সাম্প্রতিক পোস্ট

কোন কিছুই ফেলনা নয়

নেত্রকোনা থেকে শংকর ম্রং

সারা বিশ্বের মুসলমান তথা ইসলাম ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর খুবই প্রিয় একটি ফল আরবিয়ন খেঁজুর। খেঁজুর খায়না এমন ইসলাম ধর্মাবলম্বী মুসলিম ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দুস্কর। বছরে অন্তত একটি মাস সকল ইসলাম ধর্মপ্রাণ মানুষ খেঁজুর কম-বেশি হলেও খেয়ে থাকেন। তবে মধ্যপ্রচ্যের রাষ্ট্রসমূহের মানুষেরা বছরব্যাপী খেঁজুর খেয়ে থাকেন। তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহে বছরে অন্তত একটি মাস বিশেষভাবে প্রতি রোজার মাসে সকলের ইফতার এর তালিকায় আরবিয়ান খেঁজুর থাকে। আর এসব খেঁজুর যেসব দেশ থেকে আমদানী হয়ে থাকে তার মধ্যে সৌদি আরব, দুবাই, দোহার, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, কুয়েত ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আমাদের দেশে বাজারে যেসব খেঁজুর পাওয়া যায় তার শতভাগই আমদানী হয় এসব আরব রাষ্ট্রগুলো থেকে। আমাদের দেশে যে খেঁজুরের চাষ হয় না এবং ফল হয়না তা নয়। তবে এদেশে উৎপাদিত খেঁজুরের জাতগুলো খুবই ছোট এবং কম মাংসল। এদেশের কৃষকরা খেঁজুরের রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরির জন্য খেঁজুরের চাষ করেন। কেননা খেঁজুরের গুড় বেশ লাভজনক এবং দেশ বিদেশে এদেশে উৎপাদিত খেঁজুরের গুড়ের চাহিদাও বেশি। কিন্তু এদেশে উৎপাদিত খেঁজুর ফল বড় বিচি ও কম মাংসল হওয়ায় এটি খুবই অবহেলিত এবং চাহিদা নেই বললেই চলে। যেটুকু চাহিদা রয়েছে তাও শুধুমাত্র শিশুদের কাছে। তবে খেঁজুরের রস থেকে উৎপাদিত গুড় সকল শ্রেণীর মানুষের নিকট সমান। বিশেষখাবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রিয় খাবার পিঠা ও পায়েস তৈরিতে খেঁজুরের গুড় অত্যাবশ্যক।

IMG_20170714_155313
আমাদের দেশের আবহাওয়া মধ্যপ্রাচ্যের অনুরূপ না হলেও খেঁজুর উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ এদেশেও বিদ্যমান। বিশেষভাবে দেশের লালমাটি অঞ্চলসমূহ (ভালুকা, মধুপুর, সাভার ইত্যাদি) মধ্যপ্রাচ্যের খেঁজুর চাষের উপযোগি। আর এটি প্রমাণ করেছেন ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার সৌদি আরব প্রবাসী মো. আব্দুল মোতালেব (যিনি এখন খেঁজুর মোতালেব নামে পরিচিত)। তিনি সৌদি আরব থেকে কিছু খেজুর বীজ নিয়ে এসে পরীক্ষামূলকভাবে চারা উৎপাদন করে সেই চারা জমিতে চাষ করেন। বেশ কয়েক বছর পর সেই গাছগুলোতে খেঁজুর ফল ফলে এবং খেতেও আরবীয় খেঁজুরের ন্যায় স্বাদ ও মিষ্টিুযুক্ত হয়। খেঁজুরের ফলনও মোটামুটি ভালো এবং দেশিয় খেঁজুরের চেয়ে অনেক কম সময়ে (৫-৬ বছরের মধ্যে) গাছে ফল আসে। আব্দুল মোতালেব আরবীয় খেঁজুর চাষ করে সফল হয়ে ব্যাপকভাবে এই খেঁজুরের চারা উৎপাদন ও চাষ আরম্ভ করেন। তিনি এক বছর বয়সী খেঁজুরের চারা প্রতিটি পাঁচশত টাকা করে বিক্রি করেন। অনেক বৈচিত্র্যময় ফল চাষি শখ করে এক/দু’টি খেঁজুরের চারা কিনে নিয়ে রোপণ করলেও চারার অধিক মূল্যের জন্য ব্যাপকভাবে বা বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে পারছেন না। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের এসব জাতের খেঁজুর চারা কৃষকদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকলে এবং সহজলভ্য হলে হয়তো এর চাষ আমাদের দেশেও বৃদ্ধি পেতে পারে। আর ইচ্ছে থাকলে এবং একটু চেষ্টা করলেই যে কেউ মধ্য প্রাচ্যের এসব খেঁজুরের চারা নিজেরাই ঘরে উৎপাদন করতে পারেন। তবে এর জন্য প্রয়োজন শুধুমাত্র ভালো বীজ ও আত্মবিশ্বাস।

