Posted in

সাতক্ষীরার দিন দিন ঔষধিগুণ সমৃদ্ধ চুই ঝালের আবাদ বাড়ছে

আসাদ রহমান, সাতক্ষীরা থেকে

সাতক্ষীরায় ঔষধি গুণ সমৃদ্ধ মসলা জাতীয় অর্থকরী ফসল চুই ঝালের চাষ দিন দিন বাড়ছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা, যশোর এবং খুলনা এলাকায় এটি বেশি চাষ হয়ে থাকে। পিপারাসি পরিবারের সপুষ্পক লতা চুই। এর বৈজ্ঞানিক নাম Piper chaba। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় প্রজাতি।

সাতক্ষীরার ভোজনরসিকদের কাছে চুইয়ের কদর সবচেয়ে বেশি। মাংসই চুই বেশি ব্যবহার করা হয়। অনেকে চুই দিয়ে মাছও রান্না করে থাকেন। চুই ঝালকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরায়, পাটকেলঘাটা, তালায়সহ বেশ কয়েক জায়গায় হোটেল গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরায় আব্বাস হোটেল, পানসি হোটেল, ভোজন বিলাশ, কস্তরী পাটকেলাঘাট গণির হোটেল। শুধুমাত্র চুই ঝাল দিয়ে খাসির মাংসের কারণে খুলনার চুকনগরে আব্বাসের হোটেলের সুখ্যাতি রয়েছে সারা দেশে।

Chaijal satkhira photo (1)

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চুই লতাজাতীয় গাছের কাণ্ড ধূসর বর্ণের ও পাতা পান পাতার মতো সবুজ রঙের। কাণ্ড থেকে আকর্ষি বের হয়, সেই আকর্ষি মাটিতে বিশেষভাবে রোপণ করলে আবার সেটা গাছ হয়। এর কান্ডটি মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চুই ঝাল একধরনের মসলা। এর ডাল মসলা হিসেবে গরু ও খাসির মাংসে দেওয়া হয়। এতে এক অপূর্ব স্বাদের সৃষ্টি হয়। সেই স্বাদ ঝাল ঝাল। অনেকে মাংস রেখে শুধু চুই ঝালই মজা করে খান। এছাড়া এর অনেক ভেষজ গুণ রয়েছে।

সাতক্ষীরা বড় বাজার, পাটকেলঘাটা, তালা কালিগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন বাজারে চুই ঝাল বিক্রি হয়ে থাকে প্রতি কেজি ২০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত।

Chaijal satkhira photo (2)

সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলা এলাকার চাষিরা জানান, আম, শিমুল গাছের সাথে ভাল ফল পাওয়া গেছে। সাধারণত আম, সুপারিসহ কাঠ জাতীয় গাছের গোড়া থেকে ১২-১৫ ইঞ্চি দূরে গর্ত করে চুই গাছের কাটিং লাগান হয়। গর্তের মধ্যে কিছু গোবর, বর্জ্য, ৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০ গ্রাম টি এস পি, ৫০ গ্রাম পটাশ দিয়ে গর্তে ও মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে ৭ দিন রেখে কাটিং লাগাতে হয়। গর্তে একটি খুঁটি কাত করে বড় গাছের সাথে বেঁধে দিলে ৩০-৪০ দিনের মাঝে তা গাছের কা-ের সাহায্যে উপরে উঠে যায়। এভাবে চুই গাছ বাড়তে থাকে।

সাতক্ষীরা শহরের বড় বাজারের চুই ঝাল বিক্রেতা জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আমি প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ কেজি চুই ঝাল বিক্রি করি। বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে চুই ঝালের বিক্রি বেড়ে যায় কয়েক গুণ।” তিনি আরও বলেন, “তালা, কালিগঞ্জ, পাটকেলঘাটা এলাকা থেকে চাষীরা আমাদের চুই ঝাল দিয়ে যায়।”

সাতক্ষীরা শহরের রাজার এলাকার আবুল হোসেন বলেন, “আমি ৩ কেজি চুই কিনেছি। চুই ছাড়া আমাদের বাড়িতে কোন মাংস রান্নাই হয় না। বাড়ির সবার প্রিয় চুই ঝাল। তবে শাখা ডাল থেকে শেকড়ে ঝাল বেশি বলে এর দামও একটু বেশি।” আবু ইউসুফ রনি নামে একজন বলেন, “সাতক্ষীরার অনেক খাবারের হোটেলে খেতে গেলে পাওয়া যায় এই চুই ঝালের স্বাদ। পাটকেলাটার বেশ কয়েকটি হোটেল শুধুমাত্র চুই ঝালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।”

চুই ঝাল নামেই বোঝা যায় এটি স্বাদে ঝাল, কিন্তু এই ঝাল একটু আলাদা। এর রয়েছে একটি আলাদা গন্ধ যা তরকারি বা রান্না মাংসে আনে আলাদা এক আমেজ। আরও মজার ব্যাপার হলো খাওয়ার পর এই ঝাল বেশীক্ষণ স্থায়ী হয়না।

স্থানীয় হারবাল চিকিৎসকরা বলেন, “চুই ঝাল শুধুমাত্র মসলা নয় ভেষজ ওষুধ, চুইলতার শিকড়, কাণ্ড পাতা, ফুল ফল সব অংশই ভেষজগুণ সম্পন্ন এবং গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ পুরো গাছ উপকারি। মানব শরীরের বিভিন্ন রোগ নিবারণে এটি অনেক কার্যকর। গ্যাস নিবারণ, কোষ্ঠকাঠিন্য তাড়াতে, রুচি বাড়াতে, ক্ষুধামন্দা দূর করতে কার্যকর ওষুধ এটা। স্নায়ুবিক উত্তেজনা ও মানসিক অস্থিরতা প্রশমন করে ঘুম আনতে সহায়তা করে চুই ঝাল। হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, কাশি, কফ, ডায়রিয়া, রক্তস্বল্পতা, শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে অথবা শরীরের ব্যথা সারাতে পারে চুই ঝাল।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ কাজী আব্দুল মান্নান বলেন, “জেলায় সাড়ে ৫হেক্টর জমিতে চুই ঝালের চায় হয়। জেলায় বিভিন্ন বাড়িতে লাগানো পাশাপাশি এখন কেউ কেউ বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ শুরু করছে।”

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.