সাম্প্রতিক পোস্ট

আউশ ও আগাম আমন ধান চাষ এবং পাখির আগ্রাসন

নেত্রকোনা থেকে শংকর ম্রং

বর্তমান কৃষিকে আধুনিক কৃষি বা প্রযুক্তি নির্ভর রাসায়নিক কৃষির যুগ বলা হয়। দ্রুত জনসংখ্যা বর্ধনশীল পৃথিবীতে অধিক মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য বিজ্ঞানীগণ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরণের গবেষণা পরিচালনা করে চলেছেন। উদ্ভাবন করছেন অধিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ধরণের উৎপাদন প্রযুক্তির। তৈরি করছেন উচ্চ ফলনশীল জাত ও উন্নত কৃষি উপকরণ। বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম ডিম ও কৃত্রিম চালও (প্লাস্টিক চাল) উদ্ভাবন করেছেন, যা’ মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে বাংলাদেশের তিনটি কৃষি মৌসুমের মধ্যে (আউশ, আমন ও বোরো) বর্তমানে টিকে আছে আমন ও বোরো এ দু’টি মৌসুম। বিভিন্ন কারণে আউশ মৌসুম প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে, দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে আউশের চাষ হয়না বললেই চলে। যেসমস্ত এলাকায় এখনো কিছু কিছু আউশ ধানের চাষ হয় সেব এলাকার কৃষকরা বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। একটি এলাকায় দু’একজন কৃষক সামান্য পরিমাণ জমিতে আউশ ধানের চাষ করায় গবাদি পশু-পাখি, বন্য পাখি ও রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাবের ফলে কৃষকরা আউশ ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

IMG_20171024_141254-W600
বারসিক রামেশ্বরপুর রির্সোস সেন্টারের উদ্যোগে এলাকা উপযোগি আউশ ধানের জাত নির্বাচনের জন্য কৃষক নেতৃত্বে জাত গবেষণা স্থাপন করে কৃষকদেরকে আউশ মৌসুমে ধান চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। দু’একজন কৃষক উৎসাহ দেখালেও অন্যরা আউশ ধান চাষ করতে আগ্রহী না হওয়ায় নিরাপত্তাজনিত কারণে তারাও মৌসুমে ধান চাষ করছেনা। বারসিক এর উদ্যোগে রামেশ্বরপুর গ্রামে ২০১৭ আউশ মৌসুমে এলাকা উপযোগি ধানের জাত নির্বাচনের জন্য ৩০টি জাত নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছিল। কিন্তু শীষ বের হওয়ার পর চাল হওয়ার মূহুর্ত থেকে শত শত বাবুই পাখির আক্রমণের ফলে জাতগুলো টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হয়ে উঠে। অন্যদিকে প্রত্যেকটি ধানের শীষ একই সময়ে বের না হওয়ায় আগাম ধান জাতের প্লটগুলোতে শতশত বাবুই পাখি একত্রে আক্রমণ করে। ফলে মূহুর্তেই প্লটের (র্৮/র্৮ প্লট) সমস্ত ধান পাকার পূর্বেই সাবার হয়ে গেছে। পাকা ধানগুলো নেট দিয়ে ঘিরে এবং জমিতে টিন ও ঘণ্টা বেঁধেও পাখি তাড়ানো সম্ভব হয়নি। কয়েক মিনিট পাখি না তাড়ালেই একটি প্লটের সমস্ত ধান পাখি খেয়ে ফেলেছে। আবার যে জাতগুলোর শীষ দেরিতে বের হয়েছে সেসব ধানের দুধ ভরার পরপরই পাখি খেয়ে শেষ করেছে। ফলে আউশ মৌসুমের তিনটি ধানের বীজ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

IMG_20171022_150700-W600
বারসিক চলতি আমন মৌসুমে ২৭৮টি স্থানীয় জাতের ধানের সংরক্ষণ প্লট (র্৫/র্৫) করেছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে ১১টি স্থানীয় জাতের ধানের শীষ বের হয় এবং সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ধানে চাল ভরে। ধান লালচে রঙ হওয়ার আগেই বাবুই পাখি ১১টি জাতের ধান সম্পূর্ণ খেয়ে ফেলে। ফলে এসব জাতের বীজ সংরক্ষণ করা নিয়ে কৃষকরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। পাখিতে খেয়ে ফেলা ধানের জাতগুলোর বীজ সংরক্ষণের জন্য কৃষকরা আক্রান্ত গাছগুলো সংরক্ষণ করছেন, যাতে ঐসব জাতের নাড়া থেকে পুনরায় ধানের গেজ বের হয়ে শীষ বের হতে পারে। দ্বিতীয়বার ধানের শীষ বের হলে সেখান থেকে জাতগুলোর বীজ কিছুটা হলেও রক্ষা করা যাবে এবং জাতগুলো হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে।

আমন মৌসুমে অনেক উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে গোল আলু ও সরিষা চাষ করার জন্য কৃষকরা আগাম আমন মৌসুমের ধানের জাত চাষ করার জন্য আগ্রহী হয়। কিন্তু পাখির আক্রমণের ফলে কৃষকরা আগাম জাতের ধান চাষ করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যে ১১টি জাতের ধান (উঝ-০৯, ঋ-০৪, চইই-৪০১, মুরাবাজাল, চাপশাইল, মালা, চরবলেশ্বর, লাফাইয়া, ব্রি-৭৬, আসামবিন্নি, সকালমূখী) পাখিতে খেয়ে ফেলেছে সেজাতগুলো চাষ করতে পারলে কৃষকরা আগাম গোল আলু ও সরিষা চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবেন। তাই এইসব আগাম ধান জাত চাষ করতে হলে কৃষকদের সকলকে (উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমির মালিক) আগাম ধানের চাষ করতে হবে, যাবে শুধুমাত্র একজন কৃষকের ধানের জমিতে পাখির আক্রমণ না হয়। সকলে আগাম ধান চাষ করলে পাখি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা কম হবে এবং কৃষকরা আগাম গোল আলু ও সরিষা চাষ করতে পারবেন। ফলে ফসলের জাত বৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।

IMG_20171024_141441-W600
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং কৃষি প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় পাখির গুরুত্ব অপরিসীম। তাই কৃষকের উৎপাদিত ফসল যেমন সুরক্ষিত করতে হবে তেমনি পরিবেশ ও কৃষকের বন্ধু পাখি বৈচিত্র্যও সংরক্ষণ করতে হবে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে উৎপাদিত ফসল রক্ষা এবং একই জমিতে শস্য পর্যায় অনুসরণ করে একাধিক ফসল ফলাতে হলে কৃষকদেরকে আগাম ধান জাত চাষ করতে হবে। এক্ষেত্রে একটি এলাকায় শুধুমাত্র একজন/দু’জন কৃষক আউশ ধান বা আগাম আমন ধানের জাত চাষ করলে হবেনা। শুধুমাত্র এক/দু’জন কৃষক আউশ ধান বা আমন মৌসুমে আগাম জাতের ধান চাষ করলে একটি এলাকার সমস্ত পাখি ঐ কৃষকের ধানের জমিতে হামলে পড়ে, ফলে কৃষকটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এলাকার অনেক কৃষক আউশ মৌসুমে ধান এবং আমন মৌসুমে আগাম ধান চাষ করলে পাখিতে খেয়ে ধান নষ্ট হবার হার কমবে। আউশ মৌসুমে বা আমন মৌসুমে কৃষকরা ব্যাপক হারে আগাম জাতের ধান চাষ করলে সবগুলো জমিতেই পাখির আক্রমণ হবে (ছোট ছোট জমিতে আউশ/আগাম ধান না করে) তবে কৃষকরা এককভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেনা এবং কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে আউশ মৌসুমে কৃষকদের জমি পতিত থাকবেনা এবং কৃষকরা বাড়তি ফসল ঘরে তুলতে পারবেন। অন্যদিকে পাখি বৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং কৃষি প্রাণবৈচিত্র্য বৃদ্ধি ও পরিবেশ সংরক্ষিত হবে। প্রতিদান হিসেবে পাখি ফসলের জমির ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ সাশ্রয়ে অবদান রাখবে। আগাম ধান কেটে কৃষকরা সেই জমিতে আগাম গোল আলু ও সরিষা চাষ করতে পারবে। ফলে ফসলের জাত বৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আর এজন্য কৃষকদের আউশ ধান ও আগাম জাতের ধান চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে হবে সরকারি কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্মরত এনজিওদের।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: