সাম্প্রতিক পোস্ট

দুবলার চরের রাস উৎসবে সুন্দরবন সুরক্ষার প্রচারাভিযান

সাতক্ষীরা থেকে মননজয় মন্ডল

বঙ্গোপসাগরের পাড়ে সুন্দরবনের দুবলার চরের আলোরকোলে গত ২রা নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব ২০১৭। দুবলার চরের এই রাস উৎসব প্রায় ২০০ বছরের পুরানো একটি ঐতিহ্য। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তিন দিনব্যাপী এই উৎসবকে ঘিরে কয়েক লাখ মানুষের সমাগম ঘটে।

দুবলার চরের রাস মেলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু (1)
সুন্দরবনের আলোরকোলের এই রাস উৎসব নিয়ে কথিত আছে, ১৯২৩ সালে ঠাকুর হরিচাঁদের অনুসারী হরি ভজন নামে এক হিন্দু সাধু এই মেলা শুরু করেছিলেন। তিনি চব্বিশ বছরের বেশি সময় ধরে সুন্দরবনে গাছের ফল-মূল খেয়ে অলৌকিক জীবনযাপন করতেন। অন্য একটি মতে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অবতার শ্রীকৃষ্ণ শত বছর আগের কোনো এক পূর্ণিমা তিথিতে পাপমোচন এবং পুণ্যলাভে গঙ্গাস্নানের স্বপ্নাদেশ পান।। সেই থেকে শুরু হয় রাসমেলার। আবার কারও কারও মতে, শারদীয় দুর্গোৎসবের পর পূর্ণিমার রাতে বৃন্দাবনবাসী গোপীদের সঙ্গে রাসনৃত্যে মেতেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। এ উপলক্ষেই দুবলার চরে পালিত হয়ে আসছে রাস উৎসব। আবার আব্দুল জলিলের সুন্দরবনের ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ফরিদপুর জেলার ওড়াকান্দি গ্রামের জনৈক হরিচাঁদ ঠাকুর স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে পূজা পার্বণাদি ও অনুষ্ঠান শুরু করেন দুবলার চরে গিয়ে। তারপর থেকে মেলা বসছে। লোকালয়ে এই মেলা নীল কমল নামে পরিচিত।

২ থেকে ৪ নভেম্বর ২০১৭ তারিখ তিনব্যাপী এই রাস উৎসবের আজ প্রথম দিন বৃহস্পতিবার সকালে নিকটবর্তী ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে বন বিভাগের নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে পাশ পারমিট গ্রহণ করে কয়েক লাখ পুণ্যার্থী ও দেশি-বিদেশি পর্যটক আলোরকোলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে। বনের ভেতরের আটটি পথ দিয়ে মেলায় যাচ্ছে বিভিন্ন ধর্মের উৎসুক লোকজন। এই রাস মেলাকে ঘিরে গোটা সুন্দরবনে নেওয়া হয়েছে নিশ্রিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

এই রাসমেলায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের অংশ হিসেবে বারসিক দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ভিন্ন কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলে প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, দূর্যোগ মোকাবেলা, সাংস্কৃতিক সুরক্ষা ও সমাজের সকল স্তরের জনগণ এবং প্রাণ-প্রকৃতির ভেতর শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে এক বহুত্ববাদী সমাজ বিনির্মাণে যে কাজ করে চলেছে তারই ধারবাহিকতায় বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন উপকূলে আগামী ২-৪ নভেম্বর ২০১৭ তিনদিনব্যাপী ‘সুন্দরবন উপকূল-বৈচিত্র্য সুরক্ষায় প্রবীণ-নবীন সংহতি’ শীর্ষক এক কর্মসূচির আয়োজন করছে।

দুবলার চরের রাস মেলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু (4)

এ সময়টাতে সুন্দরবনের দুরবলারচরে রাসমেলায় আগত পূণ্যার্থী, দর্শনার্থী, পর্যটক, বনবিভাগ, গণমাধ্যম, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য পেশাজীবী জনগণের কাছেও কর্মসূচির মূল সুর পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কারণে সুন্দরবন ও উপকূলীয় প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় দর্শনার্থীদের সচেতন করতে মুন্সিগঞ্জ ও নীলডুমুর এলাকায় ব্যতিক্রমধর্মী প্রচারণা চালাচ্ছে সুন্দরবন স্টুডেন্ট সলিডারিটি টিম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্য রক্ষা টিম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক, শ্যামনগর উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন। এই প্রচারণা সম্পর্কে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্য রক্ষা টিমের সাংগঠনিক সম্পাদক নাহিদ হাসান জানান, রাস মেলা উপলক্ষে হাজার হাজার দর্শনার্থী ২-৪ নভেম্বর সুন্দরবন ও দুবলার চর ভ্রমণ করবেন। যাত্রাপথে কেউ যেন সুন্দরবনে লাউডস্পিকার না বাজায়, নদীতে পলিথিন বা অন্যান্য বর্জ্য ও তেল জাতীয় দ্রব্যাদি ফেলা থেকে বিরত থাকতে দর্শার্থীদের সচেতন করার জন্য ক্যাম্পেইন করছেন তারা।

আলোর কোল দ্বীপেই বসে সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় উৎসব রাসমেলা। প্রতিবছর কার্তিক-অগ্রহায়ন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় এ মেলা। প্রতিবছর তিন দিনব্যাপী উদযাপিত হয়। এ মেলায় দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও বেশ আকর্ষণীয়।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: