Posted in

বেইজিং হাঁসের সাথে ফ্রি মাছ চাষ করে সফল হলেন হিরো

চাটমোহর, পাবনা থেকে ইকবাল কবীর রনজু

চীনের রাজধানী বেইজিং এর নামানুসারে এশিয়ায় এ হাঁসগুলো বেইজিং ডাক নামেই পরিচিত। তবে এশিয়ার বাইরে এ হাঁসগুলো পেকিং ডাক নামে পরিচিত। আমাদের দেশের আবহাওয়া এ হাঁস পালনের অনুকূলে থাকায় খামারীরা তাদের খামারে চায়না প্রজাতির এ হাঁস পালন শুরু করেছেন এবং সফলতা পাচ্ছেন। লাভজনক হওয়ায় এর পরিধি দিনকে দিন বাড়ছে। পাবনার চাটমোহরের আড়িংগাইল গ্রামের উদ্যোক্তা হিরো নিজ গ্রামে তিন একর পুকুরের পারে বেইজিং জাতের হাঁস পালন করছেন। পুকুরের পানির উপরে আংশিক জায়গায় বাঁশের মাচা। হাঁসগুলো পুকুর পাড়ে ও বাঁশের মাচার উপর খাবার খায়। খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ পুকুরের পানিতে পরে। হাঁসের মলও পরে পুকুরে। পানিতে একই সাথে সাঁতরে বেড়ায় হাঁস ও মাছ। হাসের বিষ্ঠা পুকুরে পরায় এবং তা মাছের খাদ্য হওয়ায় মাছকে পৃথক কোন খাবার দেয়ার প্রয়োজন হয় না। এভাবে হাঁসের পাশাপাশি ফ্রি মাছ চাষ করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। প্রথম দিকে অনেকে বিদ্রুপ করলেও এখন তারাই হিরোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

baijing hash-3

পাবনার চাটমোহরের আড়িংগাইল গ্রামের তাইজুল ইসলামের ছেলে হিরোর পুরো নাম আবু বিন হিরো। বেইজিং হাঁস পালন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “২০০৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এম কম পাশ করে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকুরী শুরু করি। চাকুরি রত অবস্থায় ষ্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ পাশ করি। ২০০৮ সালে স্বস্ত্রীক থাইল্যান্ড সফর কালে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার জুয়েলের ব্যাংককের হোটেলে খেতে গিয়ে প্রথম বেইজিং হাঁসের মাংস খাই। মাংস স্বুস্বাদু হওয়ায় বেইজিং হাঁস সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হলে পরদিন জুয়েল ব্যাংককের একটি বেইজিং হাঁসের খামার পরিদর্শনে নিয়ে যায়। মূলত সেখান থেকেই এ হাঁস পালনের চিন্তা আমার মাথায় আসে।” তিনি আরও বলেন, “দেশে ফিরে কয়েক বছর পর প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আব্দুল হামিদের তত্বাবধানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে ১শ’ ৮০টি এক দিনের বেইজিং হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহ করে হ্যাচারী করি। বাড়তে থাকে খামারের হাঁসের সংখ্যা। নতুন শেড করি। বর্তমান আমার ইউনিড্স এগ্রো খামারে এক হাজারের বেশি হাঁস রয়েছে। প্রতিদিন ৭শ’ থেকে ৮শ’ ডিম পাচ্ছি।” তিনি বলেন, “তুষ পদ্ধতিতে হারিকেনের আলোর উত্তাপে প্রতি পাঁচ দিন পর পর দুই হাজার করে বাচ্চা পাচ্ছি। মাসে প্রায় ১০ হাজার বাচ্চা উৎপাদন করছি। প্রতিটি এক দিনের বাচ্চা পাইকারী ৭০ টাকা ও খুচরা ৮০ টাকায় বিক্রি করছি। মাসে প্রায় সাত লাখ টাকার বাচ্চা বিক্রি করছি। এ ছাড়া যে ডিমগুলো থেকে বাচ্চা উৎপাদন সম্ভব নয় সেগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছি। হাঁস পালন শুরু করার পূর্বে পুকুর লীজ দিয়ে বছরে তিন লাখ টাকা পেতাম। এখন সে পুকুরে রুই কাতলা তেলাপিয়া পাঙ্গাস মৃগেল পুটি মাছ চাষ করে বছরে অন্তত ছয় লাখ টাকার মাছ পাচ্ছি।”

baijing hash-1

একই সাথে হাঁস ও মাছ চাষ করে হিরো কেবল নিজে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন এমনটা নয়। হিরোর খামারে দুইজন হ্যাচারী টেকনিশিয়ানসহ ছয় জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। তারাও অর্থনৈতিকভাবে সফলতা পাচ্ছেন। পাশাপাশি যারা বেইজিং হাঁসের খামার করছেন তারাও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

হিরো বলেন, “বেইজিং হাঁস মাংসের জন্য প্রসিদ্ধ। দেশী হাঁসের তুলনায় এর মাংস বেশি স্বুসাদু। মাংসে কোলষ্টোরেলের পরিমাণ কম। তিন মাসে হাঁস গুলোর গড় ওজন প্রায় ৫ কেজি পর্যন্ত হয়। খাবার বেশ কম লাগে। পূর্ণবয়ষ্ক হাঁস ৯০ থেকে ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত ডিম দেয়। আঠারো মাস ডিম দেয়। চার মাস বয়স থেকে এ হাঁসগুলো ডিম দিতে সক্ষম হলেও ৬ মাস বয়স থেকে ডিম সংগ্রহ করা উত্তম। খাবার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেরীতে ডিম নেওয়া সম্ভব। বাণিজ্যিকভাবে এ হাঁস পালনে সফল হওয়া সম্ভব। আমিষের আন্তর্জাতিক বাজারে বেইজিং হাঁসের মাংসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমান এ হাঁসের মাংস ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে যাচ্ছে। প্যাক প্যাক বিরিয়ানী, গ্রীল ও কালোভুনা এ তিন রেসিপি ইতিমধ্যে চালু হয়ে গেছে। মালদ্বীপে স্যাম্পল পাঠিয়েছি। সব কিছু ঠিক ঠাক থাকলে আশা করছি এ মাংস বিদেশে রফতানী করতে পারবো।”

গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁসের সাধারণত প্লেগ ও কলেরা রোগ হয়। বাচ্চার ২৫ দিন বয়সে এক ডোজ এবং ৪০ দিন বয়সে আরেক ডোজ টিকা দিতে হয়। রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রাথমিকভাবে এ্যান্টিবায়োটিক ও ভিটামিন জাতীয় ওষুধ খাওয়ানো হয়। আবদ্ধ পদ্ধতি, আবদ্ধ ও আংশিক খোলা পদ্ধতি এবং উন্মুক্ত পদ্ধতিতে এ হাঁস পালন করা সম্ভব। আমাদের দেশী হাঁসের মতো প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পালন করলে সেটি বেশি লাভজনক হয়। প্রথম এক মাস লেয়ার ফিড খাওয়াতে হয় এর পর খাল বিল নদী নালা জলাশয়ে যে স্থান গুলোতে শামুক ঝিনুক আগাছা লতাপাতা কচুরিপানা শেওলা যুক্ত সে স্থানগুলোতে প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ানো ভালো।

IMG_20180616_114021

উচ্চশিক্ষিত এ উদ্যোক্তার হাঁস পালন করা দেখে এবং আর্থিকভাবে লাভবান হতে দেখে এলাকার অনেকেই উৎসাহিত হয়ে এ প্রজাতির হাঁস পালন শুরু করছেন। পোলট্রি শিল্পে বেইজিং হাস পালন খুলে দিতে পারে অপার সম্ভাবনার দুয়ার। মাংস তথা আমিষের চাহিদা পূরণ, বেকারত্ব দূরীকরণে বেইজিং হাস পালন ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন সফল এ উদ্যোক্তা। বর্তমানে ব্যবসার সাথে জড়িত আবু বিন হিরো ২০০৮ সালে ওয়াহিদা সুলতানার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ঢাকায় বসবাস করেন। ওয়াহিদা সুলতানা একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মরত আছেন। স্ত্রী বেইজিং হাঁস পালনে প্রতিনিয়ত উৎসাহ যোগান বলে জানান আবু বিন হিরো।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.