মধ্য প্রাচ্যের খেজুরের বীজ পেতে ও চারা উৎপাদনের জন্য যেসব বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে-
 রোজার মাসে মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ছোট ছোট প্যাকেটে (৫০০ গ্রাম/এক কেজি) শুকনো খেঁজুর আমাদের দেশে আমদানী হয় সেসব খেজুরের বীজ সংগ্রহ করা।
 যে সকল ইসলাম ধর্মপ্রাণ মুসলমান আত্মীয় বা পরিচিত লোক প্রতিবছর পবিত্র হজ্ব পালন করতে সৌদি আরব যান এবং হজ্ব করে দেশে ফেরার সময় শুকনো ও টাটকা খেঁজুর আত্মীয়-স্বজনদের জন্য নিয়ে আসেন সেসব খেজুরের বীজ সংগ্রহ করা।
 পবিত্র হজ্ব ছাড়াও এদেশের লক্ষ লক্ষ বাঙালি কাজের জন্য মধ্য প্রাচ্যে যায় এবং ছুটিতে দেশে ফেরার সময় তারাও স্বজনদের জন্য সেসব দেশ থেকে খেঁজুর নিয়ে আসেন, যেগুলো সরাসরি বাগান থেকে সংগৃহীত এবং প্রাকৃতিক। এসব খেঁজুরের বীজ অঙ্কুরোদগমনযোগ্য এবং সেব বীজ সংগ্রহ করা।
 পচা গোবর বা কম্পোস্ট মিশ্রিত মাটি টবে ভরে সংগৃহীত এসব খেজুরের বীজগুলো রোপণ করে নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে। এভাবে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই রোপনকৃত বীজ থেকে খেজুরের চারা পেয়ে যাবেন।

IMG_20170714_155317
এভাবে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী আরীবয় খেঁজুরের চারা উৎপাদন করতে পারেন। সম্মানিত পাঠকগণ ভাববেন না যে আমি লেখার জন্য বিষয়টি লিখছি। আমি বিষয়টি চর্চা করে সফল হয়ে তবেই লিখছি আপনাদের উৎসাহ যোগাতে। ২০১৬ সালে আমার এক সহকর্মীর নিকট আত্মীয় পবিত্র হজ্ব করে দেশে ফেরার সময় বেশকিছু টাট্কা খেজুর (গাছ থেকে তুলে আনা ঝোকাসহ) ও শুকনা খেঁজুর নিয়ে আসেন। আমার ঐ সহকর্মীও সেখান থেকে খেঁজুরের কিছু ভাগ পেয়েছিলেন। তিনি তার ভাগের খেঁজুর থেকে খাওয়ার জন্য অফিসে নিয়ে আসেন এবং আমি টাট্কা পাঁচটি এবং শুকনো সাত-আটটি খেঁজুর ভাগে পাই। খেঁজুরগুলো খাওয়ার পর আমি বীজগুলো যতœ করে রেখে দিই। পরবর্তীতে আমি সেগুলো ময়মনসিংহে আমার ভাড়া বাসার বারান্দায় কম্পোষ্ট মিশ্রিত মাটি ভরা তিনটি ছোট ছোট টবে বপন করি এবং নিয়মিত পানি সেচ দিতে থাকি। যদিও আমার বিশ্বাস ছিল বীজগুলো থেকে এক-দু’টি হলেও চারা গজাবে। কিন্তু দু’মাসবাদে রোপণকৃত বীজগুলো থেকে আশাতীত চারা গজাতে দেখা যায়। অর্থাৎ যে ক’টি বীজ আমি বপন করেছিলাম তার অধিকাংশই অঙ্কুরোদগমন হয়েছে। তিনটি টবে মোট ১২টি চারা গজিয়েছে (১৫টি বীজের মধ্যে)। আগামী মাস নাগাদ চারাগুলো আমি মধুপুরের বাড়ি নিয়ে গিয়ে রোপণ করবো। যেহেতু ভালুকা অঞ্চলের মাটি লাল এবং ঐ মাটিতে আরবীয় খেঁজুর ভালো ফলে এবং স্বাদে গন্ধেও অনুরূপ তাই মধুপুরের মাটিতেও এর ফলন ভালো হবে বলে আমার বিশ্বাস। কেননা, মধুপুরের মাটিও ভালুকার ন্যায় লাল এবং আবহাওয়াও একই ধরনের।

সব কিছুই কিন্তু ফেলনা নয়, একটু বুদ্ধি খাটিয়ে ও একটু পরিশ্রম করলেই ফেলনা জিনিস থেকেও অনেক মূল্যবান কিছু আবিষ্কৃত হতে পারে। খেঁজুরের ন্যায় বিদেশ থেকে আমদানীকৃত বিভিন্ন ফলের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে চারা উৎপাদনের উদ্যোগ নেই। উৎপাদিত এসব বিদেশি জাতের মূল্যবান ফল চাষ করে সফল হতে পারলে আমদানী বাবদ বৈদেশিক মূদ্রা যেমন গচ্ছিত থাকবে, তেমনি হয়তো একদিন এসব ফল বিদেশে রপ্তানী করে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করা যাবে। বৃদ্ধি পাবে বৈদেশিক মূদ্রার রির্জাভ। পাশাপাশি বৃুদ্ধি পাবে দেশের ফল বৈচিত্র্য এবং নিশ্চিত হবে সকলের জন্য বৈচিত্র্যময় খাদ্য নিরাপত্তা।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: