু, বরবটি, শীতলাউ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, মূলা, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, পুঁইশাক, করলা, বেগুন, বিলাতি ধনিয়া, কচু, ঢেঁড়স, পেঁপেসহ বৈচিত্র্য রকমের মৌসুমি ফসলাদি করে থাকেন। তিনি তাঁর সবজি চাষে কেঁচো কম্পোস্ট, গোবর, ছাই ও হাঁস মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহার করে থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমার সবজির চাহিদা বেশি, বাজারে নিলে তাড়াতাড়ি বিক্রি হয়। এমনকি বাড়ি থেকে এসে লোকজন সবজি নিয়ে যায়। কারণ আমার সবজিতে কোন বাজারের বিষ বা সার দেইনা, খাইতে স্বাদ লাগে।’

Hosna
জাতবৈচিত্র্য বৃদ্ধি, বীজ সংরক্ষণ ও বীজের সহজলভ্যতার উদ্যেশ্যে গত আগস্ট’ ২০১৮ ইং মাসে বারসিক’র জনউদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতা হিসেবে হোসনা আক্তারকে তিন ধরণের শিম বীজ (নেপালি, খইলসা ও আইশনা) প্রদান করা হয়েছিল। এছাড়া তাঁর সংরক্ষিত খইলা/পুডি জাতের শিম তিনি চাষ করেছেন। এই চার ধরণের শিম গাছে অসংখ্য শিম ধরেছে। প্রায় দুই (অগ্রহায়ণ/নভেম্বর থেকে) মাস যাবৎ তিনি শিম তুলে বিক্রি করছেন। লক্ষ্মীগঞ্জে প্রতি সপ্তাহে দুই দিন (রবি ও বৃহস্পতি) হাট বসে। প্রতি হাটে তিনি এক মণ থেকে দেড় মণ পর্যন্ত শিম বিক্রি করতে পারেন। প্রতি কেজি ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ টাকা দরে তিনি বিক্রি করছেন।

চার ধরণের শিমের মধ্যে নেপালি আর আইশনা জাতের শিমের চাহিদা সবচে’ বেশি। আর খইলসা শিম এর বীজ খাওয়ার জন্য গাছে রেখে দিয়েছেন। কারণ এর বীজের চাহিদা বেশি। কৃষাণি হোসনা আক্তারের দেয়া তথ্য অনুযায়ি তাঁর চাষকৃত শিমের বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:

নেপালি শিম
নেপালি শিম দেখতে সবুজ, দুই পাশে খয়েরি রঙের শিরা থাকে। এই শিম বীজ মূলত নেপাল থেকে আনা। বারসিক প্রতিনিধি দল ২০১৬ সালে কোনো এক সফরে নেপাল গিয়েছিল। সেখান থেকে সংগ্রহ করা বীজ বারসিক রামেশ্বরপুর রিসোর্স সেন্টারে গত বছর চাষ করা হয়েছিল। Nepali Bean (2)

সেই সংরক্ষিত বীজ হোসনা আক্তারকে প্রদান করা হয়। এই শিমের বৈশিষ্ট্য হলো দেখতে অন্যান্য শিমের তুলনায় ছোট, তবে ভেতরে বীজ থাকে অনেক। বীজগুলোও বেশ বড় হয়। রান্না করলে এই শিম কাটতে হয় না, গোটা শিমটিই তরকারিতে দেয়া হয়। অনেক বীজ থাকলেও এটি ভালো সিদ্ধ হয়। লতানো গাছের গিটে গিটে আঙুলের মতো বিক্ষিপ্ত অবস্থায় শিম ধরে প্রচুর। এর বীজ খেতে অনেক সুস্বাদু।

খইলসা শিম
এটি দেখতে সাদা রঙের, দুপাশে খয়েরি শিরা থাকে। আকৃতি একটু চ্যাপ্টা। মূলত খইলসা মাছের মতো দেখতে হয় বলে এর নাম খইলসা শিম। এই শিম নেত্রকোনা অঞ্চলে খুব বেশি চাষ হয়না। Khoila Bean

তাই এর বীজ ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এর বীজ ভর্ত্তা খেতে খুব স্বাদ। অধিকাংশ নারী এই শিমটি বীজের জন্য পছন্দ করেন। বীজগুলো পুষ্ট হলে বালির মতো চিক চিক করে। খেতে অনেক স্বাদ হয়। এই বীজের ভর্ত্তা, ডাল আর ভাজি খেতে ভালো।

আইশনা শিম
এই শিম বীজ নেত্রকোনায় চাষ হয় প্রচুর। তাই পাওয়া যায় বেশি। স্বরমশিয়া ইউনিয়নের তিলকপুর গ্রামের কৃষাণি রিনা আক্তারের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে হোসনা আক্তারকে দেয়া হয়েছিল। Aaishna Bean

তবে অনেকেই এর চাষ করতে পারে না। কারণ এটি সময়ের অনেক আগে ফলন দেয়। এই শিম দেখতে সবুজ, লম্বা। খুব ভালো সিদ্ধ হয়, নরম। তাই এটি সবাই পছন্দ করে। ফলন দেয় আশ্বিন থেকে শুরু করে চৈত্র মাস পর্যন্ত।

এই গ্রামে হোসনা আক্তার ১৫জন সদস্য নিয়ে একটি নারী সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এবং তাঁকে বীজ সংরক্ষণের জন্য বারসিক উপকরণ সহযোগিতা প্রদান করেছে। তাঁর সংগঠনের অধিকাংশ নারী নেপালি শিমটি সবচে’ বেশি পছন্দ করেছেন। আগামীতে তিনি প্রচুর পরিমাণে এর বীজ সংরক্ষণ করবেন। নিজে আরো বেশি পরিমাণে চাষ করবেন। তাছাড়া খইলসা শিমটিও আগে এই এলাকায় চাষ হতো। বর্তমানে এর চাষ বৃদ্ধির জন্য অনেকেই তাঁর কাছে এই বীজটি চেয়েছেন।

সৃজনশীলতা আর তথ্য ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ আমাদের দেশের নারীদের গুণের শেষ নেই। নতুন নতুন চিন্তা আর উদ্ভাবনের নেশায় তারা মেতে থাকে। কিভাবে নিজের পরিবারের আয় উন্নতি বাড়ানো যায়, পরিবেশ ভালো রেখে চাষাবাদ করা যায় এ নিয়েই তাঁরা ব্যস্ত থাকেন সবসময়। আগামীতে হোসনা আক্তারের পাশাপাশি এই গ্রামের আরো অনেক নারী বৈচিত্র্যময় শিম চাষে যুক্ত হবে। তাঁদের মাধ্যমে এই বীজ বৈচিত্র্য ছড়িয়ে পড়বে গ্রামান্তরে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.