সাম্প্রতিক পোস্ট

বৈচিত্র্যময় সবজির বীজে হাওরাঞ্চলের কৃষক-কৃষাণীদের মধ্যে জাগিয়েছে নতুন প্রেরণা

নেত্রকোনা থেকে শংকর ম্রং

হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা বছরের প্রায় ৬ মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে। কোন কোন এলাকায় আবার বছরের প্রায় ৯ মাস পানি থাকে। এসব এলাকার জনগোষ্ঠী মূলত এক ফসলী বোরো ধানের উপর নির্ভরশীল। ধান ছাড়া হাওরাঞ্চলে অন্য কোন ফসল চাষ হয়না বললেই চলে। আশ্বিন মাসের দিকে হাাওরের জমি থেকে পানি ধীরে ধীরে নেমে যেতে থাকে। পানি নেমে যাওয়ার পর এবং বোরো ধান রোপণের আগে পর্যন্ত অধিকাংশ জমি পতিত থাকে। কিছু কিছু জমিতে স্বল্প মেয়াদী সবজি ফসল চাষের সুযোগ থাকলেও হাওরাঞ্চলের কৃষকরা সেচের সমস্যার জন্য সেসব জমি পতিত ফেলে রাখে। অন্যদিকে হাওরাঞ্চলে ঘনবসতি হওয়ায় অধিকাংশ পরিবারের বসতভিটায় সামান্য পরিমাণে সবজি চাষ করারও জায়গা নেই। আবার অনেকের সামান্য পরিমাণে বসতভিটায় জায়গা থাকলেও গবাদী পশু-পাখি পালন করায় সবজি চাষ করতে পারেনা। তবে কিছু কিছু পরিবার বসতভিটার সামান্য জায়গায় গবাদী পশু-পাখির পাশাপাশি মাচায় লাউ ও সীম জাতীয় সবজি চাষ করে। অথচ বসতভিটার খালি জায়গাগুলোতে মাচায় বা মাটিতে কুমড়া বা করলা জাতীয় সবজি চাষ করা হলে প্রতিটি পরিবারই তাদের দৈনন্দিন সবজির চাহিদা অনেকটা পূরণে সক্ষম হত।

IMG_20190130_120224
নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নটি সম্পূর্ণই হাওর এলাকা। গোবিন্দশ্রী গ্রামের জনগোষ্ঠীকে বসতভিটার সামান্য জমিতে এবং বর্ষার আগে পর্যন্ত সময়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে বৈচিত্র্যময় সবজি ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করতে বারসিক’র উদ্যোগে পাড়ায় পাড়ায় গ্রাম সভা করা হয়। গ্রাম সভায় ফলে গ্রামের জনগোষ্ঠী বসতভিটায় সবজি চাষের কৌশল জানতে পারে এবং তাদের মধ্যে সবজির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। তারা নিজেদের বসতভিটায় এবং অপেক্ষাকৃত উঁচু ও পতিত জমিতে সবজি চাষ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু মানসম্মত ও প্রয়োজনীয় সবজি বীজ না থাকায় তারা বারসিক এর নিকট বীজের চাহিদা জানায়। হাওরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর চাহিদার ভিত্তিতে গতকাল ৩০ জানুয়ারি বারসিক’র সহায়তায় এবং গোবিন্দশ্রী শস্য ফসলের জাত গবেষণা কমিটির উদ্যোগে গোবিন্দশ্রী ইউনিয়ন কমপ্লেক্সে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রামের ১১৫ জন কৃষক-কৃষাণীদের মধ্যে ১৬ ধরণের বৈচিত্র্যময় সবজি বীজ বিতরণ করা হয়।

IMG_20190130_121226
বীজ বিতরণ অনুষ্ঠানে কৃষক-কৃষাণীদের উদ্বুদ্ধ করতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের ‘কৃষি, মৎস্য ও পশু সম্পদ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কাজ’ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং ইউনিয়নের দায়িত্ব প্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। অনুষ্ঠান উপলক্ষে আলোচনায় বারসিক’র শংকর ম্রং কৃষক-কৃষাণীদেরকে তাদের বসতভিটার সমস্ত খালি জায়গাগুলোতে কুমড়া ও করলা জাতীয় সবজি চাষ করতে এবং প্রত্যেককে কমপক্ষে দু’টি করে পেঁপে চারা রোপণের পরামর্শ দেন। তিনি সকলকে নিজেদের উৎপাদিত ফসলের বীজ সংরক্ষণ করে এবং পরস্পরের সাথে বীজ বিনিময় করে বীজের জন্য বাজারের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন। বীজ বিনিময় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী কৃষক-কৃষাণীরা গোবিন্দশ্রী গ্রামে একটি বীজ বাড়ি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে তারা সে বাড়িতে তাদের উৎপাদিত শস্য ফসলের বীজ সংরক্ষণ করতে পারে এবং প্রয়োজনের সময়ে সেখান থেকে বীজ নিয়ে যথা সময়ে জমিতে চাষ করতে পারে।

IMG_20190130_121248
আলোচনা শেষে কৃষক-কৃষাণীরা নিজেদের জমির পরিমাণ ও ধরণের উপর ভিত্তি করে একে একে তাদের পছন্দের সবজি বীজ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। সকল কৃষক এসব বীজ চাষ করে বীজ সংরক্ষণ ও পরস্পরের সাথে বীজ বিনিময়ের প্রত্যয় ব্যক্ত করে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বীজ সহায়তা প্রদান করায় এলাকায় সবজি চাষ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা ব্যক্ত করেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: