Posted in

যদি তোর ডাক শুনে কেউ নাই আসে তবে একলা চলরে….

নেত্রকোনা থেকে খাদিজা আক্তার লিটা
“আমরার জায়গা আমরারই কইরা লয়তে হইব, কেউ আমরার জন্য একটু সইরা দাঁড়াইব না” কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোনা সদর উপজেলার মালনী ঋষি পাড়ার রঙ্গু ঋষি।
মালনি ঋষি পাড়ার এক কিলোমিটারের মধ্যে দু’টি প্রাইমারী ও দু’টি হাইস্কুল থাকা সত্ত্বেও ঋষি পাড়ার ঋষিদের শিক্ষার হার প্রায় শুণ্যের কোটায়। ছেলে-মেয়েরা স্কুলে না গিয়ে বাড়িতেই অলস বসে থাকে এবং পাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারের মেয়েই বাল্য বিয়ের শিকার। অন্যদিকে কিশোররা ঝুঁকছে নেশার দিকে। ঋষিপাড়ার এ চিত্র রঙ্গ ঋষির মনকে প্রায়শই ভাবিয়ে তুলে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন পাড়ার ঋষি শিশুদের জীবনের পরিবর্তনে কাজ করার। যে হাত দিয়ে তিনি মানুষের চুল কাটেন সেই হাতেই ঋষি শিশুদের হাতে বই, খাতা ও কলম তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। নিজ উদ্যোগে শুরু করেন বিভিন্ন ধরণের সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ। ঋষি সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ ও মাদক দ্রব্য সেবন দূরীকরণে অভিভাবকদের সাথে আলোচনার পাশাপাশি গান ও সচেতনতামূলক পথ নাটকের আয়োজন করেন। স্কুলে যায় না এমন কিশোরী ও নারীদের আয় বৃদ্ধিমূলক কাজে যুক্ত করার লক্ষ্যে সেলাই প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেন। বাড়িতে হাঁস-মুরগী পালনের পাশাপাশি যাদের বাড়িতে জায়গা কম তাদেরকে ঘরের চালে কবুতর পালনের পরার্মশ দেন। এভাবেই এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে তিনি এক মহতি উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এ কাজে তিনি কারো সহযোগিতা না পেলেও একাই এগিয়ে যেতে চান সকল বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে।

অথচ তারই নেই অন্ন বস্ত্রের সঠিক সংস্থান। রঙ্গু ঋষির দুই ছেলে ও পাঁচ কন্যাসন্তান নিয়ে নয়জন সদস্যের সংসার। এরমধ্যে চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এবং এক ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন। পরিবারে থাকা অবস্থায় আর্থিক অনটনের জন্য ইচ্ছে থাকা সত্যেও নবম শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর অন্যের সেলুনে নাপিতের কাজ করতে বাধ্য হন রঙ্গু ঋষি। নয়জনের সংসারে খাবার জোগার করতে গিয়ে নিজের ছেলে-মেয়েদের ভাল করে লেখাপড়া করাতে পারেন নাই। খুব সাদাসিধে ভাবে চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ঋষি পাড়ার গুটি কয়েক পরিবার ছাড়া প্রায় প্রতিটি পরিবারের জীবন ধারা প্রায় একই রকম। মুচির কাজ, সেলুনের কাজ ও ঠেলাগাড়ী চালানো কাজ ঋষি পাড়ার পুরুষদের জীবন-জীবীকার অন্যতম উৎস। ঋষি পাড়ার দুই থেকে তিনজন লোক আছেন যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পিওনের কাজ করে জীবন চালায়। সেলুনের কাজ করে চরম দারিদ্রতার মধ্যে রঙ্গু ঋষির জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটে গেছে।
presentation1
রঙ্গু ঋষি মনে করেন যে, “পাড়ার সব সমস্যার মূলে রয়েছে শিক্ষার অভাব। তাই আমি ঋষি পাড়ার শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি শুরু করি। প্রায় তিন বছর আগে কারো কোন ধরনে আর্থিক সহায়তা ছাড়াই নিজের আয় থেকে টাকা বাঁচিয়ে পাড়ার ২৫/৩০ জন ঝরে পড়া শিক্ষার্থী এবং স্কুলে যায়না এমন শিশুদের নিয়ে পাড়ায় কেয়ার বাংলাদেশ এর তৈরী পরিত্যক্ত একটি ঘরে প্রাথমিক পাঠদান কার্যক্রম শুরু করি। বর্তমানে পাঠ কেন্দ্রের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫০ জন।”

পাড়ার খুব কাছের স্কুল থাকা সত্ত্বেও কেন ঋষি ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যেতে চায়না কেন জানতে চাইলে গ্রামের লিপি ঋষি বলেন, “আমাদের ছেলে-মেয়েরা অন্যদের সাথে মানাইতে পারেনা, আমাদের পুলাপানেরা সারাদিন জুতা পায়ে দেয়না, স্কুলে গেলে জুতা লাগে, ভাল জামা লাগে, অনেক বাপ-মাই সব সময় এত কিছু দিতে চায় না”।

ভাল কাজ ভাল মানুষকে উৎসাহিত করে। রঙ্গু ঋষির এই ভাল কাজে এগিয়ে এসেছেন দূর্গা ঋষি নামের এক ঋষি নারী। তিনি টাঙ্গাইলের ঋষি পাড়ায় এমনই প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও নিজের মধ্যে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়েছে ।অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি অনার্স প্রথম বর্ষে পড়াশুনা করছেন। মালনি ঋষি পাড়ার শিশুদের শিক্ষার এই দূরবস্থা দেখে তিনিও স্বেচ্ছায় বিনা পারিশ্রমিকে রশিশুদের পাঠদান কেন্দ্রে নিয়মিত পড়াচ্ছেন। এ সম্পর্কে দূর্গা ঋষি বলেন, “আমিও এমনই একটি সমাজ থেকে এসেছি, আমি জানি তারা বঞ্চিত। আমার মা-বাবা অনেক পরিশ্রম করে আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। আমাদের ঋষি পরিবারগুলো এখনও সামাজিকভাবে অবহেলিত, তাই আমি এ কাজটির সাথে যুক্ত হতে পেরে খুবই আনন্দিত”।

রঙ্গু ঋষি শিক্ষার এ মশালটি জ্বালিয়ে রাখার বিষয়ে সকল শ্রেণীর মানুষের সহায়তা কামনা করছেন। কবি গুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই গান ‘যদি তোর ডাকশুনে কেউ নাই আসে তবে একলা চলরে’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রঙ্গু ঋষি পথ চলছেন এ সম্প্রদায়ের উন্নয়ন আর অগ্রগতির জন্য। তিনি সরকার সহ সকলের প্রতি সহযোগিতার জন্য উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.