সাম্প্রতিক পোস্ট

স্বপ্ন ছিল মানুষকে ভালো কিছু খাইয়ে মানুষের মনে ভালো মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা

স্বপ্ন ছিল মানুষকে ভালো কিছু খাইয়ে মানুষের মনে ভালো মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা

মানিকগঞ্জ থেকে থেকে পংকজ পাল

মিষ্টি! মানুষের খাদ্য তালিকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের সকল কাজের সাথেই জড়িত ‘মিষ্টি’ নামক দ্রব্যটি। একটি শিশুর জন্ম হওয়ার খুশিতে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীকে মিষ্টি খাওয়ান, শিশুর ‘মুখেভাত’ অনুষ্ঠানে এবং ‘হাতেখড়িতে’-মিষ্টি, ভালো রেজাল্টে- মিষ্টি, চাকরি জীবনে প্রবেশ-মিষ্টি, বিয়ে অনুষ্ঠান-মিষ্টি, শেষ পর্যন্ত কালের আবর্তনে শেষ কৃত্যানুষ্ঠান- সেখানেও মিষ্টি প্রয়োজন। গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায় সমগ্র জীবন চক্রেই মিষ্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে। এর মধ্যে যদি এলাকাভিত্তিক বিখ্যাত মিষ্টি থেকে থাকে তাহলে তো কথাই নেই। যেমনঃ নাটোরের কাঁচাগোল্লা, কুমিল্লার রসমালাই, টাংগাইলের চমচম, মানিকগঞ্জের পাগলার মিষ্টি, তেরশ্রীর নিজামের মাওয়া মিষ্টি। এই স্থান বিশেষে বিখ্যাত মিষ্টি একটি জনপদ ছাপিয়ে স্থান-কালের পরিক্রমায় জন মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলাধীন তেরশ্রী গ্রাম তার প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতির জন্য প্রাচীন কাল থেকেই বিখ্যাত ছিল। দেশ-বিদেশের বহু মনীষীর সংস্পর্শে এ জনপদ আরো বেশি সমৃদ্ধ হয়েছিল। সেই তেরশ্রী শিক্ষা-সংস্কৃতির পাশাপাশি আরেকটা কারণে বিখ্যাত তা হলো “নিজামের মিষ্টি”। মানিকগঞ্জ জেলার আশেপাশে জেলা ছাড়াও বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন মহলে এই মিষ্টি অত্যন্ত সুপরিচিত। মিষ্টির কারণেই তেরশ্রী সকলের মাঝেই একটি পরিচিত গ্রাম।

শুরুর কথা
নিজাম সুইটস এর স্বত্বাধিকারী নিজাম উদ্দিন এর বর্তমান বয়স ৮৪ বছর। ঘিওর উপজেলার পয়লা গ্রামের সামসুদ্দিন ও রাবেয়া খাতুনের অতি আদরের সন্তান ছিলেন। কিন্তু, বেশি লেখাপড়া না জানায় যৌবনে জীবিকার জন্য একটি চায়ের দোকান দেন তেরশ্রীতে। চায়ের দোকান বলতে এখনকার মত এত রমরমা ছিল না। খুব কম লোক চা পান করতেন। নিজাম উদ্দিন ছিলেন স্বাধীনচেতা ও প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী। তেরশ্রী কলেজের শিক্ষকগণ তাকে ভালোবাসতেন, চা-পানের জন্য তার দোকানে আসতেন। কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মিষ্টির প্রয়োজন হতো। তখন তেরশ্রীতে মিষ্টির দোকান ছিল না। ঘিওর থেকে মিষ্টি আনতে হতো। একটা অনুষ্ঠানে কলেজের শিক্ষকগণ তাকে ঘিওর থেকে মিষ্টি আনতে বলেন। মিষ্টি সংরক্ষণের ভালো ব্যবস্থা না থাকায় সেই মিষ্টি নষ্ট হয়ে যায় এবং তা অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা যায় না। হতাশাগ্রস্ত শিক্ষকগণ নিজাম উদ্দিনের দোকানে এসে চা পান করার সময় বলেন, “নিজামও তো পারে মিষ্টি তৈরি করতে। কথাটা তার পছন্দ হয়। এর কিছুদিন পর তিনি রসালো (ভেজা) মিষ্টি তৈরি করে প্রিন্সিপালসহ অন্যান্য শিক্ষকদের খাওয়ান। মিষ্টি খেয়ে সকলেই খুব প্রশংসা করেন তাঁর। এতে তার অনুপ্রেরণা বেড়ে যায়। তিনি আরো ভালো করে মিষ্টি বানানোর জন্য কাঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন এবং সাফল্য লাভ করেন কয়েক বছর এভাবেই চলতে থাকে।
3-1
এরপরের ঘটনা অন্যরকম। নিজাম উদ্দিন চা তৈরির জন্য দুধ কিনে জাল করার জন্য কড়াইতে রেখেছিলেন চুলাতে। কাস্টমার বেশি না আসাতে, বেশির ভাগ দুধ ছিল পাত্রে। জ্বাল জ্বলতেই ছিল, একটা পর্যায়ে তিনি সমস্ত দুধ জাল দিয়ে, সেগুলো গুড়া করেন। এগুলো দিয়ে কি করা যায়? অনেক ভাবনার পর তিনি ভেজা (রসযুক্ত) মিষ্টির চারিদিকে দুধের গুড়া লাগিয়ে দেন। এক ধরনের প্রলেপ তৈরি হয়, মিষ্টি দেখতে সুন্দর ও বড় হয়। তিনি তৎক্ষণাৎ কিছু মিষ্টি নিয়ে প্রিন্সিপাল ও অন্যান্য শিক্ষকদের খাওয়ান। ওই মিষ্টি খেয়ে তাঁরা নিজামের অনেক প্রশংসা করেন। তাদের ভাষ্য হলো এরকম, “জীবনের এ পর্যন্ত খাওয়া সেরা ও সুস্বাদু মিষ্টি এইমাত্র খেলাম।” পরবর্তীতে সবাই এ মিষ্টিই তৈরি করতে বলেন। প্রিন্সিপালের সাথে আলোচনা করে এ মিষ্টির নামকরণ করেন “মাওয়া মিষ্টি” যা শুকনা মিষ্টি নামে পরিচিত।

বিকাশ
‘মাওয়া মিষ্টি’ তৈরির পর নিজাম উদ্দিনকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে তার মিষ্টির সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মিষ্টির চাহিদা বাড়তে থাকে। তার মিষ্টির সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মিষ্টির চাহিদা বাড়তে থাকে। তার সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরে আসে। সন্তানদের স্কুলে লেখাপড়া শিখাতে শুরু করেন। নিজেই সাবলম্বী হয়ে উঠেন। বর্তমানে নিজাম সুইটস এর তিনটি শাখা। প্রধান শাখা ও কারখানা তেরশ্রীতে। দ্বিতীয় শাখা ঘিওর পঞ্চ রাস্তার মোড়ে এবং তৃতীয় শাখা খালপাড়, মানিকগঞ্জ। মিষ্টি তৈরির জন্য তেরশ্রী বাজার থেকে সেরা ও বাছাইকৃত দুধ সংগ্রহ করেন। এর জন্য বাজার মূল্য থেকে দুগ্ধ উৎপাদনকারীদের বেশি মূল্য ও পরিশোধ করেন তিনি। নিজাম মিষ্টি তৈরির জন্য প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ মণ দুধ ক্রয় করেন। দুধের ক্রয়মূল্য ৫০-৫৫ টাকা। দুধ গড়ে ৩-৪ ঘণ্টা জ্বাল দেওয়ার পর ‘মাওয়া’ মিষ্টি তৈরি করা হয়।
বর্তমানে ‘মাওয়া’ মিষ্টির পাশাপাশি-মিনিকেট (মিনিকেট চালের মত দেখতে এবং ক্ষুদ্রাকৃতির বিধায় এই নামকরণ করা হয়), শাহী চমচম, রসমালাই, ঘি, দই, মালাই চপ, আফলাতুন ছানা, সন্দেশ (দুধ ও ঘি সমন্বয়ে), চকলেটসহ নানা ধরনের মিষ্টি তৈরি করা হয়। তবে ‘মাওয়া’ মিষ্টিই বেশি চলে।
4
বাধা
প্রতিযোগিতার যুগে অন্যান্য দোকানিরা কম দামে মিষ্টি বিক্রয় করেন। কিন্তু এখানে গুণগত মান ধরে রাখার কারণে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায়, মিষ্টির বাজারমূল্যও বেশি নির্ধারণ করা হয়, যা অনেকের নিকট বেশি দাম বলে মনে হয়। দাম কমানেরা জন্য অনুরোধ আসে, কিন্তু সম্ভব হয় না। ঈর্ষান্বিত হয়ে অনেকে বিরুদ্ধাচারণ করেন।
এই প্রসঙ্গে নিজাম উদ্দিনের বলেন, “আমি এখন ঐভাবে সময় দিতে পারি না। আমার ছেলেরা এখন মিষ্টি তৈরি করে। ওরা ব্যবসার আরো প্রসার ঘটিয়েছে। আমার স্বপ্ন ছিল ভালো জিনিস দিয়ে ভালো মিষ্টি তৈরি করে, মানুষকে ভালো কিছু খাওয়ানো।” তিনি আরও বলেন, “এর মাধ্যমেই মানুষের মনে আমি ভালো মানুষ হিসেবে থাকতে চেয়েছি। আমার স্বপ্ন স্বার্থক। আমাদের মিষ্টিতে ক্ষতিকর কোন কিছুই আমরা ব্যবহার করি না। মিষ্টি তৈরিটাও আমাদের নিজস্ব। এই মিষ্টির সাথে তেরশ্রীর সুনামও জড়িত রয়েছে, সকলেই মিলে যেন এই ঐতিহ্য ধরে রাখে।”

কর্মসংস্থান
তিনটি শাখায় প্রায় ২০ জন লোক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মাসিক বেতনের মাধ্যমে এ সমস্ত লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। অনেকেই বেকারত্ব থেকে মুক্ত হয়েছেন, পারিবারিকভাবেও এসেছে স্বচ্ছলতা। মিষ্টি তৈরি এবং বাজারজাতকরণসহ এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হওয়ায় জড়িতরাও আনন্দিত।
2-2
দরদাম
মাওয়া (শুকনা)- প্রতি কেজি- ২৮০ টাকা, ভেজা- প্রতি কেজি ১৮০ টাকা, মিনিকেট- প্রতি কেজি ৩০০ টাকা, শাহী চম চম- প্রতি কেজি ৪০০ টাকা, মালাই চপ- প্রতি কেজি ৪২০ টাকা, সন্দেশ- প্রতিকেজি ৬০০ টাকা, ঘি- প্রতিকেজি ৮০০ টাকা।

কল্যাণমুখী কাজের সাথে সম্পৃক্ততা
ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের কল্যাণমুখী কাজ করার ইচ্ছা আছে ব্যবসার লভ্যাংশ থেকে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ব্যয় ভার বহন এবং মেধাবীদের অনুপ্রাণিত করতে আর্থিক সহযোগিতা করার পরিকল্পনা ভবিষ্যতে রয়েছে নিজাম উদ্দিনের। বর্তমানে নিজাম উদ্দিনের খালু হযরত শাহ কছিম উদ্দিন আহমেদ ওয়ায়েসী সাহেবের মৃত্যু বার্ষিকীতে ওরস করা হয় ব্যবসার লভ্যাংশ হতে। শাহ কছিম উদ্দিন আহমেদ জ্ঞান তাপস ও ধার্মিক ব্যক্তি হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি অনেক ধর্মীয় গ্রন্থ রচনা করেছেন।

নিজামের মিষ্টি নানাজনের মতামত
নিজামের মিষ্টি অনেকে খেয়েছেন। প্রশংসা করেছেন এবং এ ধরনের মিষ্টি আরও  বেশি করে তৈরির অনুরোধ আসে। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক প্রফুল্ল্য কুমার খান বলেন, “তেরশ্রীর মিষ্টি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। এটা পূজা পার্বন, ঈদ, নববর্ষসহ সকল উৎসবের সাথে জড়িত। এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাড়িয়েছে।” স্কুল শিক্ষক এন.কে. দাস নয়ন বলেন, “পাকিস্তান আমল থেকে তেরশ্রীর এই মিষ্টি দেশে এবং দেশের বাইরেও সুনামের সাথে আসছে এবং দিন দিন আরও প্রসার ঘটছে। এটা আমাদের গৌরবের ব্যাপার।” কৃষক দুর্জন কাজী বলেন, “এই মিষ্টির অনেক নাম আছে। আমরা খাইয়া তৃপ্তি পাই। আত্মীয়-স্বজনরাও এই নিয়া যাইবার কয়। আবার এইখানে বেরাইতে আসলেও এই মিষ্টি খায়।” শিক্ষার্থী নোবেল হাসান নিপুন বলেন, “তেরশ্রীর মিষ্টি আমাদের এলাকার একটি ঐতিহ্য। এই মিষ্টি আমাদের এলাকার মুখ উজ্জল করেছে। অনেক ভ্রমণ প্রিয়াসী আমাদের তেরশ্রী আসে তেরশ্রীর সৌন্দর্য্য দেখতে পাশাপাশি মিষ্টি খেতে।”
1-1
তেরশ্রীকে প্রতিনিধিত্ব
বর্তমানে তেরশ্রী পরিচিত মিষ্টির কারণেই। ঢাকা, মানিকগঞ্জ, টাংগাইল, গাজীপুর, রাজবাড়ি থেকেই অনেকে মিষ্টি নেন। পুলিশ সুপারের কার্যালয়, সচিবালয় এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও নিজাম সুইটস বিভিন্ন সময়ে সরবরাহ করা হয়। প্রবাসী বাঙালিরাও বিদেশ যাওয়ার সময় মিষ্টি নিয়ে যান। তেরশ্রীবাসী নিজাম সুইটস এর কারণে গর্ববোধ করেন। আবার নিজাম সুইটস এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই তেরশ্রীবাসীকে নিয়েও গর্ববোধ করেন তাদের দীর্ঘ পথচলায় পাশে থাকার জন্য। পূজা-পার্বণ, ঈদ, নববর্ষ, পরীক্ষা ফলাফলসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নিজামের মিষ্টির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কতজনের মান-অভিমান, ঝগড়া-দ্বন্দ্ব, কতজনের চাকরি-ব্যবসা এমনকি অনেকেরই বিয়ে পর্যন্ত হয়েছে এই মিষ্টির প্রভাবে তার ইয়ত্তা নেই। নিজাম সুইটস কালের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে এটা নিঃসন্দেহে তার স্বকীয়তা।

happy wheels 2
%d bloggers like this: