সাম্প্রতিক পোস্ট

সব পানি নিরাপদ নয়

সাতক্ষীরা শ্যামনগর থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল

‘আগে আমরা সরাসরি পুকুর থেকে পানি এনে তাতে ফিটকিরি মিশিয়ে খেতাম। তখনকার সময়ে টিউবওয়েলও কম ছিলো। সেসকল পানি ছিলো স্বাস্থ্যসম্মত। তখন কিন্তু পানিবাহিত রোগব্যাধিও কম ছিলো। যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন পানির মান খারাপ হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের এলাকাতে প্রচুর পানি আছে কিন্তু তা খাবার উপযোগী নয়। চারিদিকে যেনো লবণ পানির ছড়াছড়ি। আমাদের এখানে এখনোও ভালোই কৃষি কাজ হয়। কিন্তু ২০০৯ সালের আইলার পর থেকে আমাদের সুপেয় পানির পুকুর গুলো সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখনো সে লবণ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এখন যে পানি ব্যবহার করছি বিশেষ করে পুকুরের পানি তা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এলাকাতে পানি আছে প্রচুর কিন্তু সব পানি ব্যবহার তো আর নিরাপদ নয়।’

IMG20191224161758
উপরোক্ত কথাগুলো বললেন কাশিমাড়ি ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের কৃষানী হাসিনা বেগম। সম্প্রতি বারসিক’র সহায়তায় জয়নগর গ্রামে জয়নগর কৃষিনারী সংগঠনের উদ্যোগে রোজিনা বেগমের বাড়িতে পানীয় জল ও এলাকার পানির পরিস্থিতি উপর লবণাক্ততার প্রভাব বিষয়ক গ্রাম পর্যায়ে আলোচনা সভায় উপরোক্ত কথাগুলো বলেন তিনি। আলোচনা সভায় জয়নগর গ্রামের কৃষক-কৃষাণী, শিক্ষার্থী ও বারসিক কর্মকর্তা, ৪জন পুরুষ ও ২২ জন নারীসহ মোট ২৬ জন অংশগ্রহণ করেন।

আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারীদের নিকট থেকে বর্তমানে তারা কোন পানি ব্যবহার করেন? তার উৎস কি? উৎসগুলো বাড়ি থেকে কেমন দূরে? কি কি পদ্ধতিতে পানি সংরক্ষণ রাখেন? পরিবারে দিনে কেমন পানি ব্যবহার করেন? অতীত এবং বর্তমানের পানির উৎসের কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা? পরিবর্তনে তাদের কিকি সমস্যা হচ্ছে? সমস্যা সমাধানে তারা কি কি উদ্যোগ গ্রহণ করছেন এরকম নানান ধরনের সমস্যা ও সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় ও পরামর্শ জানার চেষ্টা করা হয়।

সভায় অংশগ্রহনকারীরা জানান, তাদের সুপেয় পানির উৎস বলতে একটি পিএসএফ সম্মিলিত পুকুর, টিউবওয়েল ও সাপ্লাই পানি। আর এসকল পানির উৎস এলাকা থেকে পিএসফ প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে। এছাড়াও পানি ক্রয় করতেও হয়। এলাকার নিচের পানি ভালো বলে কিছু পরিবার ও প্রশাসন থেকে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করাতে খাবার পানির সমস্যা খুব একটা পোহাতে হয় না। টিউবওয়েলের, ক্রয় কৃত পানি, পিএসএফের পানি এবং যখন বর্ষা হয় তখন বর্ষার পানি বিভিন্ন পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করেন তারা। বিশেষ করে দস্তার কলস, পট, ড্রাম ও প্লাস্টিকের বিভিন্ন বোতল ,ড্রাম ও গাজী ট্যাংকে করে পানি সংরক্ষণ করেন।

অংশগ্রহণকারী আরও জানান, যদি রান্না বান্না, গোসল, কাপড় ধোওয়া, বাসন মাঝাসহ গৃহস্থালির কাজে তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুকুরের পানি ব্যবহার করেন। এ পানি সংগ্রহের এ কাজটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাড়ির নারীরা করে থাকেন। কোন কোন সময় বাড়ির পুরুষসহ অন্য সদস্যরা সহায়তা করেন। তবে সময় অনুযায়ী যেমন শীতের সময় একটু কম লাগে আবার অন্য সময় বেশি পানি লাগে।

অংশগ্রহণকারী প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল হাকিম বলেন, ‘আগে কিন্তু আমাদের পানির প্রধান উৎস ছিলো পুকুরের পানি। আর সে পানির উৎস তো পালটে গেছে। এখন অনেক পুকুর ভরাট হয়ে গেছে। অনেক পুকুরে লবণ পানি প্রবেশ করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সময় যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে সে সময় পুকুরের পানি বিভিন্ন ধরনের ময়লা আবর্জনা পড়ে পানি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সাথে লবণ পানির চিংড়ি ঘেরের প্রভাব বিস্তার করার কারণে আমাদের এ সমস্যা তৈরি হচ্ছে।’

IMG20191224161803
অংশগ্রহণকারী কৃষাণী রোজিনা বেগম বলেন, ‘এখন যে পানির ব্যবহার করছি তা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। আমরা খাবার পানি মাটির নিচের পানি ব্যবহার করছি কিন্তু সাংসারিকসহ অন্যান্য কাজে পুকুরের পানি ব্যবহার করি। পুকুরের পানি দূষিত হয়ে যাওয়ার কারণে নানান ধরনের রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে পানিবাহিত রোগ, চুলকানি, দাদ, একজিমা, ঘা, পাচড়া, চোখ মুখ জ¦ালা করা এরকম নানান ধরনের রোগ বালাই হচ্ছে। আর এ রোগ বালাই শুধূ মানুষের নয় আমাদের গবাদি পশু পাখিরও নানা ধরনের রোগ বালাই হচ্ছে।’

অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী মরিয়ম বলেন, ‘বাপ দাদাদের কাছে শুনেছি বা চোখে দেখছি যে আগে মানুষ বেশি দিন বাঁচতো। আর এখন বেশি দিন বাঁচে না। কারণ এখন রোগবালাই বেশি হচ্ছে। আগে তো আমাদের এখানে কোন লবণ পানির চিংড়ি ঘের ছিলো না আর এখন আমাদের এলাকায় বিশেষ করে আমাদের গ্রামের চারিপাশে লবন পানির চিংড়ি ঘের। যার কারণে আমাদের সুপেয় পানির উৎস কমে যাচ্ছে।’

অংশগ্রহণকারীরা তাদের পানীয় জল ও এলাকার পানির সমস্যা সমাধানের জন্য নিজেরা বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এলাকায় যেহেতু নিচের পানি ভালো সেক্ষেত্রে কিছু কিছু পরিবার মিলে টিউবওয়েল স্থাপন, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুরগুলো সংস্কার ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ নেন। এছাড়া সুপেয় পানির পুকুরগুলো খনন করার জন্য তারা নানানভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: