রহিমা বেগমের প্রাকৃতিক কৃষি

মানিকগঞ্জ সিংগাইর থেকে শিমুল বিশ্বাস
সিংগাইর উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামের ৬০ বছর বয়সী কৃষাণি রহিমা বেগম। স্বামী-স্ত্রী এবং চার সন্তানের পরিবারে খাবারের জোগাড়ের জন্য স্বামীর সার্বিক কাজে সহযোগিতা করতে করতে একজন আদর্শ কৃষক বনে গেছেন কৃষাণি রহিমা। পরিবারে সদস্যদের পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্যের যোগান দেওয়ার জন্য নিজের বাড়ির ৩৫ শতাংশ পালানী জমিতে গড়ে তুলেছেন আদর্শ কৃষি খামার। পালানী জমির এই একখন্ড জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে বছরব্যাপী নিয়মিত চাষ করেন বৈচিত্র্যময় ফসল। চলতি রবি মৌসুমে এ জমিতে চাষ করেছেন গোল আলু, মিষ্টি আলু, টমেটো, বাধা কপি, কপি, মুলা, স্টভেরী, কোয়াশ, পেঁয়াজ, রসুন, বেগুন, মরিচ, সরিষা, সুর্যমুখী, গুজিতিল, ফিরিঙ্গি, আখ, কুসুমফল সহ বৈচিত্র্যময় ফসল। অন্যদিকে বাড়ির অব্যবহৃত জমিতে আদা হলুদ এবং বাড়ির উঠানে লাউ, সীম, বরবটি চাষ করে একটি আদর্শ কৃষি বাড়ির আদলে সজ্জিত করেছেন নিজ বাড়িটিকে। বাড়িতে গরুর খামার এবং দেশী জাতের মুরগি পালনের সাথে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত। নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন করতে স্বামীর সহযোগিতায় নিজস্বভাবে জৈব সার, জৈব বালাইনাশক তৈরি করে ব্যবহার করেন পারিবারিক খামারে। কৃষক রহিমা বেগমের উৎপাদিত কৃষি ফসল একদিকে পরিবোরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছে অন্যদিকে পরিবারে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি আয়।


জলবায়ু এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত সংকট এখন সকল শ্রেণী পেশষার মানুষের জন্য চরম হুমকি। তার মধ্যে যারা প্রকৃতিনির্ভর কৃষি পেশার মানুষ, তাদের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ।” সম্প্রতি এক ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে রহিমা বেগম বলেন, “বর্তমানে কৃষক কৃষির সব উপকরণ বাজার থেকে কিনে চাষাবাদ করায় একদিকে ফসলের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে অধিক রাসয়নিক সার ও বিষ ব্যবহারের ফলে খাদ্যে বিষক্রিয়ার মাত্রাও বেড়ে চলছে দিনকে দিন। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি।”


২০১৩ সালে বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক’র সহযোগিতায় সংগঠিত নযাবাড়ি কৃষক কৃষাণি সংগঠনে নিয়মিত সদস্য হিসাবে যুক্ত হন কৃষাণি রহিমা বেগম। বর্তমানেও তিনি উক্ত কৃষক কৃষাণি সংগঠনের একজন সক্রিয় সদস্য। বেসরকারী সংস্থা বারসিক’র উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর তথা কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেন এ কৃষাণি। যে কারণে রহিমা বেগমের কৃষির ধরন বর্তমান প্রচলিত কৃষি থেকে একুট ব্যতিক্রম। কৃষি কাজে তিনি বাজারের কোন উপকরণ ব্যবহার করেন না। তিনি নিজস্ব সংগৃহীত বীজ, জৈব সার এবং প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে বালাই দমনের মাধ্যমে নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন করেন তাঁর জমিতে। শুধু ফসল চাষ করাতেই বিরত থাকেন না এ কৃষাণি। প্রতিটি ফসলের বীজ সংরক্ষণ করেন এবং স্বামীর সহযোগিতায় গড়ে তুলেছেন বৈচিত্রময় ফসলের বীজ ভান্ডার। স্থানীয় জাতের বীজ সম্প্রসারণে উক্ত বীজ ভান্ডার থেকে সংকটকালিন সময়ে এলাকার মানুষের বীজের চাহিদা পূরণে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছেন রহিমা বেগম। রহিমা বেগমের মন্তব্য এ পর্যন্ত এ বীজ ভান্ডার থেকে চার শতাধিক মানুষকে বিনামুল্যে বীজ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।


রহিমা বেগম বলেন, “প্রকৃতির সব উপকরণ ব্যবহার করে কৃষি কাজ করলে একদিকে উৎপাদন খরচ কমে অন্যদিকে পাওয়া যায় নিরাপদ বিষমুক্ত খাবার, যা আমার পারিবারিক আয় বৃদ্ধি ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করছে।”

happy wheels 2

Comments