সাম্প্রতিক পোস্ট

কুড়ানো শাকের উৎস টিকিয়ে রাখতে হবে

সাতক্ষীরা শ্যামনগর থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল
‘আগেকার দিনে আমাদের এলাকায় নানান ধরনের কুড়িয়ে পাওয়া শাক পাওয়া যেতো। আর এ সকল শাক ছিলো নানা ধরনের পুষ্টিতে ভরপুর। অধিকাংশ পরিবার এ সকল শাক দিয়ে তাদের পরিবারের প্রয়োজন মিটাতো। বিশেষ করে কিছু পরিবার এমনই ছিলো যাদের মাসের অধিকাংশটায় এ শাক দিয়ে চাহিদা মিটতো। আর এসকল শাকসবজি খেয়ে আমরা রোগশোক মুক্ত ছিলাম। বর্তমান সময় যতই দিন যাচ্ছে ততই এসকল শাকসবজি হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ এলাকায় এখন আর আগের মতো গাছ-গাছালী ও উদ্ভিদ নেই। এর মূল কারণ হলো এলাকায় লবণ পানির প্রভাব বিস্তার করা। যেদিকে তাকাই সেদিকে যেনো লবণ পানি। এ লবণ পানির সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের চলতে হচ্ছে। আগে এলাকায় মিষ্টি পানি ও মিষ্টি আবহাওয়া ছিলো বলে আমাদের আনাচে-কানাচে, রাস্তার পাশে, পুকুরের পাশে, গাছের গায়ে, দালানের গায়ে কুড়ানো এ সকল শাক হতো। সে সব উৎস এখন হারিয়ে যাচ্ছে। যার জন্য এখন কুড়ানো শাকের উৎস টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।’

IMG20191225154957
সম্প্রতি কাঠাল বাড়ি গ্রামে কৃষক ছাকাত গাজীর বাড়িতে বারসিক’র উদ্যোগে ‘লবণাক্ততা ও অচাষকৃত উদ্ভিদের সংকট’ বিষয়ক গ্রাম পর্যায়ে আলোচনা সভায় উপোরক্ত কথাগুলো বললেন প্রবীণ কৃষাণী আকলিমা বেগম। আলোচনা সভায় কাঠালবাড়ি নারী সংগঠনের সদস্যরা, স্থানীয় কৃষক-কৃষাণী, শিক্ষার্থী ও বারসিক কর্মকর্তাসহ মোট ২৪ জন অংশগ্রহণ করেন।

সভায় অংশগ্রহণকারী নারী অযুফা, সায়মা ও জ্যোছনারা জানান, তাদের এলাকায় এখনোও নানান ধরনের অচাষকৃত উদ্ভিদ রয়েছে। যেগুলো এখন ধানের ক্ষেতে, পুকুরের পাড়ে, ঝোপঝাড়ে, রাস্তার পাশে, গাছের গায়ে, বেড়ার গায়ে দেখা দেয়। তবে বর্ষা ও ধান কাঠার পরে একটু বেশি দেখা যায়। কিন্তু এসকল অচাষকৃত উদ্ভিদ গুলো আগের তুলনায় এখন কমে যাচ্ছে। এখন আমাদের বিলে, বসত বাড়ির পুকুরে লবণ পানি। এছাড়াও পাশের চুনা নদী দিয়ে লবণ পানি উঠিয়ে চিংড়ি ঘের করাসহ গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের বসবাস চুনা নদীর পাড়ে ও বর্তমানে তাপমাত্রাও বেশি যার জন্য লবণের মাত্রা বেশি। তারা আরও জানান, বর্তমানে এলাকা থেকে অচাষকৃত উদ্ভিদের মধ্যে কাথাশাক, কাটানুটে শাক, বাতো শাক, ধুতরা ও নাটা গাছ একেবারে বিলুপ্তির পথে। এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে এসকল উদ্ভিদ হুমকির মুখে। অতিরিক্ত লবণে টিকতে পারছেনা। সাথে যে উৎসগুলো ছিলো তাও কমে যাচ্ছে। এখন বাজারের তৈরি কৃত ষার কীটনাশক যুক্ত খাবারের উপর ঝুকতে হচ্ছে।

IMG20191225155025
অংশগ্রহণকারী নারী আফরোজা বেগম বলেন, ‘অচাষকৃত সকল উদ্ভিদ আমরা নানান কাজে ব্যবহার করে থাকি। ছোট খাটো পেট ব্যথা, বাত ব্যথা, দাঁত দিয়ে রক্ত বেরোনো, কুকুরের কামড়, স্বর্দি কাশি, পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা, কুনোখো, গবাদী পশুর গায়ে চুলচুলে পোকা লাগা, টাক পোকা লাগা, আয়রনের ঘাটতি, ধাতু রোগসহ অনেক রোগের মহাঔষধ হিসাবে আমরা এগুলো ব্যবহার করি। সাথে তো ভিটামিনের ঘাটতি দূর করতে আমরা এসকল উদ্ভিদ ব্যবহার করি। এমন কোন পরিবার নেই যে তারা এসকল উদ্ভিদ ব্যবহার করে না। এগুলো টিকিয়ে রাখা খুবই জরুরি।’

অংশগ্রহণকারীরা এসকল উদ্ভিদ বৈচিত্র্য ব্যবহার বৃদ্ধি এবং টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেরা কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারা নিজ উদ্যোগে নিজ নিজ বাড়িতে সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এছাড়া তারা মনে করেন, মিষ্টি পানির আধার তৈরি করা, এসব অচাষকৃত উদ্ভিদের ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন মেলা ও সভা আয়োজন করা হলে এসব অচাষকৃত উদ্ভিদ এখনও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: