সাম্প্রতিক পোস্ট

৫০৪ জাতের ধান নিয়ে গবেষণায় কৃষক সায়েদ আহমেদ খান বাচ্চু

নেত্রকোনা থেকে মো. অহিদুর রহমান

কৃষক সায়েদ আহমেদ খান বাচ্চু। নেত্রকোনা জেলা আটপাড়া উপজেলার স্বরমুশিয়া ইউনিয়নের রামেশ্বরপুর গ্রামে তুষাই নদীর পাড়ে তাঁর জন্ম। বর্তমানে তুষাই নদী নেই, চিহ্নও নেই। যেখানে নদী ছিল সেখানে ফসলের সবুজ মাঠ। কৃষক ফসল ফলায়। নদী নিয়ে আছে শুধু গল্প। ছোটকাল থেকেই কৃষি কাজের সাথে জড়িত । তিনি দেখেছেন কিভাবে কৃষকের সম্পদ বীজ কোম্পানির কাছে চলে গিয়ে আবার প্যাকেট হয়ে কৃষকের কাছে ফিরে আসছে। কিভাবে কৃষকের গোয়ালঘর গ্যারেজ হয়ে গেছে। পুকুরে কিভাবে আগ্রাসী মাছের চাষে একাকার হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ ইতিহাস, অভিজ্ঞতা সবকিছুই ভাবিয়ে তোলে কৃষক সায়েদ আহমেদ খান বাচ্চুকে ।

ধানের দেশ, গানের দেশ বাংলাদেশ। নেত্রকোনা বাংলাদেশেরই একটি ছোটজেলা। নেত্রকোনা অঞ্চলের মানুষ ধানের উপর নির্ভর করেই তাদের জীবন ও জীবিকা পরিচালনা করে আসছিলেন। ধান চাষকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠেছের্ তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। যতই দিন যাচ্ছে স্থানীয় জাতের ধান, শস্যফসল হারিয়ে যেতে শুরু করে । কৃষকেরা নিজের সম্পদ বীজ হারিয়ে বাজার নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কৃষক প্রতারিত হতে থাকে বারবার। কৃষক সায়েদ আহমেদ খান বাচ্চুও একসময় ১০-১৫ জাতের ধানের চাষ করতেন। কৃষকের সম্পদ বীজ কেন কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে, কৃষক কেন দিন দিন বাজার নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এই চিন্তা তাঁকে গভীর ভাবে ভাবিয়ে তুলে। নিজ উদ্যোগে শুরু করেন ধানের জাত বাছাই কার্যক্রম। ২০০৫ সালে আউশ মৌসুমে ৫টি ধানের জাত সংগ্রহ করেন আশেপাশের গ্রাম থেকে এবং শুরু করেন ধানের গবেষণা প্লট। এভাবে আউশ আমন, বোরো মৌসুমেও ধানের জাত গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে, ইউনিয়ন থেকে ইউনিয়ন, উপজেলা থেকে উপজেলা, জেলা থেকে জেলা, দেশ থেকে বিদেশ ঘুরতে থাকেন। সংগ্রহ করতে থাকেন ধানের জাত। এভাবে ধানের জাত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি যেখানেই যেতেন সেখান থেকেই ধান সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতেন। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেরিয়েছেন পাগলের মতো। তার উদ্যোগ দেখে গ্রামের কৃষক, আশেপাশের মানুষ বীজ সংগ্রহ করে কৃষক বাচ্চু খানের বাড়ি পৌছে দিতো। ধান সংগ্রহ তাঁর নেশায় পরিণত হয়।

IMG_20171025_095130

তিনি তৈরি করেন ধান গবেষণা প্লট। আউশ, আমন,বোরো মৌসুমে ধানের গবেষণা প্লট তৈরি করে ধানের জাত বাছাই কার্যক্রম করে এবং ধানের জাত সংরক্ষণ করতে থাকেন। ধানের জাতগুলো সংরক্ষণের জন্য তিনি নিজ বাড়িতে একটি বীজ বিনিময় কেন্দ্র তৈরি করেন। সেখানে তিনি বীজ রাখেন ও কৃষক বীজের বিনিময়ে বীজ সংগ্রহ করতেন ও বিনিময় করতেন । কৃষকের মাঝে আগ্রহ উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা দেয়। গ্রামের সকল কৃষকেরা মিলে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন । গ্রামের ও আশের পাশের ১৩ গ্রামের কৃষকেরা বীজঘর থেকে বীজ সংগ্রহ করতে থাকেন।

বীজ নিয়ে চাষ করার পর সেই বীজ ঘরে ফেরত দিয়ে যেতেন কৃষকরা। এভাবে কৃষকের বাছাই করা বীজ কৃষক থেকে কৃষক,গ্রাম থেকে গ্রাম, জেলা জেলায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। নেত্রকোনার গন্ডি পেরিয়ে কৃষক সায়েদ আহমেদ খানের এই বীজ ময়মনসিংহ, সুনামগন্জ, শেরপুর, জামালপুর, কিশোরগন্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মানিকগন্জ, কুমিল্পা, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, খুলনা, নাটোরসহ বাংলাদেশের ২৫টি জেলার কৃষক ও সংগঠনের মাঝে সম্প্রসারিত হয়। যারাই বীজ পরিদর্শন করতে আসছেন তারাই পছন্দের বীজ সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন। তাদের এলাকায় চাষ করছেন। আটপাড়া এলাকায় প্রথমদিকে যেখানে মাত্র ৪ থেকে ৫ জাতের ধান চাষ হতো বর্তমানে সেখানে কৃষকেরা ৬১ জাতের ধান চাষ করছেন ।

কৃষক সায়েদ আহমেদ খান বাচ্চুর কাছে বর্তমানে আউশের ২৪টি জাত, আমনের ৪২৩টি জাত, বোরোর ৫৭টি জাত সংগৃহীত আছে। তিনি কৃষকের নেতৃত্বে ধানের জাত গবেষণা করে জাত বাছাই করছেন ও একটি সংরক্ষণ প্লট করে জাতগুলো রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। তিনি প্রথমে রামেশ্বরপুর গ্রামে একটি জাত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তারপর তাঁর কার্যক্রম দেখে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার দূর্গাশ্রম, বাশাটি, তিলকপুর, স্বরমুশিয়া, কৃষ্ণপুর, দেওগাও, পাহাড়পুর, বানিয়াজান, মদন উপজেলার শাহপুর, ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া, খিচা, তারাটি, সাধুপাড়া, সুতিয়াখালি, পুটিজানা, নেত্রকোনা সদর উপজেলার চল্লিশা, রাজেন্দ্রপুর, কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুড়া, খারনৈই, কেন্দুযা উপজেলার আশুজিয়া, সিংহের গাও, নগুয়া, সুনামগন্জ জেলার ধরমপাশা উপজেলার সম্পদপুর, মধ্যনগর, কৃষকেরা কৃষকের নেতৃত্বে ধানের জাত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে ধানের জাত বাছাই করছেন ও বীজ সংরক্ষণ করে বাজার নির্ভরশীলতা কমাচ্ছেন। কৃষক সায়েদ আহমেদ খান বাচ্চু প্রতিটি জাত গবেষণা কার্যক্রম পরিদর্শন করে কৃষকদেরকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং তাঁর মতো আরো কৃষক গবেষক তৈরিতে সহায়তা করেছেন। যারা বর্তমানে বিভিন্ন উপজেলা জেলায় কৃষকের বন্ধু হয়ে বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করে যাচ্ছেন।

IMG_20171025_094732

তিনি বাছাই করা ধানের জাত উন্নয়নের জন্য ধানের জাত উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করেন। কৃষক বাচ্চুর উদ্যোগ উৎসাহ দেখে বারসিক ফিলিপাইনের ম্যাসিপাগ নামের সংগঠনের কার্যক্রম পরিদর্শন করতে পাঠায়। সেখান থেকে তিনি ধানের জাত উন্নয়নে গবেষণার সার্বিক বিষয় জেনে আসেন। বাংলাদেশে এসে তিনি আরো ১০জন কৃষককে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করেন। এলাকা উপযোগি একটি নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য তিনি নিরলসভাবে কাজে করে যাচ্ছেন।

কৃষকের বীজ কৃষকের অধিকার, কৃষকের বীজ কৃষকের সম্পদ এই কথাটি তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। তিনি বীজঘর তৈরি, জাত গবেষণা পরিচালনা, কৃষককে কাজে সহায়তা করা, বিনিময় করা, বীজ সংগ্রহ করা এবং মেলার আয়োজন করে সকল স্তরের মানুষকে তা জানানো ছিল তাঁর প্রধান কাজ। তিনি পাড়ামেলা, গ্রামের মেলা, প্রাণবৈচিত্র্য মেলা, উপজেলা, জেলা, জাতীয় পর্যায়ে মেলায় অংশগ্রহণ করে জানিয়ে দিয়েছেন বীজ আমাদের সম্পদ আমাদেরই রক্ষা করতে হবে।

দেশী, বিদেশী অনেক সংগঠন তাঁর বীজঘর পরিদর্শন করেছেন। কারিতাস, রোসা, লোকজ, এসডিএস, উত্তরন, দীপশিখা, নারীপ্রগতি, এসবিসি, বারসিকের বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যেমন সাতক্ষীরা, মানিকগঞ্জ, মঠবাড়িয়া, মধ্যনগর, কলমাকান্দা, এনজিও ফোরাম, কর্মজীবী নারী, নেত্রকোণার প্রেসকèাব সাংবাদিক দল, সিএসডি, গান্ধি আশ্রম, এমকেপি, পাসকস, সেবা কৃষক সংগঠন, মাটি, বিআইএ, একশান এইড, চ্যানেল আই, ইউল্যাব ইত্যাদি।

এছাড়াও সোয়ালজ, সুইডেন, ব্রীহি, ভারত, লুমান্তি, নেপাল, ইয়োথ একশান, নেপাল, সেকার্ড, নেপাল, ফিয়ান, নেপাল, সিভাসমন্ডি স্পেন, মিজারিওর জার্মানির প্রতিনিধিসহ আন্তর্জাতিক অনেক সংগঠন ও দাতা সংস্থা এ বীজঘর পরিদর্শন করেছে।

কৃষক বাচ্চু খানের এই উদ্যোগ, তাঁর চিন্তা, প্রেরণা আরো কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক, কৃষকের বীজ কৃষকের কাছে থাকুক। কৃষকের বাজার নির্ভরশীলতা কমে যাক। বীজের প্রতারণার হাত থেকে বাচুক। এটাই আশা করে সাধারণ মানুষ।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: