সাম্প্রতিক পোস্ট

সংস্কৃতি ও উৎসব সকল বাঙালির

নেত্রকোনা থেকে রোখসানা রুমি

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যতা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে মানুষ তাদের পুরনো ঐতিহ্যগুলোকে প্রায় ভুলতে বসেছে। যুব সমাজ আসক্ত হয়ে পড়ছে অপসংস্কৃতি ও মাদকে। মানুষের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়, যৌতুক, বাল্যবিবাহ ও ইভটিজিং মহামারী আকার ধারণ করেছে। পারস্পারিক সহযোগিতা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করছে। এ থেকে সমাজকে রক্ষায় জন্য এগিয়ে আসতে হবে সকল স্তরের শ্রেণী পেশার মানুষকে।
20161219_152409 (2)-W600
সমাজে বিভিন্ন শ্রেণী, বয়স ও পেশার মানুষের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক, বিশ্বাস ও সহভাগিতার বন্ধান সুদৃঢ় করার লক্ষ্য নিয়েই সম্প্রতি প্রকৃতিনির্ভর জীবন সংস্কৃতির ঐতিহ্য প্রদর্শন, গ্রামের মানুষের পারস্পারিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও পারস্পারিক আন্তঃনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেত্রকোনা সদর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের নরেন্দ্রনগর গ্রামের কিশোরীদের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ এ আয়োজন করা হয়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর ও পেশার মানুষ, যুবক, কিশোর-কিশোরী, প্রবীণ, স্থানীয় সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিসহ প্রায় ১০০ জন ব্যক্তি বৈশাখী উৎসবে অংশগ্রহণ করে সকলের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করেন। দিনব্যাপী বিভিন্ন ধরণের গ্রামীণ অনুষ্ঠান ও আয়োজন ছিল উৎসবের প্রধান আকর্ষণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মেহেদী উৎসব, আলপনা অংকন, চেয়ার দখল খেলা, বধুর কপালে টিপ পড়ানো, ঝুড়িতে বল নিক্ষেপ, একক ও দলীয় অভিনয়, নাচ ও গান ইত্যাদি। এছাড়াও ছিল স্থানীয় নিরাপদ খাবারের প্রদর্শনী।

গ্রামের যুবকরা নাটকের মধ্যমে বাঙালির গ্রামীণ সংস্কৃতির গুরুত্ব সকলের নিকট তুলে ধরে। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি বিকৃত না করে সঠিক সাংস্কৃতিক চর্চার জন্যও নাটক থেকে সকলকে আহবান জানানো হয়। নাটকের মাধ্যমে তারা প্রতিটি পরিবার ও সমাজে সংস্কৃতি চর্চার প্রতি গুরুত্বারোপ করে।

নারীরা গ্রামের আশপাশে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত শাক-সবজির গুরুত্ব এবং বাঙালি সংস্কৃতিতে এসব সবজির  অবস্থান, মানুষের সুস্থ্যতার সাথে এসবের সম্পর্ক তুলে ধরেন। পান্তা ভাত, পাটশাক, গিমাই শাক, খেতাবুড়ি শাক, নিমপাতা শাক, চেপাশুটকী র্ভতা, বেগুন র্ভতা, শুটকি ভর্তাসহ মোট ১৪ ধরণের খাবার অনুষ্ঠানে প্রদর্শন করে এবং সকলকে পরিবেশন করেন।
20170414_103452-W600
কিশোরীরা বাঙালির বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন ধরনের চর্ম রোগ থেকে রক্ষায় মেহেদী গাছের গুরুত্ব ও  সম্পৃক্ততা তুলে ধরেন মেহেদী উৎসবের মাধ্যমে। যুব, কিশোর-কিশোরী, প্রবীণ ও শিশুরা প্রত্যেকে হাতে মেহেদী পড়ে, গালে আল্পনা এঁকে মহানন্দে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করেন।

একজন কিশোরী সাংবাদিক সেজে একক অভিনয়ের মাধ্যমে বৈশাখী উৎসবের গুরুত্ব সকলের সামনে তুলে ধরেন। গ্রামীণ খেলাধূলা শেষে এক সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আলোচনা অনুষ্ঠানে গ্রামের প্রবীণ নারী ও পুরুষরা পূর্বে গ্রামীণ বৈশাখী উৎসবের অভিজ্ঞতা বর্তমান প্রজম্মের সাথে সহভাগিতা করেন।

আনুষ্ঠানের অনুভূতি প্রকাশ করে গ্রামের ষাটোর্ধ প্রবীণ নজরুল ইসলাম বলেন, “গ্রামীণ খেলাধূলা কমে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ও সহযোগিতার জায়গাটা একেবারেই কইম্যা গেছে, আনন্দ অহন মোবাইলে করে, মানুষ অহন এক হানে বইসা আড্ডা দেয়না। চা দোকানে ভিসিডি চালায়, সেখানে সকল বয়সের মানুষ এক সঙ্গে বইস্যা অনুষ্ঠান দেখার মতো না। যে সব অনুষ্ঠান হয় হেইড্যায় শিকনের মত কিছু নাই। সকল বয়সের মানুষ এক সাথে বসে আজকে অনুষ্ঠান উপভোগ করাতে আমার খুব ভাল লাগছে।”
আরেক প্রবীণ কৃষাণী রেসোনা বেগম বলেন, “অনুষ্ঠানটি করাতে নিজেদের মধ্যে মিল মহবত বাড়বো। এতে সমাজে কোন অত্যাচার অনাচার মাথা ছাড়া দিয়া উঠতে পারবো 20170414_132046-W600না। আমাদের মতো হগল গেরামের মানুষ যদি এই ধরণের অনুষ্ঠান করতো তাইলে মানুষে মানুষে মিল তৈরি অইবো। বিপদে-আপদে একজন আরেক জনের পাশে দাঁড়াইব। গেরামে শান্তি থাকব।”

ধর্ম ও বিশ্বাস যার যার, কিন্তু সংস্কৃতি ও উৎসব সকল বাঙালির। আর উৎসবের মাধ্যমেই পরিণত হয় সকল মানুষের মিলনমেলার। উৎসব যেমন একটি এলাকার সকল মানুষকে একত্রিত করে, তেমনটি উৎসবের মাধ্যমেই পরষ্পরের সাথে মানুষের দেখা, পরিচিতি ও সম্পর্ক তৈরি হয়। আর তারই ধারাবাহিকতায় মানুষের মধ্যে পারস্পারিক নির্ভরশীলতা ও আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধি পায়, তৈরি হয় পরস্পারিক বিনিময় ও সহযোগিতা। যার মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষ বিভিন্ন বিপদ-আপদ সহজেই মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়।

কিন্তু আধুনিক এই সমাজে সংস্কৃতি চর্চা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে প্রচলিত উৎসবগুলো বিলুপ্তির পথে। বর্তমান প্রজন্ম পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতির প্রতি আসক্ত হয়ে নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যা বর্তমান প্রজম্মকে বিভিন্ন ধরণের অসামাজিক ও রাষ্ট্র বিরোধী কার্যকলাপের দিকে ধাবিত করছে। তাই নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং প্রতিটি পরিবার ও গ্রাম পর্যায়ে সংস্কৃতির চর্চা ও উৎসব আয়োজন করে সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: