Posted in

পারভীন আক্তাররাই টিকিয়ে রেখেছেন দেশি শস্য ও ফসলের বীজগুলো

রাজশাহী থেকে ইসমত জেরিন

সৃষ্টির আদিকাল থেকে পরিবারের খাদ্য সংরক্ষণে ও নিরাপত্তায় যাঁরা অনবদ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন তারা হলেন গ্রাম বাংলার নারী। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নারীরাই প্রথম আবিষ্কার করেছেন বীজ থেকে অঙ্কুরোদগমের প্রক্রিয়াটি। সেখান থেকেই পৃথিবীর বুকে শুরু হলো বীজ বপন উদ্যোগ। ধীরে ধীরে বিকাশ ঘটল কৃষিভিত্তিক বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়া। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক খাদ্য উৎপাদনের অংশীদার নারী। কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে নারীদের পরিশ্রম ও অনুশীলনের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে কৃষি স্থানীয় ঐতিহ্য ও জ্ঞানের বাহন হচ্ছে গ্রামীণ নারী সমাজ। ধান উৎপাদনের শুরু থেকে গোলাজাতকরণ পর্যন্ত মোট ২৩টি ধাপের মধ্যে ১৭টির সঙ্গে নারী সরাসরি যুক্ত। জৈব সার প্রস্তুত, নিড়ানো, ধান মাড়ানো, ধান সেদ্ধ, শুকানো ইত্যাদি কাজগুলোর মতোই নারীর অন্যতম একটি কাজ হচ্ছে বীজ সংরক্ষণ। নারীরাই মূলত বীজ সংরক্ষণের প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে রেখেছেন যুগের পর যুগ।
Veg
গোদাগাড়ী উপজেলার গোগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের বড়শীপাড়া গ্রামের একজন নারী হলেন মোছা. পারভীন আক্তার। অষ্টম শ্রেণী পযর্ন্ত পড়াশোনা করার পর পারিবারিক আর্থিক অসঙ্গতির কারণে তাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। ১৬ বছরের বিবাহিত জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি অতিবাহিত করেছেন ঘর গৃহস্থালির কাজ করে বিশেষ করে যখন যৌথ পরিবার ছিল। কিন্তু যখন একক পরিবার হয়ে আলাদা জায়গায় বাড়ি তৈরি করলেন তখন গৃহস্থালির কাজ অনেক কমে গেছে। ফলে অবসর সময়ে তিনি নিজেই প্রত্যক্ষভাবে সবজি চাষ ও বীজ সংরক্ষণের সাথে জড়িত হয়েছেন। বতর্মানে পারভীন আক্তারের বাড়িতে ১৭ ধরনের সবজি বীজ সংরক্ষণ করা আছে। সবজি বীজগুলোর মধ্যে রয়েছে পেঁপে, পুই শাক, শিম, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, ঢেঁড়স, পেঁয়াজ, রসুন, বরবটি, করলা, তরই, ঝিঙ্গা, ধুমা, লালশাক। এর প্রতিটি সবজিই বাড়ির পাশে ৬ কাঠা জমিতে চাষ করার মধ্য দিয়ে সংরক্ষণ করছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে বীজ তিনি বাড়ির আশেপাশের প্রতিবেশীর কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন। তারপর বিগত সাত বছর থেকে নিজে বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে রাখছেন।

পারভীন আক্তার বলেন, “সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় নিজেকে সংযুক্ত করা একদিনে তৈরি হয়নি। এটি একটি বংশগত ধারাও। নিজের বাড়িতে আমি প্রথমে মায়ের কাছ থেকে বীজ সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শিখেছি। তারপর শ্বাশুড়ির কাছ থেকে শিখেছি।” বর্তমানে পারভীন আক্তার বড়শীপাড়া গ্রামের মধ্যে সবচে’ বেশি বীজ সংরক্ষক নারী হিসেবে পরিচিত। বীজ সংরক্ষণের পাশাপাশি পরভীন আক্তার বড়শীপাড়া গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামের পরিবারগুলোর সবজি বীজের চাহিদাও মেটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। চলতি মৌসুমে নিজ গ্রামে মোট ১৫টি পরিবারের মধ্যে এবং চর আষাঢ়েদহ এলাকায় ৫টি পরিবারে বীজ সহায়তা প্রদান করেছেন।
veg-1
পারভীন আক্তার সবজি বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব কিছু পদক্ষেপ পালন করেন। প্রথমে তিনি সবজি উৎপাদনকালীন মাঝামাঝি সময়ে কয়েকটি সবজি ধরার পর সেগুলো থেকে স্বাস্থ্যসম্মত বীজ সবজি গাছ না মারা পর্যন্ত গাছেই রাখেন। গাছ মরে যাওয়ার পরে বীজগুলো শুকিয়ে নিম পাতাসহ কৌটায় করে ঘরের শুষ্ক স্থানে সংরক্ষণ করে রাখেন। দেশী সবজি বীজ সংরক্ষণ ও বাজারে প্রচলিত হাইব্রিড বীজ সম্পর্কে পারভীন আক্তার বলেন, “বাজারের হাইব্রিড বীজের ফলন ভালো, সবজি দেখতেও সুন্দর কিন্তু এর স্বাদও কম এবং পুষ্টি কম। এগুলো বাইরের রাসায়নিক সার ছাড়া ভালো হয় না, বাজার থেকে কিনতে টাকাও লাগে।” তিনি বলেনম “দেশীয় বীজ জৈব বাড়িতে তৈরি করা সার দিয়েই ভালো হয়। এই সবজির স্বাদও বেশি হয়। বীজ কেনার বাচানো টাকা অন্য কাজে ব্যবহার করা যায়। তাই ভালো মানের বীজের জন্য সকলেরই উচিত বাড়িতে বীজ সংরক্ষণ করা।”
Veg-2
পূর্বের তুলনায় নারীদের গতিশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অথবা বিভিন্ন সংগঠনের সাথে জড়িত হওয়ার কারণে বেশি করে বুঝতে শিখেছে, তাদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। আগে গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ যৌথ পরিবারে ছিল। বর্তমানে একক পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে নারীরা নিজ নিজ পরিবারের উন্নতি ও প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর জন্য বাড়ির চারপাশকে কাজে লাগিয়ে সবজি চাষ করা শুরু করেছেন। বাজারে সবজির দাম বেশি হওয়ায় নিজ নিজ বাড়িতে সবজি চাষের পরিমাণও বেড়েছে বলে পারভীন আক্তার মনে করে। তিনি আরো মনে করেন, যদি কোন ব্যক্তি বা সংগঠন স্থানীয়ভাবে মাঝে মাঝে বীজ বিষয়ক জনসমাবেশ ঘটান, তবে বরেন্দ্র এলাকার খরাসহ পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতিতে এবং প্রাণ ও প্রকৃতির বিকাশ ঘটানোর জন্য বড় ধরনের ভূমিকা পালন করবে বলে পারভীন আক্তার মনে করে।

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পুরুষের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের প্রশংসনীয় অবদান স্পষ্ট। দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যান্য দেশগুলোতে কৃষির সাথে বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের মতো এত নিবিড় সম্পর্ক আর কোথাও দেখা যায় না। অনাদিকাল থেকে নারীরাই দেশের কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। সুতরাং বীজ উন্নয়ন বিষয়ক সকল কর্মকান্ড গ্রামীণ নারীদের সক্রিয় অংগ্রহণ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। তাদের এ কর্মকান্ড এককভাবে ক্ষুদ্র মনে হলেও সামগ্রীক বিবেচনায় গ্রামীণ নারীরাই হচ্ছেন বাংলাদেশে ফসলের বীজের সর্ববৃহৎ যোগানদার।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.