Posted in

বৈচিত্র্যময় কৃষিকাজে জহুরা আক্তারের প্রচেষ্টা

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়
একজন মানুষের জীবনধারণের জন্য সকল ধরণের খাদ্যের প্রয়োজন। এই খাবার তাঁকে বৃদ্ধি পেতে, সুস্থ থাকতে সহায়তা করে। একজন মানুষ তখনই সুস্থ থাকে যখন তাঁর খাবারে সঠিক পুষ্টিগুণ বজায় থাকে। প্যাকেটজাত খাবার অথবা বাজারের বিভিন্ন লোভনীয় খাবারে মন বা পেট ভরলেও শরীরের কোনো উপকার হয়না। তাই একজন কৃষক সবসময়ই চেষ্টা করেন নিজের হাতে পুষ্টির সমস্ত উপকরণ তৈরি করতে। তেমনই একজন কৃষক জহুরা আক্তার। তিনি লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামে বসবাস করেন।
২০২০ সালের শুরুর দিকে তিনি নিজের বাড়ির আঙিনায় কৃষিকাজ শুরু করেন। তাঁর আলাদাভাবে চাষের জমি নেই। তাই সব্জি চাষের জন্য আঙিনাই ভরসা। প্রথমদিকে তিনি পুঁইশাক, চালকুমড়া, দেশিলাউ ইত্যাদির বীজ যোগার করে রোপণ করেন। গোবর ব্যবহার করে জমি প্রস্তুত করেন। সেই থেকে শুরু।


বৈচিত্র্যময় সব্জি চাষ
তাঁর বাড়িতে রয়েছে বিভিন্ন ফলজ গাছ। পেঁপে, লিচু, আম, কাঁঠালসহ অনেক গাছ। প্রতিবছরই তিনি বিভিন্ন ফলজ ও ঔষধি গাছে চারা রোপণ করেন। চলতি বছর তিনি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে পেঁয়াজ, রসুন, লতিকচু, পুঁইশাক ও ঝিঙ্গা চাষ করেছেন। এই কাজে তাঁর স্বামী সহযোগিতা করেছেন। প্রত্যেক মৌসুমে তাঁর বাড়ির আঙিনায় সব্জির সমারোহ থাকে। বারোমাসি মরিচ, বেগুন, লেবু এবং আদা, হলুদ নিজেই চাষ করেন। স্থানীয় এবং বৈচিত্র্যময় সব্জি চাষের জন্য জহুরা আক্তার সকলের কাছে পরিচিত। তিনি এখন সব ধরণের বীজ নিজে সংরক্ষণ করেন। কয়েকবছর আগেও তাঁর কাছে তেমন কোনো বীজ ছিলনা। বর্তমানে তিনি বাড়িতে ৫ ধরণের শিম, মিষ্টিকুমড়া, দেশিলাউ, ডাটা, মূলা, দুই ধরণের আলু, মরিচ, চুকাই, বাঙ্গি, হলুদ, পেঁয়াজ, রসুন, বউত্তাশাক, পুঁইশাক, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, করলা, শশা, কাঁকরোল, আদা, হলুদ ইত্যাদি চাষ করেন।

প্রাণিসম্পদ পালনে উদ্যোগি
২০২১ সালে নদীর চরে তাঁর স্বামী সরিষা চাষ করেন। ফলন ভালো হয়্ বীজ সংরক্ষণ করে বাকি সরিষা তিনি বিক্রি করেন। সরিষা বিক্রি ও অন্যান্য সব্জি বিক্রির জমানো টাকা দিয়ে তিনি গরু, হাঁস কেনেন। এখন তাঁর মোট ৬টি গরু আছে। সারাবছর গরুর দুধ খাবার হিসেবে ব্যবহার করেন। হাঁস আছে ১৪টি ও মুরগি ১৯টি। এগুলোর ডিম তিনি কখনোই বিক্রি করেন না। নিজেরা খেয়ে থাকেন। তাছাড়া কিছু ডিম দিয়ে বাচ্চা ফোটান।

জৈব সারের ব্যবহার
৬টি গরুর প্রতিদিনের গোবর তিনি সংরক্ষণ করেন। সেই গোবর তিনি সব্জি চাষের জায়গায় ব্যবহার করেন। গোবর ছাড়া হাঁস, মুরগির বিষ্ঠাও তিনি সব্জি চাষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন। এছাড়া চুলার বাসি ছাই পোকামাকড় তাড়ানোর জন্য ব্যবহার করেন।

প্রতি ইঞ্চি জায়গার সুষ্ঠ্যু ব্যবহার
পুকুরের চারিদিকে তিনি মাচা বেঁধে দিয়েছেন। সেই মাচায় সময়োপযোগি বিভিন্ন সব্জি চাষ করেন। মাচার নিচের দিকে ডাটা, চুকাই ইত্যাদির বীজ বপন করেন। তাছাড়া উঠানের মাঝের জায়গাটুকু বাদ দিয়ে এর চারপাশে বিভিন্ন সব্জিও চাষ করেন। ঘরের চারপাশে রোপণ করেছেন বারোমাসি পেঁপে, বেগুন ও মরিচের গাছ।

বাজার নির্ভরশীলতা কমানো
বারসিক থেকে তাঁকে সরিষা, শিম, মিষ্টিকুমড়া, ডাটা, বউত্তাশাক ইত্যাদি বীজ দিয়ে সহযোগিতা করা হয়। নিজের সংরক্ষিত বীজ এবং সহযোগিতা প্রাপ্ত বীজ দিয়ে তিনি চাষাবাদের পরিমাণ বৃদ্ধি করেন। কোনো ধরণের সব্জি বা মাছ, মাংসের জন্য বাজারের উপর নির্ভরশীল নয়। নিজের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি সব্জি তিনি বিক্রি করেন। এখন তিনি প্রতিবেশি ও আত্মীয়দের মাঝে নানা ধরণের বীজ ও সব্জি বিতরণ করেন। বাড়ির উঠানের একপাশে একটি পুকুর আছে। সেই পুকুরে তিনি স্থানীয় জাতের মাছের চাষ করেন। যে মাছ দিয়ে তিনি সারাবছরের পরিবারের চাহিদা পূরণ করেন।

একজন কৃষক নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে এবং পরিকল্পনামাফিক কৃষিকাজ করেন। সেই কাজের মাধ্যমে যা উৎপাদিত হয় তা দিয়ে পরিবারের চাহিদা পূরণ করেন। যুগ যুগ ধরে এভাবেই এগিয়ে চলেছে আমাদের কৃষি ও কৃষকের জীবন। বৈচিত্র্যময় কৃষিই টিকিয়ে রেখেছেন আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.