Posted in

তাল গাছ: বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের চিরবন্ধু

তানোর, রাজশাহী থেকে অমৃত সরকার

তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে বা ঐ দেখা যায় তাল গাছ ঐ আমাদের গাঁ।তাল গাছ নিয়ে এরকম অনেক পদ্য বা গদ্য আছে আমাদের বাংলা সাহিত্যে। বরেন্দ্র অঞ্চলের তাল গাছের কথা বলতে গেলে চোখের সামনেই ভেসে উঠে সেই উঁচু নিচু সিঁড়ির মত জমির মাঝে মাঝে বেড়ে ওঠা তাল গাছগুলোর। গ্রামঘেঁষা এসব সারি সারি তাল গাছ দেখলে আমাদের চোখ জুড়িয়ে যায়!
বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি, পানি ও আবহাওয়া বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের থেকে একেবারেই আলাদা। এখানকার মাটিতে পানি ধারণ ক্ষমতা অনেক কম এবং বছরের বড় একটি সময়ে আবহাওয়া শুষ্ক থাকে। মূলত সে কারণেই এই এলাকাটি খরাপ্রবণ। এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য খরার পরেই কালবৈশাখি ঝড় অন্যতম। এ ঝড়ের কারণে প্রতিবছরই অনেক গাছপালা ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে তাল গাছ ঝড়ে ভাঙে না! এদের শেকড় মাটির খুব গভীরে প্রোথিত বলে মাটির অনেক গভীর থেকে খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে। তাই শুকনো মাটিতেও তাল গাছ ভালো জন্মে। বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রতিকূল পরিবেশকে উপেক্ষা এই গাছটি ঝড়ের সময় মানুষসহ জানমাল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
palm-2
তাল গাছের বহুবিধ ব্যবহার
দেশের অনান্য অঞ্চলের তুলনায় বরেন্দ্র অঞ্চলে গরমের তীব্রতা অনেক বেশি। মূলত এ কারণেই এলাকাটির বেশির ভাগ বাড়ির মাটি দ্বারা তৈরি হয়। এসব বাড়ি একাধারে গরম ও জলবায়ু সহনশীল। মাটির বাড়ি তৈরিতে মূল উপাদান মাটির পরেই তালগাছের কাঠের প্রয়োজন হয়।  মাটির বাড়ির তীর, রূইয়াসহ বিভিন্ন কাজে তাল গাছ আবশ্যক। কারণ তালের কাঠে ঘুন পোকা ধরে না এবং শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। পাশাপাশি এই কাঠ ঘরের গাঁথুনিকে মজবুত করে। সঙ্গত কারণেই বরেন্দ্র অঞ্চলে তালগাছের চাহিদা ও বাজারমূল্য বেশি। এই অঞ্চলের সাপ্তাহিক হাট-বাজারগুলোতে তাল কাঠের চাহিদা ও বিক্রয় বেশি হয়। দীর্ঘ ২০ বছর তাল কাঠ বিক্রয়ের সাথে জড়িত তানোর উপজেলার উলামদহ গ্রামের মো. আরমান আলী (৪২) এই প্রসঙ্গে বলেন, “আমি তানোর উপলোর গোল্লাপাড়া, মন্ডুমালা, চৌবাড়িয়সহ বিভিন্ন হাটে তাল গাছের কাঠ বিক্রয় করি। এর চাহিদা সারাবছরই ভালো থাকে। দামও পাই বেশি। তাই লাভও ভালো হয়। কিন্তু আগের তুলনায় এই এলাকায় তালগাছ অনেক কমে গেছে।” রাস্তার পাশে এখন আর তালগাছ লাগানো হয় না বলে এই গাছের পরিমাণ কমেছে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। তালগাছ থেকে যে যে উপকরণ তৈরি হয় তাঁর মধ্য তালপাতার পাখা মানুষের বেশি ব্যবহার্য। এই কাজের সাথে জড়িত কোয়েল গ্রামের নিরেন সরেন (৪৫) বলেন, “আমি কাঁচাতাল পাতা সংগ্রহ করে তা শুখিয়ে আশেপাশের বিভিন্ন হাটে-বাজারে পাখাগুলো বিক্রয় করি এবং যখন তালের ফল ধরে তখন তা বিভিন্ন বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রয় করে আমার পরিবারের খাদ্য ও চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করি।”
palm-3
জ্বালানি হিসেবে তাল গাছ
গ্রামের মানুষ সাধারণত কোন কিছু আগুনে পুড়িয়ে রান্নাসহ অন্যান্য দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করে থাকেন। তাদের দৈনন্দিন এই রান্না কাজের জ্বালানি মূলত গোবর, খড়, কাঠ ও বাঁশ। তবে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামের উল্লেখ্যযোগ্য পরিবার রাস্তার ধারের তালগাছ থেকে তালের পাতা, ডাল সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। তাল গাছের পাতা, ডালকে জ্বালানি হিসেবে আদিবাসীরাই বেশি ব্যবহার করেন যদিওবা অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও এর ব্যবহার শুরু করেছেন। এই জ্বালানি তারা বর্ষা মৌসুমের আগেই সঞ্চয় করে রাখেন। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এমন কাজ করে যাচ্ছেন মোহর গ্রামের কৃষাণী অঞ্জলী কিস্কু (৪০) এই প্রসঙ্গে বলেন, “আমি জমিতে কাজ শেষ করে বাড়িতে যাওয়ার সময় তালপাতা, ডাল সংগ্রহ করে নিয়ে যাই যা দিয়ে রাতে এবং পরেদিন সকালে রান্ন করি। অবশিষ্ট জ্বালানিগুলো আমি সঞ্চয় করে রাখি বর্ষার সময় রান্না করার জন্য।”

খাদ্য হিসেবে তাল
তাল পাঁকা ও কাঁচা দু’ভাবেই তাল খাওয়া যায়। পাশাপাশি তালের রস শরীরের জন্য উপকারী। তালের রস দিয়ে তৈরি হয় তাল মিশ্রি যার বাজার চাহিদা বেশি। তবে অতীতের তুলনায় তালের রস দিয়ে তাল মিশ্রি তৈরির করা হলেও বর্তমানে তা অনেক কমে গেছে। তবে এখনও কিছু মানুষ রয়েছে যারা পুরনো ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য এ তাল মিশ্রি তৈরি করেন। তেমনই একজন হলেন তালন্দ উপর পারার শ্রী অতুল সূত্রধর (৫৫)। তিনি বলেন, “আগে তাল মিশ্রির জন্য ব্যবহার করা হবে এমন গাছের সংখ্যা বেশি ছিল বলে তখন আমি বেশি করে তাল মিশ্রি তৈরি করতাম এবং বিক্রয় ও করতাম। এখন বাজারে বিভিন্ন মিষ্টি পাওয়া যায় বলে তাল মিশ্রি আর বেশি ব্যবহার হয় না।” তিনি আরও বলেন, “এখন আমি যতটুকু তাল মিশ্রি তৈরি করি তার সবটুকুই ঔষধ হিসেবেই বেশি ব্যবহার হয়। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানে না যে তালের রস দিয়ে তাল মিশ্রি তৈরি করা যায়।”Palm-1

শেষ কথা
তালগাছের ছায়ায় বসে ক্লান্ত রাখাল বিশ্রাম নিয়ে প্রাণশক্তি ফিরে পান। রোদের প্রখর তাপ থেকে ছায়া দিয়ে মানুষসহ অন্যান্য জীবজন্তুকে আগলে রাখে এই তাল গাছ। এ গাছের বহুবিধ ব্যবহার মানুষকে উপকার করেছে। তবে বরেন্দ্র অঞ্চলে তাল গাছ লাগানোর প্রবণতা কম হওয়ায় ধীরে ধীরে এর সংখ্যা কমে গেছে। এছাড়া এই গাছের উপকারিতা ও বহুবিধ ব্যবহার না জানার কারণে মানুষ এ গাছের প্রতি যতœবান হচ্ছেন না। তাই নিজের প্রয়োজনেই এবং প্রকৃতির ঐক্যতানকে সুদৃঢ় করার জন্য তালসহ অন্যান্য গাছের প্রতি যতœবান হওয়া প্রতিটি মানুষেরই কর্তব্য।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.