সাম্প্রতিক পোস্ট

গ্রামের স্বশিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানীদের কৃষিগবেষণার গুরুত্ব ও স্বীকৃতি দিতে হবে

রাজশাহী থেকে শহিদুল ইসলাম

বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। আমাদের অর্থনীতির উন্নতির সোপান এবং খাদ্য উৎপাদনের মূল কারিগর আমাদের খাদ্য যোদ্ধা কৃষকগণ। দেশের কৃষরাই বাঁচিয়ে রেখেছেন আমাদের দেশের খাদ্য ও কৃষির ভিত। কৃষকদের অবদানেই আজ আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষকরাই দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান হাতিয়ার। নানা ঘাত প্রতিঘাত, বৈরি আবহাওয়া ও দুর্যোগ মোকাবেলা করে কৃষকরাই আমাদের জন্য খাদ্য উৎপাদন করেন; টিকিয়ে রেখেছেন ও সুরক্ষা করছেন দেশের হাজারো শস্য ফসলের জাতগুলো। কৃষকের এই অবদানের কথা স্বীকার করে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন-তাঁদের (কৃষক) মাথায় তুলে রাখা উচি (সূত্র: কৃষকলীগের ৪৪ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ভাষণ)


কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদই নয়, তাঁরা আমাদের দেশের হাজার বছরের লোকায়ত সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্কগুলো এই কৃষির মধ্যে দিয়েই ধরে রেখেছেন এবং নিরন্তর তা বিস্তারে অবদান রাখছেন। চলমান মহামারি করোনাকলিন (কোভিড-১৯) সময়ে গোটা বিশে^র সবকিছু বন্ধ থাকলেও বন্ধ থাকেনি কৃষকের কৃষি কাজ, কৃষি উৎপাদন, খাদ্য উৎপাদন। তাঁরাই আমাদের টিকিয়ে রেখেছেন এই মহাসংকটকালিন সময়ে। একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানীয় ও লোকায়ত সব পদ্ধতি ব্যবহার করে কৃষকরাই দেশের জন্য খাদ্য উৎপাদনে অবদান রাখছেন নিরন্তর। ফসল ও বীজ উৎপাদন, বীজ বিনিময় এবং নিজের অভিজ্ঞতায় পুরাতন সব জাত থেকে এলাকা উপযোগী, সময়ের চাহিদা উপযোগী নতুন নতুন জাতের সৃষ্টিও করে থোকেন একজন কৃষক। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও একজন কৃষক তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে, তাঁর জীবনের সময়গুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ফসলের জীবনচক্র সুন্দরভাবে ব্যাখা করতে পারেন। একই সাথে দিনে দিনে তাঁর নিকট নানা প্রকার তথ্য পুঞ্জিভ‚ত হতে থাকে। ছোট থেকেই তিনি ফসলের কাছে থেকেই এভাবেই হয়ে উঠেন একজন স্বশিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানী। এই স্বশিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানীগণ নতুন নতুন জাত আবিষ্কার, বীজের যোগানসহ কৃষি প্রযুক্তি আবিষ্কার করেন দেশের প্রয়োজনেই। পুরাতন সব শস্যফসলের জাতগুলোর উন্নতির মধ্যে দিয়ে তাঁরা দেশের কল্যাণ সাধন করছেন নিরবে।

দেশব্যাপী এরকম স্বশিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানীদের জন্য রাষ্ট্র তথা সরকারি বেসরকারিভাবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। কেননা তাঁদের নিরাপত্তা দিলে নিরাপদ হবে আমাদের দেশের সম্পদ। এরকম কৃষিবিজ্ঞানীগণ জীবনের পুরোটা সময়ই ব্যয় করেছেন বৈশিষ্ট্যময় জাত উদ্ভাবনে এবং কৃষির উন্নয়নে। যেমন-রাজশাহীর দুবইল গ্রামের ইউসুফ আলী মোল্লা প্রায় দুইশতাধিক স্থানীয় জাতের শস্য ফসলের বীজ সুরক্ষা করছেন। একই জেলার তানোরের কৃষিবিজ্ঞানী নূর মোহাম্মদ দেশি সব ধানের জাত থেকে উন্নততর বেশি উৎপাদনশীল জাতের লক্ষ্যে এ পর্যন্ত বহু ধানের সফল সংকরায়ণ করেছেন। তাঁর কৌলিক সারির সংখ্যা প্রায় দুশো। কেবল সংকরায়ণ নয়, বিশুদ্ধ সারি নির্বাচনেও তিনি বরাবরই সফল হয়েছেন। বরেন্দ্র অঞ্চলের খরা ও পানিস্বল্পতাকে তিনি তার নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচনায় নিয়েছেন। এমনকি স্বল্প জীবনকালের ধান, সুগন্ধি ধান ও সরু চালের জাত উদ্ভাবনেও এগিয়ে আছেন এই স্বশিক্ষিত কৃষিগবেষক। এরকম গাইবান্ধার সাদুল্ল্যাপুর উপজেলার নুরুজ্জামান সাধু, রায়হান কবির রঞ্জুর সোহাগ-৪ ধান, ঝিনাইদহের হরিপদ কাপালি, খাগড়াছড়ির ফকুমার ত্রিপুরার ফকুমার ধান, সাতক্ষীরার দীলিপ তরফদারের চারুলতা ধান, সুনামগঞ্জের নুয়াজ আলী ফকিরের চুরাক ধান, ঝিনাইদহের মকবুল হোসেনের ম্যানেজার ধান কিংবা বাগেরহাটের লেবুয়াত শেখের ফাতেমা ধানের কথা আমরা জানি। এসব ধান বিশুদ্ধ সারি নির্বাচনের মাধ্যমেই তাঁরা আবিষ্কার করেছিলেন। বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে এরকম বিভিন্ন স্বশিক্ষিত কৃষিগবেষকগণ দেশের উন্নয়নে ভ‚মিকা রাখনে। দিনে পর দিন, বছরের পর এরকম নিরলস পরিশ্রম করে যারা নতুন নতুন ধানের উদ্ভাবন করেন, তাঁদের এই অবদান আমরা কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারিনা।

নানা চড়াই উতরাই এবং ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে থেকে তাঁরা যে জাতগুলো আবিষ্কার করেন সেসব জাতের সুরক্ষা এবং স্বীকৃতি আমাদের দিতে হবে। একই সাথে এসব কৃষি গবেষকদের কৃষি গবেষণার গুরুত্ব না বোঝার কারণে অনেক বিনষ্ট করে থাকেন। সম্প্রতি তানোর উপজেলার নূর মোহাম্মদের ৬২টি ধান জাতের বিনষ্টের কথা আমরা জানতে পারি। মানুষের মধ্যে সচেতনতা না থাকার কারণেই এসব ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। তাই এসব জাতীয় সম্পদের গুরুত্ব এবং নিরাপত্তার দিকগুলো আমাদেকে সমন্বিতভাবে গ্রহণ করতে হবে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

দেশব্যাপী প্রান্তিক এবং স্বশিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণার গুরুত্ব, স্বীকৃতি এবং নিরাপত্তা চেয়ে সম্প্রতি বিভাগীয় শহর রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ব পাঠাগার অডিটরিয়ামে কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষকগণ সংলাপ ও মতবিনিময়ের আয়োজন করেন। উক্ত সংলাপ ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সভা প্রধান হিসেবে ছিলেন রাজশাহীর পবা উপজেলার দ্ইু বার রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় কৃষি পদক প্রাপ্ত কৃষক রহিম উদ্দিন সরকার। নিজেদের গবেষণা এবং বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি নিয়ে কথা বলেন- রাষ্ট্রীয় কৃষি পদক প্রাপ্ত তানোর উপজেলার কৃষিবিজ্ঞানী নুর মোহাম্মদ, তানোর উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি জাইদুর রহমান, বারসিক’র কৃষিগবেষক রায়হান কবির রঞ্জু আকন্দ, পুরাতন ধান চাষী দুলাল মিয়া, কৃষক নেতা নুরুল ইসলাম, বিভাগীয় জয়িতা পুরুষ্কারপ্রাপ্ত নারী কৃষক নেত্রী রহিমা খাতুন, সফল ভার্মীকম্পোস্ট চাষী ও গবেষক আবদুল হামিদ, তরুণ সংঠন ইয়্যাসের এর সাধারণ সম্পাদক আতিক, আদিবাসী ছাত্র পরিষদের সাবিত্রী হে¤্রম, সামাজিক কল্যাণ সংস্থার স¤্রাট রায়হানসহ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।

সংলাপে তানোর উপজেলার স্বশিক্ষিত কৃষিগবেষক নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি ১৪ বছরের বেশি সময় থেকে দীর্ঘ পরিশ্রমের ফলে ২০০টি দেশি জাত নিয়ে গবেষণা করে আসছি, কিন্তু খুব অসচেতন ভাবে কিছু মানুষ আমার ৬২টি জাত বিনষ্ট করে দিয়েছে।’ সরকারের কাছে তিনি এ বিষয়ে গুরুত্ব ও নিরাপ্তা সহায়তা চান। একই সাথে তাঁর গবেষিত উন্নত জাতগুলোর স্বীকৃতি চান।
সংলাপে স্বশিক্ষিত কৃষিগবেষকগণ দাবি করেন- সারা দেশে স্বশিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানীদের গুরুত্ব দিতে হবে রাষ্ট্রীয়ভাবে। একইসাথে তাঁদের গবেষিত জাতগুলোর স্বীকৃতি দিতে হবে ও প্রবীণ কৃষকদের পেনশন স্কিম চালু করতে হবে। তাঁরা দেশি শস্য ফসলের জাতগুলো এলাকা ভিত্তিক সুরক্ষার উদ্যোগ নেবার দাবি জানান।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: