সাম্প্রতিক পোস্ট

‘বাঁচার প্রয়োজনেই ধরে রেখেছি দাদার আমলের স্মৃতি’

‘বাঁচার প্রয়োজনেই ধরে রেখেছি দাদার আমলের স্মৃতি’

রাজশাহী থেকে শহিদুল ইসলাম শহিদ

“দেশ এখন অনেকটা খাদ্য সমৃদ্ধ। কিন্তু মানসম্মত খাদ্যের যে অভাব আছে তা আমরা সকলেই জানি। বর্তমানে ফার্ম থেকে প্লেট পর্যন্ত নিরাপদ খাবার সরবরাহ করতে আমরা এখনও পারিনি। বাপ দাদার আমলেই খাবার অনেকটা নিরাপদ ছিল। অত্যাধুনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপাদন করে লক্ষ্যাত্রা অনুযায়ী ফলন পেয়েছি, কিন্তু প্রাণপ্রিয় সন্তানদের মুখে তুলে দিতে পারিনি বিষমুক্ত খাবার। তাই বাঁচার প্রয়োজনেই ধরে রেখেছি দাদার আমলের স্মৃতি।” এমনটি জানালেন রাজশাহী গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুল ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের কে. এম. এ মুকিদ দুলাল (৬০)।

তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ সালে দর্শন বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করেন। ১৯৮৫ সালে একটি দেশের একটি জীবন বীমা কোম্পানিতে চাকুরি শুরু করেন। বাবার অবর্তমানে ২০০৩ সালে চাকুরি ছেড়ে কৃষি কাজে ফিরে আসেন। দুই মেয়ে ও স্ত্রীসহ চার সদস্যের পরিবার। বড় মেয়ে এমবিবিএস ডাক্তার, কিছুদিন আগে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিয়ারিং শেষ বর্ষে অধ্যায়নরত।

img_20161016_113345

পারিবারিক কৃষি উদ্যোগ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দাদার আমল থেকেই কৃষিনির্ভর পরিবার আমাদের। তখন থেকেই বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করা হতো। ধানের মধ্যে যেমন-ঝিংগাশাল ও দাদখানি এই দু’টি ধান আমরা দীর্ঘ দিন ধরেই চাষ করে আসছি।” তিনি আরও বলেন, “এই এলাকায় দেশীয় ধান জাতের বীজের অভাব, কারণ মানুষ আর এগুলো চাষ করেন না। চলতি বছরে দেশীয় জাতের বীজের সন্ধান পেয়ে তানোরের দুবইল গ্রামের ‘বরেন্দ্র কৃষক বীজ ব্যাংক’ থেকে বীজ সংগ্রহ করি। সাদা বাদশাভোগ, কালো বাদশাভোগ, রাধুনি পাগল, গাঞ্জিয়া, আতফ, চিনিসংকর ও চেংগুন ধান এবার চাষ করেছি।’

নিজস্ব জমি ও বাগান ভিটাসহ মোট পঞ্চাশ বিঘার জমির মালিক তিনি। ১০ বিঘা জমিতে দেশীয় প্রজাতির ধান কোন রাসায়নিক সার ও বিষ ছাড়াই চাষ করেন। ধানগুলো বাড়িতে খাওয়ার চাহিদা মিটিয়ে কিছু আত্মীয়দের সহযোগিতাও করার ইচ্ছা তাঁর। বাকি ধানগুলো বাড়িতেই বীজ করার জন্য রাখবেন। যা তিনি এলাকার আগ্রহী ব্যক্তিদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চান।
জৈব কৃষির চর্চার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এগুলো ধান অন্যান্য ধানের মত ফলন বেশি হয় না, তবে খরচও অত্যন্ত কম। রাসায়নিকমুক্ত তাই এগুলো ধানের ভাত খেতেও মজা লাগে। জৈব পদ্ধতিতে বাড়িতে খাওয়ার জন্য সবজি ও মসলা জাতীয় ফসলের মধ্যে মশুর, রসুন, পিয়াজ, সরিষা, লাউ, কুমড়া ও শিম চাষ করি।” এছাড়া তাঁর বাগানে ৩৫০টি আম গাছ ও ৮টি লিচুগাছ রয়েছে যা তাঁর ফলে চাহিদা মেটায় বলে তিনি জানান। মুকিদ দুলালের বাড়িতে তিনটি গরু, ২০টি মুরগি ও ৮টি রাজহাস রয়েছে, যা তাঁর দুধ ও মাংসের চাহিদা পূরণ করে। অন্যদিকে বাড়ির সামনে ৩ বিঘা একটি পুকুর রয়েছে সেখানে তিনি রুই, কাললা, চিতল, মাগুর, শিং, কই, পুটি, টাকি, শোল, ময়া, টেংরা ইত্যাদি চাষ করেন।
কেন এই উদ্যোগ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অর্থ থাকলেও মানসম্মত খাবার সব সময় পাওয়া যায় না। নিজের সন্তানদের মুখে মান সম্মত খাবার তুলে দেয়ার জন্যই আমার এ উদ্যোগ।’

img_20161101_160223

অন্যান্য সহযোগী কাউকে পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামের ইউসুফ আলী মোল্লার সাথে আমার বীজ বিনিময় হয়েছে। তিনি আমার কাছ থেকে জিংগাশাইল বীজ নেন এবং আমাকে গত আমন মৌসুমে ‘বরেন্দ্র বীজ ব্যাংক’ থেকে রাধুনি পাগল ও দাদখানি বীজ সহযোগিতা করেন।” তিনি আরও বলেন, “আমার অনেক দিনের আশা ছিল এই ধরনের মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার। বর্তমানে বীজ বাজারের কাছে বিনিময় শব্দটি কৃষকের কাছে দিন দিন অপরিচিত থেকে চলেছে। আর সেই বাজারে দেশী ধান তো টাকা দিয়েও পাওয়া যায়না। তাই আমি বড় উপকৃত হয়েছি, আমার প্রত্যাশা অনুযায়ী বীজ পেয়েছি।”

এসব উদ্যোগের জন্য সম্মাননা হিসেবে চলতি বছরের ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০১৬ রাজশাহীতে কৃষক সম্মাননা অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার একটি সম্মাননা ক্রেস তুলে দেন। সম্মাননা পেয়ে তিনি অভিভূত হয়েছেন বলে জানান।
কৃষক যখন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা দিতে পেরেছে, তখন মানসম্মত খাবারও মানুষের মুখে তুলে দিতে পারবেন। তাই উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত ও বণ্টনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসহ সবাইকে একসাথে কাজ করলে বিষমুক্ত খাবার মানুষের মুখে দেওয়া কঠিন কোন কাজ নয় বলে তিনি মনে করেন।

happy wheels 2
%d bloggers like this: